ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

যে ঘটনার প্রেক্ষিতে লিখছি শুরুতে তা বলে নেই। আজ থেকে ৫ বছর আগে কুড়িগ্রামের এক দিনমজুর তার স্ত্রী ও ৬ মাস বয়সী রনি নামের ছেলেকে নিয়ে কাজের সন্ধানে ভারতে পাড়ি জমায়, দিল্লিতে গিয়ে এক ইটভাটায় দিনমজুরের কাজে যোগ দেয়। দু’মাস পূর্বে রনিকে তার মা-বাবা স্কুলে ভর্ত্তি করানোর জন্য এক দালালের মাধ্যমে বাংলাদেশে তার দাদার কাছে ফেরত পাঠাতে যায়।

কিন্তু রনি বাংলাদেশে ফিরে আসতে পারে নি। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ তাকে সীমান্ত থেকে আটক করে নিয়ে যায়। দু’মাস যাবৎ রনি আসামের এক বন্দি শিবিরে ‘অপরাধী’ হিসেবে বন্দি হয়ে আছে। তার অপরাধ – অবৈধভাবে ভারতে অনুপ্রবেশ।

বাংলাদেশের বিজিবি রনিকে ফিরিয়ে আনতে বিএসএফের সাথে ৩ বার বৈঠকে বসেছে। কিন্তু বিএসএফ রনিকে ফেরত দেয় নি। ছেলের চিন্তায় ঐ দম্পতি এখন পাগলপ্রায়।

এর মাঝে রনিকে একবার তার মায়ের সাথে ফোনে কথা বলতে দেয়া হয়। সাড়ে ৫ বছরের অবুঝ শিশুটি ব্যাকুল হয়ে কেঁদে মাকে বলেছে,”মা, আমি তোমার কাছে যেতে চাই, আমাকে নিয়ে যাও।” ছেলের বুকফাঁটা কান্না শুনে মা অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়েছে। (সুত্রঃ দৈনিক জনকণ্ঠ)

পৃথিবীর কোন্ আইন বা নিয়ম এ নিষ্পাপ শিশুটিকে এমন কষ্ট দেয়া, এভাবে বন্দি করে রাখার কথা বলেছে? যদি তাকে তার মা-বাবার সাথে বন্দি করে রাখা হত তাহলেও না হয় সেটা কিছুটা মানবিক হত। কিন্তু একা বাচ্চাটিকে ভিনদেশী এক বন্দি শালায় আটকে রাখা, তাও যে অপরাধের দায় তার নয় সে জন্য, পাশবিক একটা কাজ।

একেবারে নিরেট আইনের দৃষ্টিতে দেখলেও এটা অবৈধ। বেআইনিভাবে অনুপ্রবেশ করে থাকলে করেছে শিশুটির বাবা-মা, শিশুটি নয়। তাকে নিয়ে নিয়ম ভেঙ্গে ভারত ত্যাগ করতে চেয়েছে ভারতীয় এক দালাল। শাস্তি হলে ঐ দালাল ও শিশুটির বাবা-মার হবে। শিশুটিকে শাস্তি দেয়া তো দূরের কথা, তাকে আটকে রাখাও বেআইনী।

এমন নয় যে, শিশুটির পরিচয় সম্পর্কে তথ্য পায় নি বলে বিএসএফ শিশুটিকে ফেরত দিচ্ছে না। ছেলেটির মা-বাবার সন্ধান পেয়ে তাদের সাথে ছেলেটিকে তারা কথাও বলিয়েছে। তার চেয়ে বড় ব্যাপার, বিজিবির পক্ষ থেকে ছেলেটির পরিচয় বিএসএফকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ বিএসএফ ছেলেটির পরিচয় ভালো করেই জানে। তাহলে?

অর্ধ-শিক্ষিত বিএসএফের কিছু সদস্য অমানবিকতা চর্চা করতে খুব ইচ্ছুক। শুধুমাত্র এ কারণেই শিশুটিকে আটকে রাখা হচ্ছে। বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের গ্রেপ্তার না করে বিনা প্ররোচনায় গুলি করে মারার কারণও তাই। তাদের হাতে রাইফেল আছে, গুলি করার ইচ্ছাও আছে। তাই প্রয়োজন না হলেও তারা গুলি করে মানুষ মারে অথবা যেখানে পায়ে গুলি করেই একটা লোককে আটকে ফেলা যায় সেখানে তারা পিটে গুলি করে তাকে খুন করে।

এ অজ্ঞ ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা খুব সম্ভবতঃ ভারতকে উন্নত কোনো রাষ্ট্র বলে মনে করে। কিন্তু সত্য হল, ভারতের ৬০% মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে আর বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে মাত্র ৩৭% মানুষ। নোবেল জয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদের মতে, সামাজিক উন্নয়নের সূচকগুলিতে বর্তমানে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে অনেক এগিয়ে।

অর্থনীতির আকার বড় হলেই দারিদ্র্য দূর হয়ে যায় না। অর্থনীতির আকার অনেকটা জনসংখ্যার আকারের উপর নির্ভর করে। আমেরিকার অর্থনীতি আকারে পৃথিবীর বৃহত্তম, সেই তুলনায় সুইজারল্যান্ডের অর্থনীতি অনেক ছোট। কিন্তু সুইজারল্যান্ডের জনগণের মাথাপিছু আয় আমেরিকানদের চেয়ে অনেক বেশি, সুইজারল্যান্ডে কোনো গৃহহীন বা গরীব মানুষ নেই কিন্তু আমেরিকায় লাখো লাখো মানুষ গৃহহীন ও গরীব।

বিএসএফের সদস্যদেরকে তাই মিথ্যা অহংবোধ ঝেড়ে ফেলে মানবিক হয়ে উঠতে হবে। অনেক ভারতীয় অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বিজিবি তো তাদের গুলি করে মারে না, প্রয়োজনে গ্রেপ্তার করে। বিএসএফের আচরণও এমন হতে হবে।

সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশের সাথে সীমান্ত চুক্তি সম্পাদন করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে উন্নীত করেছে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে তাঁর আলোকিত সফরে পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন দ্বার খুলেছেন। এমনকি সীমান্তের হত্যা নিয়েও তিনি প্রত্যাশিত মন্তব্য করেছেন।

তিনি বলেছেন, “বড় কথা হল, গুলি ছুড়লে মৃত্যু হয়, এতে মারা যায় গরীব মানুষ। সীমান্তে আমাদের উত্তেজনা তৈরী হয়। আমাদের সজাগ থাকতে হবে, কেউ যেন এ উত্তেজনা তৈরী করতে না পারে।”

ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা কি তাদের প্রধানমন্ত্রীর অনুভূতির বাইরে গিয়ে যা খুশি তাই করে বেড়াবে সীমান্তে?

ভারত সরকারকে নিজ উদ্যোগে সচেতন হয়ে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে, বিএসএফের মানসিকতায় আমূল পরিবর্তন আনার ব্যবস্থা করতে হবে। নতুবা শুধু কথার ফুলঝরি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে প্রত্যাশার প্রান্তসীমায় নিয়ে যাবে না।

সর্বোপরি, শিশু রনিকে অবিলম্বে তার মা-বাবার কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে।