ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

মানুষ যতটা নিজের জন্য বাঁচবে যদি অন্যের জন্যও সে ততটা বাঁচে তাহলে কি দুনিয়ায় কোনো অর্থনৈতিক বা সামাজিক সমস্যা থাকবে?

সম্পদ সীমিত কিন্তু অভাব সীমাহীন। সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত করা গেলে সব মানুষের জন্য ন্যূনতম সুখ নিশ্চিত করাও সম্ভব হবে। একমাত্র Communism বা সাম্যবাদই পারে তা করতে। মানুষের মুক্তির সেরা পথ তাই সাম্যবাদ।

পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবের এতকাল পরেও শোষণ, নির্যাতন ও বৈষম্যের অবসান হয় নি। বরং দিন দিন তা বাড়ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পৃথিবীর মোট সম্পদের ৯৯% ভোগ করে মাত্র ১% মানুষ আর অবশিষ্ট ৯৯% মানুষের জন্য রয়েছে মাত্র ১% সম্পদ।

অথচ একই সমান সুবিধা, সম্পদ ও মর্যাদা লাভ করা প্রতিটি মানুষের জন্মগত অধিকার। কিছু লোক লুটতরাজ করে সম্পদের পাহাড় গড়বে আর কোটি কোটি মানুষ জীবনের মৌলিক চাহিদাই পুরন করতে পারবে না – এমন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা পশুদের ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিরই নামান্তর।

মানব ইতিহাসে সর্বাধিক প্রভাবশালী মহামানবদের একজন অমর দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী কার্ল মার্ক্স এ ব্যবস্থার মূলোৎপাটনের জন্যই সমাজতন্ত্র তথা সাম্যবাদের রূপরেখা প্রণয়ন করেছিলেন যা মানব রচিত অন্য যে কোনো মতবাদের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর ও সঠিক।

মার্ক্সের ‘The Communist Manifesto’ (সহলেখক – ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস্) ও ‘Das Kapital’ যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর নানা প্রান্তের শোষিত মানুষদেরকে বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখিয়ে আসছে।

কিছু দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বটে। কিন্তু সে সব দেশের রাষ্ট্রনায়করা যে সব ভুল করেছিলেন তার প্রেক্ষিতে অনেকে সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদ সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করে। বস্তুতঃ ওটা সমাজতন্ত্রের আদর্শগত কোনো ভুল ছিল না, প্রয়োগকারীদের প্রয়োগ পদ্ধতির ভুল ছিল। ঐ সব দেশের সরকারগুলি সমাজতন্ত্রের মূল লক্ষ্যকে ত্যাগ করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েছিল।

মার্ক্সের সাম্যবাদ আর লেনিন-মাওয়ের সমাজতন্ত্র এক নয়। যে বঞ্চিত মানুষদের জন্য সমাজতন্ত্র সেই মানুষদের অধিকারই খর্ব করা কিংবা পুঁজিবাদী রাস্ট্রগুলির সাথে অস্ত্রের প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে জনকল্যাণের মতো বিষয়গুলিকে ভুলে যাওয়া কখনোই সাম্যবাদের চাওয়া নয়। এটা লেনিনবাদ-মাওবাদের নিজস্ব আবিস্কার।

পুঁজিবাদের প্রতিভূ আমেরিকার পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে লেনিনের রাশিয়া সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের বিস্তার ঘটিয়েছিল। আর চীন সমাজতন্ত্রের ছাপ গায়ে লাগিয়েও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে আমেরিকার অনুগামী হয়ে চলেছে। চীন এমনকি বাংলাদেশে আক্রমণ করা পাকিস্তানি বর্বরদেরও সমর্থন করেছে।

পুঁজিবাদী দানবদের পৌনঃপুনিক ষড়যন্ত্র ও অপচেষ্টায় রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের ভিত্তি এমনিতেই দুর্বল ছিল। তার সাথে লেনিনবাদীদের ভুলগুলি যোগ হওয়ায় বলশেভিক বিপ্লবীদের ৭৪ বছরের পুরানো সমাজতান্ত্রিক দুর্গ রাশিয়া ১৯৯১ এ ভেঙ্গে পড়ে, বিদায় ঘটে লেনিনবাদী সমাজতন্ত্রের।

তবে সাম্যবাদের মহান আদর্শ তাতে ম্লান হয় নি। সব বৈষম্য অবসানের সাম্যবাদী মূল লক্ষ্য আজো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটা আরো বেশি জরুরী।

