ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কোনো এক খেলার দিন দু’জন মানুষ গ্যালারিতে পতাকা বিছিয়ে নামায পড়েছেন। এক উৎসাহী ব্যক্তি পতাকার উপর দণ্ডায়মান সেই নামাজরত লোকদের ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। কেউ পতাকার উপর দাঁড়িয়ে নামায পড়াকে অপরাধ মনে করছেন, আবার কেউ ঐ লোক দু’জনকে সমর্থন করছেন।

জাতীয় পতাকা এমন একটা প্রতীক যা একটি দেশের পরিচয় বহন করে। দুনিয়ার সব দেশের মানুষই নিজেদের পতাকাকে সম্মান করে। পতাকাকে সম্মান করার অর্থ দেশের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করা। এটা স্বাভাবিক একটা অনুভুতি।

সেই হিসেবে পতাকাকে অসম্মান করা অবশ্যই ভুল, আর জেনে-শুনে তা করা নিঃসন্দেহে অপরাধ বলে গণ্য হবে। আইন তাই বলছে। ভুলে যাওয়ার কথা নয় যে, দেশে জাতীয় পতাকা বিষয়ক একটা আইন আছে। সুনাগরিক হিসেবে যে কোনো আইন মানা কর্তব্য, না মানলে আইন ভঙ্গের দায় নিতে হবে।

পৃথিবীর সব সংস্কৃতিতেই শ্রদ্ধেয় বস্তুকে পা দিয়ে স্পর্শ করা অশ্রদ্ধার প্রকাশ বলে বিবেচিত হয়। যদিও শ্রদ্ধাবোধটা সম্পূর্ণ মনের ব্যাপার তথাপি মানুষের এ অনুভুতিকে অস্বীকার করা যায় না। কোনো এক বিচিত্র কারণে মানুষ তার নিজের দেহেরই অংশ পা-কে অশ্রদ্ধার প্রতীক বলে মনে করে।

এর কারণ যাই হোক, পা দিয়ে কোনো পবিত্র বস্তুকে মাড়ানো অশ্রদ্ধামুলক কাজ হিসেবে সর্বজনগ্রাহ্য। তাই জাতীয় পতাকার উপর পা দিয়ে দাঁড়ানো মানে একে অসম্মান করা। সেই হিসেবে ঐ দু’জন লোক অবশ্যই ভুল করেছেন, হোক তা নামায পড়ার খাতিরে। নামায যদি পড়তেই হবে তবে কেনো সেই রকম ব্যবস্থা করে যাওয়া হয় নি?

তারা দু’জন নামাযী, নামাযের সময়টা সুনির্দিষ্ট, খেলার সময়ও। খেলা দেখতে গিয়ে যে নামাযের সময় হবে এবং নামায পড়া লাগবে তা তারা জানতেন। তাহলে কেনো তারা ছাদর জাতীয় কোনো কাপড় বা অন্তত: একটা পত্রিকা সঙ্গে রাখলেন না? মানুষ পত্রিকা বিছিয়ে অহরহ নামায পড়ে।

তাই নামায পড়ার জন্য পতাকার উপর দাঁড়িয়েছেন বলে তাদের ভুলকে শুদ্ধ বলে চালিয়ে দেয়া যাবে না। তারা এ পরিস্থিতি এড়িয়ে নামায পড়তে পারতেন যদি তারা যথাযথ সচেতন থাকতেন এবং একই সঙ্গে নামায ও পতাকার গুরুত্ব অনুধাবন করতেন।

তবে এটা শুধুই একটা ভুল, কোনভাবেই অপরাধ নয়। তারা নামায পড়েছেন বলে যে এমন বলছি তা নয়। আগেই উল্লেখ করেছি, নামায এ ভুলের কারণ হতে পারে না। এটা কেনো অপরাধ নয়, শুধু ভুল তা বোঝা যাবে অন্য একটি বিষয়ের প্রতি নজর দিলে।

তারা জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা প্রদর্শন করেন নি – এ অভিযোগেই সমালোচনা হচ্ছে। নামায পড়ার বাধ্যবাধকতায় ও যথাযথ সচেতনতার অভাবে পতাকার উপর দাঁড়িয়ে তারা অনিচ্ছুকভাবে পতাকা সংক্রান্ত বিধি ভঙ্গ করেছেন ঠিকই, কিন্তু জাতীয় পতাকার প্রতি তাদের ভালোবাসা ছিল না – এটা বলার সুযোগ কোথায়?

পতাকাকে, দেশকে ভালোবাসেন বলেই তারা পতাকা নিয়ে মাঠে গিয়েছিলেন খেলা দেখতে, রোদ-বৃস্টি উপেক্ষা করে রোজার কস্ট সহ্য করে আরো অনেকের সাথে মিলে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে দেশকে সমর্থন করে গেছেন প্রায় ৮ ঘন্টা যাবত। যারা খেলা বুঝেন তারা জানেন টিভির সামনে বসে খেলা দেখা দর্শকের চেয়ে মাঠের দর্শকের গুরুত্ব কত বেশি।

দেশের প্রতি তথা জাতীয় পতাকার প্রতি তাদের ভালোবাসাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা তাই অবশ্যই ভুল ও উদ্দেশ্যমুলক।কিন্তু পতাকার উপর দাঁড়িয়ে নামায পড়ার জন্য এ দু’জনের ফাঁসি দাবি করে ফেলেছে গণজাগরণ মঞ্চের সাথে সংশ্লিষ্ট একজন। একেবারে ফাঁসি!

