ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

মহাবিশ্বের অসীম বিশালত্বের তুলনায় মানুষের অস্তিত্ব নিতান্তই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র। তারপরও এখন পর্যন্ত মানুষই সৃষ্টির একমাত্র জীব যা বুদ্ধিমত্তা দিয়ে চরম প্রতিকূল অবস্থাকে নিজের অনুকূলে নিয়ে আসতে পারে। শুধু মানুষেরই রয়েছে হৃদয়ভিত্তিক অনুভুতি যা দিয়ে সে অপর মানুষের অদৃশ্য বেদনা অনুভব করতে পারে।

এমন অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী মানুষেরই একটা অংশ যুগে যুগে স্বজাতির উপর নির্যাতন করে গেছে, এখনও করে যাচ্ছে। কাপুরুষতা, আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতা এদেরকে অন্যদের মতো মানুষ হয়ে উঠতে দেয় নি, যদিও মানুষের চেহারা ও আকার নিয়ে তারা জন্ম নিয়েছে। তারা শুধু প্রাণী হয়েছে। হৃদয়ের মহান ব্যবহার তাদের জানা নেই।

বেচেঁ থাকার জন্য মুফতে পাওয়া ৬০/৭০ বছর সময়টুকু এরা ব্যয় করে অপরের ক্ষতি সাধনে। এর চেয়ে বড় মূর্খতা আর কী হতে পারে?

যখন কেউ তার মানবিক সত্তাকে হারিয়ে ফেলে তখন সে পাপ করে পুলক বোধ করে, যত পাপ তত তার পৈশাচিক আনন্দ। তাহলে লেখালেখি, সভা, সেমিনার, মানববন্ধন ও বিবৃতি বা অন্য কোনো আনুষ্ঠানিকতা কী কাজে আসবে? পাপীকে প্রকৃত শাস্তি দেয়া আর তার চেতনায় পরিবর্তন এনে তাকে মানবিক করে তোলা সবচেয়ে বেশি জরুরী। কিন্তু তা তো হচ্ছে না।

বর্তমানে বিশ্বের সর্বত্র নারী নির্যাতন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে ভাবার কোনো উপায় নেই যে, কোনো একদিন নারীরা সবধরণের নির্যাতন থেকে মুক্তি পাবে।

অসংখ্য ঘটনার মধ্য থেকে অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া তিনটি জাঙ্গলিক ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি।
মাথার ব্যথায় কাতর মাদারীপুরের এক নারীকে তার স্বামী ট্যাবলেট খাইয়ে নিস্তেজ করে প্রথমে সুপার গ্লু দিয়ে তার দুই ঠোঁট আটকে দেয়, পরে তার দেহের সর্বত্র সিগারেটের আগুন দিয়ে সেঁকা দেয়, আরো বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে। ঐ নারীর অপরাধ, পরনারীর সাথে স্বামীর বিয়ে-বহির্ভুত সম্পর্কে সে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

নড়াইলের এক কলেজ ছাত্রী ফোনালাপে পরিচিত হয়ে এক সেনা সদস্যের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়ায়, পরে ঐ ‘পিস’কে বিয়ে করে। মেয়েটি যখন বৈবাহিক অধিকার দাবি করলো তখন তাকে ধোঁকা দিয়ে স্বামীর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর মেয়েটির স্বামী, স্বামীর বাবা-মা, ভাই, চাচা ও আরো কিছু লোক মেয়েটিকে গাছের সাথে বেঁধে লাঠি দিয়ে পিঠিয়ে আধমরা করে মেয়েটির সংসার করার সাধ মিটিয়ে দেয়।

গত মাসের এক রাতে গাজীপুরের এক অতি দরিদ্র মেধাবী কিশোরী নিজ শয়নকক্ষে ৭/৮ জন দুর্বৃত্তের হাতে ধর্ষিত ও খুন হয়। ধর্ষণ কর্ম নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার জন্য তার মা ও ভাইকেও খুন করা হয়। প্রতিবেশী এক নারী খুনীদের দেখে ফেলেছিলেন বলে খুনীরা তাকেও হত্যা করে। সবাইকেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। দিনমজুর ভাইদের রুজি ও নিজের টিউশনির আয় দিয়ে মেয়েটি কোনোরকমে পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছিল, এসএসসিতে ভালো ফল করে কলেজে ভর্ত্তি হয়েছিল। কিছু বর্বর প্রাণির পাশবিক বিকৃতির শিকার হয়ে এ নিষ্পাপ মেয়েটিকে আরো ৩ জন নির্দোষ মানুষের সাথে মিলে অকালে পৃথিবী ছাড়তে হল।

আমি আর কোনো ঘটনা উল্লেখ করতে যাচ্ছি না। এমন নয় যে, বাংলাদেশের বাইরে পরিস্থিতি ভালো। পুরো পৃথিবীতেই নারী নির্যাতন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। আমেরিকা প্রায়ই ধর্ষণ ও পারিবারিক সহিংসতায় প্রথম স্থান দখল করছে। ভারত কী কী অভিনব উপায়ে নারীদের ধর্ষণ করা যায় তার উদাহরণ তৈরী করে যাচ্ছে দিনের পর দিন। আর নারী নির্যাতনের স্বর্গ যে পাকিস্তান তা তো জানাই।

মানুষ সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে নানাবিধ সংগ্রাম করে আজ যে অবস্থানে এসে পৌঁছেছে তা কি এসব অমানবিকতার ধারক হওয়ার জন্য? এক ছিমটি লবণ, এক মুঠো গুঁড় আর এক লিটার পানি যেমন খাবার স্যালাইন তৈরীর সুলভ উপাদান মানুষের সভ্যতা নামক বস্তুটিও কি তেমনি এক ছিমটি ভালোমানুষি, এক মুঠো উপদেশ আর অসংখ্য ধর্ষণের ঘটনা দিয়ে গড়ে যেতে হবে? এটাই তবে মানবিক আকাঙ্ক্ষার নির্যাস?

