ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

বয়স কিছু মানুষকে বিভ্রান্ত করে ফেলে। তাই বলে সত্যের নির্যাসে জারিত ইতিহাসের বিপক্ষে বলাটাও কি বিভ্রান্তি? গত ১০ই জুনের দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে উল্লেখিত বিষয়ের প্রেক্ষিতে এ লেখা। মে মাসে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশীদের এক উৎসবে গিয়ে বাংলা মোটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছেন, “ব্রিটিশ আমলে সুশাসন ছিল।” প্রবন্ধকার এ উক্তির প্রতিবাদ করেছেন। করারই কথা।

এমন একটা মুর্খ উচ্চারণ শুনে চুপ থাকা যায়? কোনো লোক যদি অধ্যাপক সায়ীদের দুই হাত আটকে দিয়ে জোর করে তাঁর ঘাড়ে চড়ে বসে তাঁর মাথায় তাঁরই গাছের কাঁঠাল ভেঙ্গে খায় তবে সেই লোককে তিনি কি বলবেন? বলা বাহুল্য, মিথ্যা মূর্খের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে।

আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন, অনেক বছর ধরে শিক্ষাকেন্দ্রিক কর্মকান্ডে যুক্ত আছেন। তিনি নিঃসন্দেহে আসল সত্যটা জানেন। জেনে-শুনে তিনি সেই সত্যকে ঢেকে রাখতে চেয়েছেন, যাদের কাছ থেকে অনুদানের নামে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নিয়ে আসছেন তাদেরকে খুশি করতে।

সুশাসনের প্রথম দাবি শোষণ দূর করা। কিন্তু ব্রিটিশদের মূল লক্ষ্যই ছিল যত বেশি সম্ভব শোষণ করা। সব ব্রিটিশই যেমন পেরেছে তেমন লুটপাট করেছে। সাধারণ কেরানি হিসেবে আসা ইংরেজরাও ফেরার সময় ধনী হয়ে ফিরে গেছে। যেমন হয়েছিল পলাশীর খলনায়ক ক্লাইভ।

ব্রিটিশরা তাদের পক্ষে কাজ করার জন্য জমিদার নামের অনেক ভৃত্য নিয়োগ করেছিল। শোষণ ও অত্যাচার করার ক্ষেত্রে এ পাশবিক প্রাণীরা ছিল ব্রিটিশদেরও বাড়া। ব্রিটিশদের লুটপাটের একটা ভাগ এদের ঘরে যেতো। তাই এ ভৃত্যরা আনন্দের সাথে সাধারণ মানুষের রক্ত চোষতো।

সুশাসনের আরেক পূর্বশর্ত হলো আইনের শাসন নিশ্চিত করা। ব্রিটিশদের গোলাম জমিদারদের বাড়ির সামনে দিয়ে জুতা পায়ে হেঁটে গেলে সাধারণ মানুষকে চাবুক পিটা খেয়ে আধমরা হতে হতো। এ নিয়ে কোনো মানুষ মুখ খুলতে পারতো না। গোলামরাই এতটা করেছে। তাই তাদের প্রভু ব্রিটিশরা কী করেছে তা সহজেই অনুমেয়।

ব্রিটিশদের ‘সুশাসনের’ দরুন ভারতবর্ষের মানুষ কখনো তিতুমীরের বাশেঁরকেল্লায়, কখনো মীরাটের বন্দিশালায়, কখনো বাহাদুর শাহ পার্কে, কখনো অমৃতসরের বাগানে আবার কখনো দিল্লির রাজপথে বন্দুকের গুলি খেয়ে অকাতরে প্রাণ দিয়েছে, ক্ষুদিরাম হয়ে ফাঁসির মঞ্চে গিয়েছে।