পুঁজিবাদের ধারক আমেরিকা একক পরাশক্তি হিসেবে এখন দুনিয়াজুড়ে যা খুশি তাই করে বেড়াচ্ছে। ঠুনকো অজুহাতে পুরো একটা দেশকে একেবারে ধ্বংস করে দিচ্ছে। সারা পৃথিবীর প্রতিবাদ গায়ে না মেখে আমেরিকা শিশু ও নারীসহ ১০ লাখ ইরাকীকে বিনা কারণে খুন করেছে, সমৃদ্ধ দেশ ইরাককে হাস্যকর দুরাবস্থার মধ্যে টেনে নিয়ে ফেলেছে শুধু ইরাকের তেলের দখল পেতে।

তাদের অপকর্মের প্রভাব এতেই থেমে নেই। সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের প্রতি পুঁজিবাদীদের অন্তহীন লোভের বিরূপ প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রতিনিয়ত নানাবিধ সামাজিক অনাচারের জন্ম হচ্ছে, বাড়ছে আয় বৈষম্য ও নারী নির্যাতন। পুঁজিবাদের কর্মীরা পুঁজির সেবা করতে গিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজসমুহের ভিত্তি নষ্ট করে দিচ্ছে।

পুঁজিবাদ দেশে দেশে সামরিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের বীজ বুনে চলেছে। তাদের অনুসারী নয় এমন দেশের প্রতি তারা খুবই কঠোর। কিন্তু তাদের পালিত ইসরাইলি খুনীরা যখন ঠান্ডা মাথায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনী শিশুকে বোমা মেরে খুন করে তখন তারা নীরব থাকে। সমাজতন্ত্র ছাড়া আর কিছু এ অরাজকতা রুখতে পারবে না।

অর্থনীতি, সমাজ ও রাজনীতি সংক্রান্ত বিষয়ে মার্ক্স যে কালোত্তীর্ণ মতবাদ দিয়ে গিয়েছেন তাই একত্রে মার্ক্সবাদ বা Marxism নামে পরিচিত। এর প্রথম ধাপ সমাজতন্ত্র আর চুড়ান্ত রূপ সাম্যবাদ। মার্ক্স বলেছেন, মানব সমাজ শ্রেণী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণে থাকা মালিক শ্রেণী ও উৎপাদনে শ্রম দেয়া শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যকার দ্বন্দ্বই হল শ্রেণী সংগ্রাম।

মার্ক্স আরো বলেছেন, পুঁজিবাদ নিজেই এর ধ্বংস ডেকে আনে, নতুন ব্যবস্থার পথ খুলে দেয়। এর ফলে শ্রমিক শ্রেণী রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভ করে এবং তাদের পক্ষে এমন এক সরকার দায়িত্ব নেয় যা সবার স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে আর উৎপাদনের উপর ব্যক্তিমালিকানার অবসান ঘটায়। এটাই সমাজতন্ত্র।

মার্ক্সের মতে, বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত এর পারস্পরিক দ্বন্দ্বের ফল হিসেবে এক সময় শ্রেণীহীন এক সমাজ সৃষ্টি হয়। এ সমাজের নামই সাম্যবাদ। অর্থাৎ সমাজতন্ত্র শেষে মানুষের চুড়ান্ত চাওয়া সাম্যবাদে রূপ নেয়।

সমাজতন্ত্রের বিপক্ষবাদীদের অভিযোগ, সমাজতন্ত্র ধর্ম পালন করতে দেয় না। ব্যাপারটা মোটেই তেমন নয়। মার্ক্স বলেছেন, পুঁজিবাদের অন্যতম হাতিয়ার হল ধর্ম। এ কথা কি মিথ্যা? বঞ্চিত মানুষের ধর্মানুভূতিকে কাজে লাগিয়ে পুঁজিবাদ কি যুগে যুগে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করে নেয় নি?

আমেরিকা নিজে লাদেনকে ‘জিহাদি’ হিসেবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে দিনের পর দিন ব্যবহার করেছে, আবার প্রয়োজন শেষে ধর্মান্ধ আখ্যা দিয়ে তাকে খুন করেছে। যে আইএসআইএসকে উৎখাত করার কথা বলে আমেরিকা এখন আবার মধ্যপ্রাচ্যে হানা দিয়েছে সেই আইএসআইএস জঙ্গিরাও তাদের সৃষ্টি।

আমেরিকার পূর্বে তৎকালীন পুঁজিবাদী অপশক্তি ইংল্যান্ড বছরের পর বছর অর্ধ দুনিয়ায় লুটপাট চালিয়েছে ধর্মকে অন্যতম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। ভারতে ব্রিটিশদের মূলনীতিই ছিল – ‘Divide and rule.’ অর্থাৎ এখানকার মুসলমান ও হিন্দুদেরকে ধর্মের নামে পরস্পরবিরোধী করে ঝগড়ায় লিপ্ত রেখে ফাঁকতালে শোষণ চালিয়ে যাওয়া।

