ক্যাটেগরিঃ জানা-অজানা

 

মহাজাগতিক মহাবিস্ফোরনের ফলে পৃথিবীর সৃষ্টি। প্রথমে এটা চরম উত্তপ্ত ছিল। কোটি কোটি বছর ধরে ধীরে ধীরে শীতল হয়ে পৃথিবী আজকের অবস্থায় পৌঁছেছে। কখন কীভাবে ধ্বংস হবে আমাদের এ পৃথিবী? ধর্মবিশ্বাসিরা নিশ্চয়ই সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছার কথা বলবে। তবে পৃথিবী ধ্বংসের একটি সময় কিন্তু পরিষ্কারভাবে জানা এবং সুনির্দিষ্ট।

৪টি কারণ চিহ্নিত করা যায় যেগুলির কোনো একটি পৃথিবীকে ধ্বংস করে ফেলতে পারে। এর মাঝে ৩টি কারণ ‘যদি’র উপর নির্ভরশীল কিন্তু বাকি ১টি কারণ ঘটা অনিবার্য। আবার ৪ কারণের দু’টি মহাজাগতিক তথা প্রাকৃতিক আর অন্য দু’টি কারণ মানুষের দ্বারা সৃষ্ট।

পৃথিবীতে জীবনের উৎস হল সূর্য। সূর্যেরআলো ও তাপ পৃথিবীকে টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু সুর্য একদিন আলো ও তাপ তৈরীর এ ক্ষমতা হারাবে। সেদিনটা নির্ধারিত। যদি আগে ধ্বংস হয়ে গিয়ে না থাকে তবে পৃথিবীও সেদিন অনিবার্যভাবে ধ্বংস হবে।

পৃথিবীর অস্তিত্ব বিনাশের ৪ কারণের মধ্যে এটা একমাত্র কারণ যা ঘটবেই। সৃষ্টিকর্তাও তখন পৃথিবীকে বাঁচাতে পারবেন না যদি না তিনি এর পূর্বেই আরেকটি সুর্য তৈরী করে সৌরজগতে নিয়ে এসে পুরানো সূর্যের জায়গায় প্রতিস্থাপন করতে পারেন। তবে ভোগবাদী মানুষের জন্য আশার কথা হল, এমন দিনের অনেক অনেক দেরি আছে।

সূর্যের প্রধান দুই উপাদান হল হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম। এছাড়াও আরো কিছু পদার্থ আছে সূর্যে। ভর অনুযায়ী, হাইড্রোজেন ৭১%, হিলিয়াম ২৭.১%, অক্সিজেন .৯৭%, কার্বন .৪০%, সিলিকন .০৯৯%, নাইট্রোজেন .০৯৬% এবং অন্যান্য উপাদানসমূহ .৩৩৫%।

Nuclear Fusion অর্থাৎ পারমাণবিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে সূর্যের হাইড্রোজেন প্রতিনিয়ত প্রধানতঃ হিলিয়ামে রুপান্তরিত হচ্ছে। সূর্য হাইড্রোজেনকে জ্বালানি হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে। এতে তাপ ও আলো উৎপাদিত হচ্ছে। সূর্যের কেন্দ্রে তাপমাত্রা হল ২৭ মিলিয়ন ডিগ্রি ফারেনহাইট। এ তাপ ও আলোর একটা অংশ সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। সেই সুত্রে আদিকালে পৃথিবীতে জীবনের উৎপত্তি।

এ পারমাণবিক বিক্রিয়া প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৬২০ মিলিয়ন টন হাইড্রোজেনকে হিলিয়ামে পরিনত করছে আর এর ফলে প্রতি সেকেন্ডে যে শক্তি নির্গত হচ্ছে তা পৃথিবীর সর্বাধিক শক্তিশালী পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণে যে শক্তি উৎপন্ন হবে তার চেয়ে ১.৮ বিলিয়ন গুন বেশি।