ব্রিটিশরা ব্যবসা করার কথা বলে বাংলায় এসেছিল। যে চুক্তির বলে তারা ব্যবসা করার অনুমতি পায় কিছুদিনের মধ্যেই তারা তা খেলাপ করে, স্থানীয়দের ঠকাতে শুরু করে। বাংলার শাসক সিরাজুদ্দৌলার হুমকিতে তারা বারকয়েক চুক্তি মানার ওয়াদা করে, পরে আবার তা ভঙ্গ করে। এজন্য সিরাজুদ্দৌলা ব্রিটিশদের তাড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

চতুর ব্রিটিশরা তাই সিরাজদ্দৌলাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। টাকা ও ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে তারা এদেশীয় কিছু মুনাফিককে হাত করে। সেই মীরজাফরদের বেঈমানিতে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সিরাজুদ্দৌলা পরাজিত ও নিহত হন। ব্রিটিশ ‘সুশাসনের উজ্জ্বল মানবিক’ যাত্রার সেই শুরু।

ব্রিটিশরা তখন বাংলার শাসন ক্ষমতার নেপথ্য কুশলী হয়ে উঠে। শুরু হয় তাদের অবাধ শোষণ, নির্যাতন ও লুটপাট। স্বল্প সময়ের ভিতর তারা পুরো ভারতবর্ষ দখল করে নেয়। এদেশের মানুষের কাছ থেকে আদায় করা খাজনা তারা নিজেদের দেশে পাচার করতে থাকে। এসব কোন্ সুশাসনের বৈশিষ্ট্য?

ব্রিটিশরা মুসলমান সৈন্যদেরকে দেয় শূকরের চর্বি থেকে তৈরী কার্তুজ আর হিন্দু সৈন্যদেরকে দেয় গরুর চর্বি থেকে তৈরী কার্তুজ। রাইফেলে লোড করার আগে দাঁত দিয়ে কামড়ে এগুলি খুলতে হতো। বিষয়টি জানার পর জ্বলে উঠে উভয় ধর্মের সৈন্যরা। শুরু হয় ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ। জনগণের ব্যাপক সমর্থন পায় এটি।

কিন্তু আবারো এদেশীয় দালালদের সাহায্য নিয়ে জয়ী হয়ে যায় ব্রিটিশরা। এরপর তারা সৈন্যদের যেমন তেমনি সাধারণ মানুষদেরকেও পাইকারি হারে হত্যা করে, গাছে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেয়, ভীতি সৃষ্টি করতে রাস্তার পাশে তাদের লাশ লটকিয়ে রাখে। ধর্মকে অপমান করা কোন্ সুশাসনের জন্য জরুরী?

১৯১৯ সালের ১৩ই এপ্রিলে পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরের জালিয়ানওয়ালা বাগ নামের এক বাগানে নারী ও শিশুসহ কয়েক হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল শিখ নববর্ষ উদ্‌যাপন উৎসবে। এটাকে প্রতিবাদ সভা মনে করে ব্রিটিশ সৈন্যরা সেই মানুষদের উপর নির্বিচারে গুলি চালায়।

এতে ১ হাজার জনেরও বেশি নিরীহ মানুষ নিহত হয়, আহত হয় প্রায় ২ হাজার জন। বাগানটি চারদিকে আবদ্ধ ছিল। বেরুনোর জন্য যে কয়েকটি সঙ্কীর্ণ পথ ছিল সেগুলি বন্ধ করে দেয়া হয়। গুলির হাত থেকে বাঁচতে অনেকে তাই বাগানের ভিতরের কুয়াতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ‘সুশাসনের’ কী অভূতপূর্ব উদাহরণ!

ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী যেসব নারী প্রতিবাদী হতেন তাদেরকে নির্যাতন করতে গিয়ে ব্রিটিশরা তাদের যৌনাঙ্গে গরম ডিম প্রবেশ করাতো। সাঁওতাল বিদ্রোহের নায়িকা ইলা মিত্রও এর শিকার হয়েছেন।

কৃষকেরা খাদ্যদ্রব্যের পরিবর্তে তামাক জাতীয় নেশা দ্রব্য নীল চাষ করতে চান নি। ব্রিটিশরা তখন নির্যাতন করে অসহায় কৃষকদের দিয়ে জোরপূর্বক নীল চাষ করিয়েছে। যেসব কৃষক নীল বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিলেন ব্রিটিশরা তাদেরকে গুলি করে মেরেছে। ‘সুশাসন’, তাই না?