মার্ক্স যে ঠিক বলেছিলেন তা প্রমাণ করতে আর কিছু বলা লাগে? মার্ক্সের অভিমত, ধর্ম হচ্ছে আফিমের মতো। পুঁজিবাদ নিজ স্বার্থে সেই আফিমকে সুচতুরভাবে ব্যবহার করে। মার্ক্স ধর্মের এ অপব্যবহার বন্ধ করতে চেয়েছেন। কারোর আস্তিক বা নাস্তিক হওয়া একান্তই তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু নিজের বিশ্বাস জোর করে অন্যের উপর চাপানো বা ধর্মের নামে মানুষকে ধোঁকা দেয়া অপরাধ।

সমাজতন্ত্র পতিতাবৃত্তি এবং নারীদেহের অপব্যবহারও অনুমোদন করে না। সমাজতন্ত্র চায়, নারী-পুরুষ উভয়ে মানুষ হিসেবে সমানাধিকার ভোগ করবে। কিন্তু পুঁজিবাদ নারীদের ‘যৌনবস্তু’ হিসেবে উপস্থাপন করতেই বেশি আগ্রহী। নারীর মানবিক মর্যাদা রক্ষার চেয়ে মুনাফা বৃদ্ধি করা তাদের কাছে অনেক বেশি আকাংক্ষিত।

সমাজতন্ত্রের বিপক্ষে আরেক অপপ্রচার হল, এতে নাকি ব্যক্তি স্বাধীনতা নেই। এ ক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া ও চীনের উদাহরন দেয়া হয়। আগেই বলেছি, লেনিনবাদ বা মাওবাদ প্রকৃত মার্ক্সবাদকে তুলে ধরে নি। রাশিয়া ও চীন নিজেদের মতো করে সমাজতন্ত্র চালাতে গিয়ে পুঁজিবাদের ষড়যন্ত্রে অনেক ভুল করেছে যা সমাজতন্ত্রের আদর্শবিরোধী।

সমাজতন্ত্রের ভিত্তিই হল ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেয়া। মুনাফামুখী উত্পাদন বৈষম্য তৈরী করে বলে সমাজতন্ত্র উৎপাদনের উপাদানসমুহের উপর ব্যক্তিমালিকানা বিলোপ করে। সমাজতন্ত্রে সরকার সবার সব মৌলিক চাহিদা পুরন করে আর যোগ্য সবাই নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ন্যূনতম কাজ করে। মানুষের জীবনের বাকিটা তার নিজ ইচ্ছায় চালিত হয়।

মার্ক্সের নিজের ভাষায়, “From each according to his ability, to each according to his need.” মার্ক্সের এ চিরন্তন শ্বাশত বাণীই বৈষম্যহীন সমাজের ভিত্তি।

তরুন ফরাসী অর্থনীতিবিদ থমাস পিকেটি নব্য-মার্ক্সবাদের অবতারণা করে তাঁর বেস্ট সেলার বই ‘Capital in the Twenty-First Century’ এর মাধ্যমে ২০১৩ সালে দুনিয়াকে আবার সাম্যবাদের অপরিহার্যতার কথা জোরালোভাবে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিশ্বে সম্পদের অসম বন্টন ও আয় বৈষম্য প্রকটভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, অতি ধনী কিছু লোক উত্তরাধিকার সুত্রে প্রাপ্ত সম্পদের দ্বারা বৈশ্বিক অর্থনীতির সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে।

শুধু সম্পদের অসম বন্টন এবং আয় বৈষম্যই সমস্যা নয়। পুঁজিবাদী দেশগুলির অপরিমিত ভোগ-বিলাসের কুফল হিসেবে পরিবেশ বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তন আজ ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের মতো সমতলের দেশগুলির বিরাট এলাকা অদূর ভবিষ্যতে সমুদ্রে তলিয়ে যাবার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা তাই সময়ের দাবি। পুঁজিবাদীদের পা-ছাঁটা সেবাদাসরাই শুধু এমন সমাজ চাইবে না। কারণ পুঁজিবাদের দাসত্ব করে তারা মুনাফার অংশ বিশেষ পায়, এমনকি নোবেল পুরস্কারও পেয়ে যায়। পুঁজিবাদী দানব তার বংশবদদের অনুগত করে রাখতে বরাবরই কৌশলী।

ভোগবাদিতা, স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা নির্মূল করে একটি মানবিক পৃথিবী গড়ে তুলতে সাম্যবাদের বিকল্প আর কী আছে?

সাম্যবাদী সমাজের মূলনীতি – সাম্য ও সমানাধিকার নিশ্চিত করা। পৃথিবী সাম্যবাদের এ মহান আলোয় আলোকিত হয়ে উঠলে সেটাই হবে বড় পাওয়া।