সুর্যের হাইড্রোজেনের হিলিয়ামে পরিনত হওয়ার এ প্রক্রিয়া সাড়ে ৪ বিলিয়ন অর্থাৎ ৪৫০ কোটি বছর ধরে চলে আসছে। তবে সূর্যে যে হাইড্রোজেন আছে তা অফুরন্ত নয়। এখন থেকে ৫০০ কোটি (অনেকের মতে, ৬০০ কোটি) বছর পর সূর্যের হাইড্রোজেন পুরোটা শেষ হয়ে যাবে। অর্থাৎ সূর্য তখন আর আলো ও তাপ উত্পাদন করতে পারবে না।

অবশ্য সূর্যের কেন্দ্রে ঘটতে থাকা পারমাণবিক বিক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এর প্রভাব সাথে সাথেই পৃথিবীতে পড়বে না। বিক্রিয়া বন্ধ হওয়ার মূহুর্তে সূর্যে সর্বশেষ যে আলো ও তাপ থাকবে তার দরুন সূর্যকে আরো অনেক বছর স্বাভাবিক দেখাবে, যদিও সূর্য নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে আগেই।

এ তাপ আর আলো এক সময় ফুরিয়ে যাবে। সূর্য ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা হবে। সূর্যের বর্ণচ্ছটা হারিয়ে যাবে। শেষে সূর্য তার বর্তমান উজ্জ্বলতার ১০০০ ভাগের ১ ভাগ নিয়ে দৃশ্যমান হবে। অন্য কথায়, এখন প্লুটো গ্রহ থেকে সূর্যকে যেমন দেখায় তখন পৃথিবী থেকেও সূর্যকে তেমন দেখাবে।

পৃথিবীতে সূর্যের আলো আসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ০° ফারেনহাইটের নিচে নেমে আসবে, এক বছরের মধ্যে তা হবে -১০০° ফারেনহাইট, মহাসাগরগুলির উপরের স্তরের পানি বরফে পরিনত হবে। আবার এ বরফস্তরের কারণেই মহাসাগরগুলির গভীর তলের পানি সম্পূর্ণ বরফ হতে অনেক সময় নিবে।

কিছু অণুজীব ও মৃতদেহখেকো পশু-পাখি ছাড়া পৃথিবীর অন্য সব প্রাণি স্বল্প সময়ের মধ্যে মারা যাবে। তীব্র ঠান্ডা বেচেঁ থাকা ঐসব প্রাণের অস্তিত্বও বিলীন করে দেবে। সালোক-সংশ্লেষণ প্রক্রিয়া থেমে যাবে বলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অধিকাংশ উদ্ভিদ মরে যাবে। শুধু কিছু বয়স্ক উদ্ভিদ মারা যেতে ২/৩ দশক সময় নিতে পারে, এদের ধীরগতির বিপাক ক্রিয়া ও দেহে সঞ্চিত শর্করার বদৌলতে।

এদিকে কয়েক মিলিয়ন বছর পর পৃথিবী পৃষ্ঠের তাপমাত্রা -৪০০° ফারেনহাইটে এসে স্থির হবে। এমন নয় যে, প্রাণি ও উদ্ভিদের বিনাশ ঘটার পর পৃথিবী নামক বস্তুটি টিকে যাবে। ৯ কোটি ৩০ লাখ মাইল দূর থেকে সূর্য পৃথিবীকে শুধু আলো আর তাপই দিচ্ছে না, নিজের মধ্যাকর্ষন শক্তি দিয়ে সূর্য পৃথিবীকে এর কক্ষপথে ধরেও রাখছে।