‘বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, আর পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা’ – এ প্রবাদের জন্মই হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। তখন পুলিশের গায়ের গন্ধ পেলে নির্দোষ মানুষেরাও গ্রাম ছেড়ে পালাতো। পুলিশের ঘুষ গ্রহণ, রিমান্ডের নামে নির্যাতন, হরানিমুলক তদন্ত, বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার, বিনা বিচারে আটকে রাখা ইত্যাদির পথপ্রদর্শক ব্রিটিশ ‘সুশাসন’ই।

আমাদের গ্রামের বাড়ির অনতিদূরে একটা ছোট খাল আছে। এর স্থানীয় নাম ‘পেয়াদা খাল’। ছেলেবেলায় এ নামের রহস্য খুঁজতে গিয়ে যা জেনেছিলাম তা হলো, ব্রিটিশ আদালতের এক পেয়াদার ক্রমাগত অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে একদিন কিছু লোক সেই পেয়াদাকে মেরে ঐ খালে ফেলে রাখে। সেই থেকে খালটির এ নাম।

কোনো অপরাধের বিচার শুধু তখনই হয়েছে যখন ঐ ঘটনার সাথে কোনো ব্রিটিশ বা তাদের কোনো ভৃত্য জড়িত ছিল না। সাধারণ মানুষের প্রতি অন্যায় করে কখনো কোনো ইংরেজ বা কোনো জমিদার শাস্তি পায় নি। কোনো কৃষক জমিদারের কোনো অত্যাচারের বিরুদ্ধে কখনো নালিশ করতে পারে নি। তাহলে সুশাসনটা কোথায় ছিল?

আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ আরো বলেছেন, “গত দুই যুগ ধরে দলতন্ত্র চলছে, সব ক্ষমতা হাসিনা-খালেদার হাতে বন্দি।” যত যাই হোক, হাসিনা-খালেদার ক্ষমতার উৎস জনসমর্থন। জনগণের বৃহদাংশ সব সময়ই তাদের দুজনের পিছনে রয়েছে। তাঁরা যে ক্ষমতা ভোগ করছেন তা মানুষেরই দেয়া।

ব্রিটিশরা কোন্ জনগণের সমর্থন নিয়ে এদেশের শাসন ক্ষমতা দখল করেছিল? কোন্ অধিকারে তারা এদেশের সেই সময়কার সহজ-সরল অসহায় মানুষদেরকে নির্যাতন করেছিল? এদেশের সম্পদ লুটে ইংল্যান্ডে নিয়ে যাবার ক্ষমতা কে তাদের দিয়েছিল?

হাসিনা-খালেদা কি এখন কৃষকদের দিয়ে জোর করে কিছু চাষ করাতে পারবেন? জনগণের দাবির মুখে খালেদা তার প্রিয় সঙ্গী জেএমবি জঙ্গিদের গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। হাসিনা নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা বাদ দিয়েছেন জনগণের ইচ্ছাকে সম্মান করে।

মিডিয়া এখন যে কোনো ক্ষমতাবানের কুকীর্তিই প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু ব্রিটিশরা আইন করে মিডিয়ার স্বাধীনতা হরণ করেছিল। অপরাধ করায় মন্ত্রী-এমপির আত্মীয়রাও এখন জেলে যাচ্ছে। ব্রিটিশ আমলে কি এটা কল্পনা করা সম্ভব ছিল?

সরকার জনগণের টাকায় আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের প্রতিষ্ঠানকে ১০ তলা ভবন তৈরী করে দিয়েছে। আর তিনি তোষামোদি করছেন সেই ব্রিটিশদের যারা এ জনগণকে দীর্ঘদিন শোষণ করেছে, দুঃশাসন উপহার দিয়ে গেছে। স্বার্থ বড় বালাই।