এমনকি ইচ্ছাকৃতভাবে জাতীয় পতাকা অবমাননার সর্বোচ্চ শাস্তি এক বছরের কারাদন্ড ও ৫,০০০ টাকা জরিমানা মাত্র। আর এ মঞ্চ কর্মী কি না ঐ লোকদের ফাঁসি চাইছে। যেন ভুল, অপরাধ যাই হোক, সব কিছুর শাস্তি ফাঁসি আর তা ঠিক করে দিবে ঐ মঞ্চের লোকেরা।

এরা মুখস্থ করা আপ্তবাক্য আওড়ায়, আবার দরকার হলেই ভুলে যায় যে, সবার উপরে মানুষ সত্য। মানুষ রাষ্ট্রের জন্য নয়, রাষ্ট্র মানুষের জন্য। অসচেতনতার দরুন জাতীয় পতাকার উপর দাঁড়িয়েছে বলে যে কারোর জীবন কেড়ে নেয়া যায় না – এ বোধটুকুও এ কর্মীদের নেই।

এদের কপটতারও শেষ নেই। পা দিয়ে জাতীয় পতাকা মাড়ানোর ঘটনা আরো ঘটেছে, এসবের ছবিও আছে। যেমন ১৬ই ডিসেম্বরে মানবপতাকা তৈরীর সময় অসংখ্য জাতীয় পতাকাকে পায়ের তলে ফেলে মাড়ানো হয়েছে। তখন এ মঞ্চ কর্মীর ঠোঁট নড়ে নি।

সঠিক মাপে জাতীয় পতাকা না বানানোও পতাকার অবমাননা। প্রতিদিন হাজার হাজার প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। জরিপ বলছে, এ পতাকাগুলির শতকরা ৮০ ভাগই দৈর্ঘ্য-প্রস্থের অনুমোদিত অনুপাত (১০:৬) অনুসারে তৈরী নয়। ঐ কর্মী কি এ ব্যাপারে কখনো মুখ খুলেছে?

যে শেখ হাসিনা নিজের ও দলের কর্মীদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে যুদ্ধাপরাধীদেরকে বিচারের আওতায় এনেছেন গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা নিজেদেরকে সেই শেখ হাসিনার চেয়েও বড় রাজাকারবিরোধী হিসেবে প্রমাণ করতে যায়, কিছু মানুষকে হুজুগে মাতাতে। অথচ শেখ হাসিনা রাজাকারদের বিচার না চাইলে লক্ষাধিক গণজাগরণ মঞ্চ তা নিশ্চিত করতে পারবে না।

প্রথম দিকে গণজাগরণ মঞ্চের সাথে লাখো মানুষ যুক্ত হয়েছিল, আমি নিজেও রাজাকারদের বিচারের দাবিতে তাদের ঐ আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলাম। কিন্তু এর কর্মীরা ব্যক্তিস্বার্থ ও নেতৃত্বলাভকে সবকিছুর উপরে প্রাধান্য দিয়ে আন্দোলনটাকে নষ্ট করে দেয়।

রাজন হত্যার ভিডিও দেখে অসংখ্য মানুষের মধ্যে অনিবার্য ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে দেখে এ মঞ্চ কর্মীরা এটা নিয়ে গলাবাজি করতে দেরি করে নি। কিন্তু একই সময়ে প্রায় একইভাবে নির্যাতিত হয়ে চট্রগ্রামে ৮ বছর বয়সী আরেকটা ছেলে মারা গেলেও সেটা নিয়ে তারা কোনো শব্দ ব্যয় করে নি।

কারণ এ ঘটনার ভিডিও অনলাইনে আপলোড করা হয় নি বলে মানুষের মাঝে সেই ক্ষোভ তৈরী হয় নি। তাই গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরাও ঐ শিশু হত্যার বিচার দাবি করে আন্দোলন গড়ে তোলার কষ্ট করতে যায় নি, মানুষের নজর কাড়বে না বলে তা নিয়ে ফেসবুকিংও করে নি। এই হচ্ছে এদের দেশপ্রেম আর সচেতনতার দৌড়।

এদের একজন এখন পতাকা অবমাননাকারীদের ফাঁসি চেয়ে বসেছে, অবমাননাটা ইচ্ছাকৃত কি না তা না জেনেই। বুকে সত্যিকারের দেশপ্রেম থাকলে মুখে এত নাটকীয় কথা আসে না। এরা হলো দেশপ্রেম ব্যবসায়ী জঙ্গি যেমন বিএনপি, জামাত ও হেফাজত সমর্থকরা হলো ধর্ম ব্যবসায়ী জঙ্গি।

এদিকে কিছু লোক আবার পতাকার উপর দাঁড়িয়ে নামায পড়ার মধ্যে কোনো ভুল দেখতে পাচ্ছে না। পতাকার উপর দাঁড়ানো অবশ্যই ভুল ছিল, সেটা নামাযের জন্য হলেও। নামাযমুখী লোক নিশ্চিতভাবেই বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারতো। এরা দু’জন সচেতনতার অভাবে তা করেন নি।

পরিস্থিতির বিচারে তাদের কাজকে অপরাধ বলা না গেলেও ভুল তো বলতেই হবে। মাতৃভূমির জাতীয় পতাকাকে ঘিরে এমন ভুল করা সচেতন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।