সূর্যের হাইড্রোজেন ফুরিয়ে গেলে সূর্য তার ভর হারাবে। সূর্য ভর হারালে সূর্যের মধ্যাকর্ষন শক্তিও আর থাকবে না। সে ক্ষেত্রে পৃথিবী সৌরজগতের বাঁধন থেকে মুক্ত হয়ে ছিটকে বেরিয়ে আসবে, দ্রুত এগিয়ে যাবে অনিবার্য ধ্বংসের পথে। তার মানে ৫০০ কোটি বছরের কিছু বেশি সময় পর পৃথিবী নিশ্চিতভাবে ধ্বংস হচ্ছে।

অনেকের মতে, আরো আগেই পৃথিবী বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। ১১০ কোটি বছর পর সূর্যের আলোর উজ্জ্বলতা বর্তমানের চেয়ে ১০% বেড়ে যাবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে তখন পৃথিবীতে প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দেবে, জলীয় বাষ্প মহাশূন্যে গিয়ে আর ফিরবে না বলে পৃথিবীর বায়ুমন্ডল শুকিয়ে যাবে।

৩৫০ কোটি বছর পর সূর্যের আলো এখনকার চেয়ে ৪০% বেশি উজ্জ্বল হবে। পৃথিবী তখন এত উত্তপ্ত হবে যে, মহাসাগরগুলির পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে, মেরু অঞ্চলের বরফ স্থায়ীভাবে গলে যাবে, পৃথিবীতে কোনো জীবনের অস্তিত্ব থাকবে না।

পৃথিবী ধ্বংসের সম্ভাব্য অন্য মহাজাগতিক কারণ হতে পারে পৃথিবীতে কোনো গ্রহাণুর আঘাত হানা। উপগ্রহ, গ্রহ, নক্ষত্র ও ছায়াপথ ছাড়াও মহাশূন্যে আছে জানা-অজানা অনেক বস্তু যেগুলি মহাশূন্যের অসীম প্রান্ত ধরে সর্বদা তীব্র গতিতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ছুটে চলছে। এগুলির মধ্যে রয়েছে উল্কা, ধুমকেতু ও গ্রহাণু।

উল্কা প্রায়ই পৃথিবীতে এসে পড়ছে। কিন্তু আকারে ছোট বলে এগুলি তেমন কোনো ক্ষতি করতে পারে না। অবশ্য ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারীতে রাশিয়ায় পড়া একটি উল্কাপিণ্ড ১,২০০ জন মানুষকে আহত করেছে। ধুমকেতু উল্কার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিসাধন করার ক্ষমতা রাখে। তবে সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক হল গ্রহাণুর আঘাত।

সূর্য ও এর কিছু গ্রহকে কেন্দ্র করে অসংখ্য গ্রহাণু ঘুরে বেড়াচ্ছে। এগুলি সর্বোচ্চ ৯৪০ কিলোমিটার থেকে সর্বনিম্ন ৬ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। সৌরজগৎ সৃষ্টির সময় ভাঙ্গা-গড়ার খেলায় এগুলির সৃষ্টি। যদি এদের গতিপথে কোনো গ্রহ এসে পড়ে তাহলেই সর্বনাশ, তখন যে সংঘর্ষ হয় তার ভয়াবহতা আছড়ে পড়া গ্রহাণুর আকারের উপর নির্ভর করে।

অতীতে অনেক গ্রহাণু পৃথিবীর উপর আছড়ে পড়েছে। ছোট আকারের একটি গ্রহাণুর পতন একটি শহর ধ্বংস বা ভয়ংকর সুনামির কারণ হতে পারে। ৪০২ মিটার প্রস্থের কোনো গ্রহাণু আঘাত করলে বৈশ্বিক বিপর্যয় সৃষ্টি হবে, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পারমাণবিক ঝড় সৃষ্টি হবে।

যদি আরো বড় কোনো গ্রহাণুর সাথে পৃথিবীর সংঘর্ষ হয় তবে তা পৃথিবীকে বসবাসের অনুপযোগী করে ফেলবে। সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে কয়েক ডজন গ্রহাণু চিহ্নিত হয়েছে যেগুলির কক্ষপথ পৃথিবীর যথেষ্ট কাছাকাছি এসে পড়ে সংঘর্ষের আশংকা তৈরী করে।

