ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

পৃথিবীকে শিশুদের জন্য বাসযোগ্য করে তোলা দূরের কথা বরং ভুলে যাওয়া হচ্ছে যে, শিশুরা সর্বোচ্চ সদয় ব্যবহার পাওয়ার দাবিদার।

শিশুদের সঙ্গ অপার্থিব উপহার। তাদের নিষ্পাপ চাহনি, মধুর হাসি, বাঁধনহারা উচ্ছ্বাস, অফুরন্ত প্রাণশক্তি, অশেষ অনুসন্ধিৎসা ও অকৃত্রিম মায়া এ নষ্ট পৃথিবীকে এখনো রঙ্গিন করে রেখেছে।

সেই শিশুদের একজনকে মানুষ আকৃতির কিছু প্রাণি অবর্ণনীয় নিষ্ঠুরতায় পিটিয়ে খুন করেছে, অকল্পনীয় কষ্ট দিয়ে, দেড় ঘন্টা ধরে নির্যাতন করে। মানবশিশু হিসেবে পৃথিবীতে আসার শাস্তি কেন এত কঠিনভাবে পেতে হলো শিশুটিকে?

খুনিরাই এ ঘটনার ভিডিও অনলাইনে আপলোড করেছে। সেই ভিডিও দেখার মতো নিষ্ঠুর হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয় বলে তা দেখার দুর্ভাগ্যে আমি নিজেকে জড়াই নি। আমি আগেই খবরটা পত্রিকায় পড়েছি, মরণযাত্রী অসহায় শিশুটির যন্ত্রণাকাতর শেষ কথাগুলি জেনেছি।

একটি শিশুকে বেঁধে পিটানো হচ্ছে, পিটুনি খেয়ে শিশুটি চিৎকার করছে, “আমি মরে যাচ্ছি, কেউ আমারে বাঁচাও”, তারপরও হাতি সাইজের জানোয়ারগুলি তাকে পিটিয়ে যাচ্ছে, পানি খেতে চাওয়ায় শিশুটিকে ঘাম খেতে বলা হচ্ছে – এটা কল্পনা করাই কষ্টকর। আবার ভিডিওতে তা দেখা!

মানব প্রজাতির সেরা অংশ শিশুদেরকে কেনো এমন বর্বরতার মুখোমুখি হতে হবে? বেচেঁ থাকার জন্য কেনো তাদের করুণ আর্তনাদ করতে হবে? দুনিয়া যদি শিশুদের মতো স্বর্গীয় সৃষ্টির প্রতি এমন নির্মম হয়ে যায় তবে কী দরকার পঁচে যাওয়া এ দুনিয়াকে সিল্কের কাপড়ে জড়িয়ে রাখার?

শিশুটির উপর যে জান্তব নির্যাতন করা হয়েছে তার বর্ণনা দেয়ার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। আমি শুধু ময়নাতদন্তের রিপোর্টটা উল্লেখ করছি। ওখানে বলা হয়েছে, মাথায় আঘাতের ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও তার শরীরে আরো ৬৪টি আঘাত রয়েছে।

এক খুনি আগেই ধরা পড়েছে। পালিয়ে যাওয়া আরেক খুনি সৌদি আরবে আটক হয়েছে। এদের বিচার করা হবে। কিন্তু রাজন নামের শিশুটি বুকফাটা আর্তনাদ করে পৃথিবীর আকাশ যেভাবে কাঁপিয়ে দিয়ে গেছে তা শুধু খুনিদের শাস্তি দেয়াতেই থেমে যাবে না।

এ খুন নিয়ে ব্যাপক ফেসবুকিং হয়েছে বলেই হয়তো খুনিরা দ্রুত ধরা পড়েছে। তবে ফেসবুকিং করাই সব নয়। যদি ফেসবুকের বাইরে মানবিক হওয়া সম্ভব না হয় তাহলে এসব ফেসবুকিং একেবারেই মূল্যহীন হয়ে পড়বে। শুধু লেখালেখির মধ্যে দায়িত্বকে আটকে রাখলে মানবিক হয়ে উঠা যাবে না।

ফেসবুকে প্রকাশ করা অনুভুতিটা যদি বাস্তবেও সবার মাঝে থাকতো তাহলে রাজন বেচেঁ যেতে পারতো, আরো অনেক শিশুও রক্ষা পেতো। রাজনের উপর যে নির্যাতন করা হয়েছিল তার প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকে নিশ্চয়ই ফেসবুকে মানবতার জয়গান গায়। এরা কেনো রাজনকে বাঁচাতে এগিয়ে গেল না?

অনলাইনে যুক্ত নয় এমন কিছু সাধারণ মানুষই নিজেদের মানবিক ভুমিকা পালন করেছে, রাজনার লাশ গুম করতে বাঁধা দিয়েছে, এক খুনিকে আটকিয়েছে। নয়তো রাজন শুধু তার পরিবারের কাছেই সংবাদ হয়ে থাকতো আর অনলাইনের কেউও তাকে নিয়ে লেখালেখি করতো না।

পুলিশের এক সদস্য ঠিকই ঘুষ খেয়ে মূল আসামীকে ছেড়ে দিয়েছিল। এই আসামীকে এখন সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে হচ্ছে। এই ঘুষখোর পুলিশেরা হাজারো ফেসবুকারের পরিবারের সদস্য। এরা যখন নিজেদের নোংরা হাতে খুনিদের কাছ থেকে টাকা নেয় তখন ঐ ফেসবুকারদের লজ্জা হয় না?

একই সময়ে একই ধরণের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যাওয়া আরেক শিশুর কথা নিশ্চয়ই অধিকাংশ ফেসবুকারের নজরে পড়ে নি। সেই শিশুর বয়স আরো কম, মাত্র ৮। গার্মেন্টস কর্মীর ছেলে চট্রগ্রামের এই শিশুকে পিটিয়ে খুন করেছে তার বোনের স্বামী।

শিশুটি কাউকে না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল বলে ঐ জানোয়ার শিশুটিকে কয়েক দফা পিটায়, শেষবার পিটাতে পিটাতে শিশুটির মাথা দেয়ালের সাথে জোরে ঠুকে দেয়। এতে মারা যায় শিশুটি। দু’দিন আগে ঢাকায় জবাই করে খুন করা হয়েছে এক কিশোরীকে। ওটাও ফেসবুকে তেমন ঝড় তুলে নি। কারণ জবাইয়ের ভিডিওটা দেখা যায় নি।

শিশুদের বাঁচাতে তাই ফেসবুকে ঝড় তোলা ফেসবুকার নয়, মানবিক অনুভুতিসম্পন্ন মানুষের প্রয়োজন।