অনেক বর্ণচোরা ধর্ষণের জন্য মেয়েদেরই দায়ী করতে যায়, মেয়েদের পোশাক ও চলাফেরা নিয়ে আপত্তি তোলে। মেয়েরা তখন জিজ্ঞাসা করে, তাহলে শিশুরা বা বোরখা পরা মেয়েরা কেনো ধর্ষিত হয়? যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন। কিন্তু ঐ বর্ণচোরাদের জন্য আমার জবাব ভিন্ন।

ধর্ষণ একটা অপরাধ। আর অপরাধ করার অধিকার কারোর নেই, অজুহাত যাই হোক না কেনো, যে অপরাধই হোক না কেনো, কখনো নেই। তাই কোনো মেয়ে ছোট পোশাক পরলে বা এমনকি পোশাকবিহীন হয়ে চললেও তাকে ধর্ষণ করা বৈধ হয়ে যায় না। অন্যের জীবন বা মর্যাদার ক্ষতি করা জঘন্যতম এক অপরাধ। কেউ ছোট পোশাক পরলে তার প্রতি এ অন্যায় করা যায় বলে ভাবতে পারে শুধু মানুষাকারের দ্বিপদী পশুরা।

পর্দা করা না করা ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। ধর্ম বলে নি, যে পর্দা করে না তাকে ধর্ষণ করা যাবে বা তাকে জোর করে পর্দা করাতে হবে। তাছাড়া ধর্ম নারীদের যেমন তেমনি পুরুষদেরকেও পর্দা করতে বলেছে, পুরুষরা যেন নিজেদের জৈবিক অনুভুতিকে নিয়ন্ত্রণ করে চলে তার উপর জোর দিয়েছে। এসব মানামানি নেই, শুধু মেয়েদের ক্ষেত্রে ধর্মকে টেনে আনা।

ধর্ষণের পিছনে মেয়েদের পোশাক যে কারণ নয় তার প্রমাণ ৪/৫ বছর বয়সী মেয়েশিশু এবং বোরখা পরা মেয়েরাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। একটা বোরখা পরা মেয়ে কি ধর্ষিত না হয়ে মধ্য রাতে কোনো শহরের কোনো রাস্তা দিয়ে একা হেঁটে কোথাও যেতে পারবে যদি জরুরী প্রয়োজন হয়? গাজীপুরের ঐ যে কিশোরী মেয়েটি নির্মমভাবে ধর্ষিত ও খুন হল সে তো বেপর্দা হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল না, সে নিজের জীর্ণ ঘরে ঘুমাচ্ছিল। তাহলে কেনো সে ধর্ষিত হল? মেয়েদের পোশাক নয়, ধর্ষক পশুদের জংলি মানসিকতাই এর কারণ।

একটি মেয়ে যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায় তখন হাজারো পুরুষ তাকে দেখে, একা শুধু ধর্ষক নয়। কিন্তু সব পুরুষ মেয়েটিকে ধর্ষণ করে না। শুধু ধর্ষকরাই তা করে। অর্থাৎ যারা ধর্ষণ করার পাশবিক ইচ্ছা পোষণ করে শুধু তারাই ধর্ষণ করে। তাহলে সেই একই ব্যাপার – ধর্ষণের মানসিকতা। যারা ধর্ষণ করে বা করতে চায় তারা যে মানসিকতা ধারণ করে তা পশুদের থেকে ধার করা। এটা একান্তই ধর্ষক জানোয়ারদের নিজস্ব জিনিস। তাই ধর্ষণের জন্য পুরুষের যৌন আকাঙ্ক্ষা বা নারীর পোশাক দায়ী নয়।

কিছু মেয়ে অবশ্য ধর্ষণকে কেন্দ্র করে সব পুরুষের বিরুদ্ধে ফেসবুকে ‘আইজুদ্দীয়’ শব্দযুক্ত ‘বিপ্লবী’ স্ট্যাটাস দেয়। যে ছেলেরা ধর্ষণের জন্য মেয়েদের পোশাককে দায়ী করে তারা আর এ মেয়েরা একই ধরণের সুবিধাবাদী অবস্থানের বাসিন্দা। শুধু ‘আমিও আছি’ জানাতে এরা এসব অযৌক্তিক কথার অবতারণা করে। এ মেয়েরা ভুলে যায় যে, নারীরা যতটুকু এগিয়েছে তা একা নারীদের অর্জন নয়, এর পিছনে অসংখ্য পুরুষেরও অবদান আছে। তাই সব পুরুষকে দায়ী করা এ মেয়েদের অকৃতজ্ঞতারই প্রকাশ।

পুরুষ কখনো ধর্ষণ বা নারী নির্যাতন করে না। এটা কাপুরুষের কাজ। পুরুষ নারীর মন জয় করে পারস্পরিক সম্মতিতে প্রচলিত প্রথায় নারীর সাথে যৌন কর্মে মিলিত হওয়ার সামর্থ্য রাখে। কাপুরুষের সেই সামর্থ্য থাকে না। তাই কাপুরুষেরা ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। পুরুষ নারীকে মানুষের মর্যাদা দেয় কিন্তু কাপুরুষ নারীকে শুধু ‘যৌনবস্তু’ বলে মনে করে।