গ্রহাণুর সাথে সংঘর্ষের সম্ভাবনার বিষয়টি ২০ থেকে ৩০ বছর আগে জানা গেলে তা প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে, আঘাত হানার পূর্বেই গ্রহাণুটিকে ধ্বংস করে দিয়ে বা গ্রহাণুটির গতিপথ বদলে দিয়ে। কিন্তু ঠিক সময়ে জানা না গেলে বা গ্রহাণুটির ব্যাস ১ কিলোমিটারের বেশি হলে পৃথিবীর বিপর্যয় রোখার কোনো উপায় নেই।

বলা হচ্ছে, ‘1997XF11’ নামক একটি গ্রহাণু ২০২৮ সালে পৃথিবীকে আঘাত করবে। তবে এ আশংকা জোরালো নয়। আবার ‘2013 TV135’ নামের ৪১০ মিটার প্রস্থের আরেকটি গ্রহাণু ২০৩২ সালে পৃথিবীতে আঘাত হানতে পারে। এর পতনে যে বিস্ফোরন হবে তা পৃথিবীর বৃহত্তম পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরনের চেয়ে ৫০ গুন বেশি শক্তিশালী হবে।
(তথ্যসূত্রঃ NASA ও মহাশূন্য বিষয়ক ওয়েবসাইটসমূহ।)

পৃথিবী ধ্বংস হতে পারে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণেও। ৯টি দেশের হাতে ১০,১৪৪টি পারমাণবিক বোমা মজুদ রয়েছে, প্রায় ৪,০০০ টি সক্রিয়। এগুলির বিস্ফোরন ঘটিয়ে পৃথিবীকে কয়েকবার ধ্বংস করা যাবে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় এ আশংকা ছিল। আপাততঃ এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা কম।

Greenhouse Effect-কে তীব্রতর করে তোলা পৃথিবী ধ্বংসের আরেক পথ। পৃথিবী তার উপর পতিত সৌররশ্মির ৩০% প্রতিফলন করে। এ প্রতিফলিত রশ্মির বিকিরণ করা তাপ পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের কিছু গ্যাস দ্বারা শোষিত হয় এবং আবার বায়ুমন্ডলের নিম্নস্তরে ফিরে এসে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ায়। এটাই Greenhouse Effect বা গ্রীণহাউস প্রতিক্রিয়া। ওই গ্যাসগুলি গ্রীণহাউস গ্যাস নামে পরিচিত।

জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার, বনাঞ্চল ধ্বংস, সিমেন্ট উত্পাদন ইত্যাদি কারণে পৃথিবী থেকে অধিক হারে গ্রীণহাউস গ্যাস যেমন; কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড প্রভৃতি নির্গত হচ্ছে।

এগুলি বায়ুমণ্ডলে গিয়ে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ানোয় ভুমিকা রাখছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়লে বরফ গলে সমুদ্রের পানি বেড়ে যাবে। এতে পৃথিবীর স্থলভাগ সমুদ্রে তলিয়ে যাবে, জলবায়ু বদলে যাবে, পরিবেশ ধ্বংস হবে। ফলে পৃথিবীতে প্রাণি ও উদ্ভিদের বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

সুর্যের মৃত্যুতে ৫০০ কোটি বছরের কিছু পরে পৃথিবী অনিবার্যভাবে ধ্বংস হবে। এর পূর্ব সময় পর্যন্ত মানুষের কয়েক লক্ষ প্রজন্ম পৃথিবীতে এসে বাস করতে পারবে। কিন্তু মানুষ যদি আগেই পৃথিবীকে ধ্বংস করে ফেলে তাহলে ভবিষ্যতের ঐ প্রজন্মগুলি পৃথিবীতে আসার আর সুযোগ পাবে না।

এমন আত্মবিনাশী কাজ কি করতেই হবে?