ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

প্রকৃত মেধাবীদের শিক্ষা লাভের ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তেমন কোনো ফ্যাক্টর নয়। প্রান্তীয় জনগোষ্ঠীর সদস্য অনেক অন্ধ, পঙ্গু ও চরম দরিদ্র শিক্ষার্থী পাবলিক পরীক্ষায় তাক লাগানো ফলাফল অর্জন করে প্রায়ই তা জানিয়ে দিচ্ছে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব দেয়া সহজাত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এটা সত্যি যে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে এমন শিক্ষার্থীরাও আছে যাদের অভিবাবকরা সীমিত আয়ে চলেন, অবৈধভাবে উপার্জন করেন না। কিন্তু এরা সংখ্যায় একেবারেই কম। তাছাড়া নিম্নবিত্ত পরিবারের যারা সখ করে সাধারণ কলেজগুলিকে বাদ দিয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় নামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ভর্তি হয় তাদেরকে দিয়ে তো আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্বরূপ আড়াল করে রাখা যাবে না।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে যারা পড়াশোনা করে তাদের অধিকাংশই হচ্ছে ঘুষখোর সরকারী কর্মকর্তা, কালো টাকার মালিক, কর ফাঁকি দেয়া ব্যবসায়ী, চোরাচালানকারী ও অসৎ রাজনীতিবিদদের সন্তান। এদের কাছ থেকে শুধু ভ্যাট আদায় করা কেনো, যদি এদের সব সম্পত্তি জনগণের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করে নেয়া হয় তবে তাও ভুল হবে না।

টিউশন ফির উপর ভ্যাট দেবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রাইভেট মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলি, শিক্ষার্থীরা নয়। শিক্ষার্থীদের এ জন্য বাড়তি কোনো টাকাও দিতে হবে না। ভ্যাটের দোহাই দিয়ে টিউশন ফি বাড়ানোরও কোনো সুযোগ নেই। সরকার স্পষ্ট করে তা বলে দিয়েছে। আর কোনো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ই টিউশন ফি বাড়ানোর কথা বলে নি। তাহলে কেনো এ আন্দোলন?

এ যেন শেয়ালের হুক্কা-হুয়া ডাক। এক শেয়াল নিজ খেয়ালে আওয়াজ তুলেছে তো অন্যগুলিও কিছু না বুঝেই তাতে সুর মিলিয়ে কোরাস গাইছে। এমন নয় যে, ভ্যাট আরোপের ব্যাপারটি আগে একরকম করে বলা হয়েছিল আর এখন অন্যরকম হয়ে গেছে। আগেও বলা হয়েছিল, এ ভ্যাটের হার হবে ৭.৫% এবং তা দেবে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ কর্তৃপক্ষ। এখনও তাই আছে।

শিক্ষার্থীরা টিউশন ফি সুনির্দিষ্ট করে দেয়ার দাবি জানাতে পারে। আর যদি তাদের নিকট হতে বাড়তি টাকা আদায় করার প্রস্তাব করা হত তবে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করা যেত। কিন্তু তা তো করা হয় নি। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলি শিক্ষা ব্যবসা করে প্রতি বছর যে কোটি কোটি টাকা কামাই করছে তা কি লাভ হিসেবে এগুলির মালিকদের পকেটে যাচ্ছে না? সেই লাভের একটা অংশ জনগণের দখলে আসলে সমস্যা কোথায়?

ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলনের নামে শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাসমুহ বন্ধ করে রেখে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে। টাকালোভী বিশ্ববিদ্যালয়গুলির টাকা বাঁচানোর জন্য আন্দোলন করা দরকার মনে করলে নিজেদের প্রতিষ্ঠানে গিয়ে করো, নিজেদের ভুক্তভোগী বানাও, অনশন করো। কিন্তু তা না করে সাধারণ মানুষকে কষ্ট দেয়া কেনো?

আন্দোলনকারীরা জানিয়েছে যে, তাদের বাবারা এটিএম বুথ নয়। কিন্তু তাদের বাবারা আয়করদাতা সুনাগরিক কি না তা জানানোর সাহস হয় নি তাদের। নিশ্চয়ই তারা এটাও বলবে না যে, কীভাবে তাদের অনেকের বাবা মাত্র ১৫,০০০ বা ২০,০০০ টাকা বেতনের চাকরী করে তাদের একজনের পড়াশোনার পিছনেই প্রতি মাসে ১০,০০০ বা তার বেশি টাকা খরচ করেন। ‘No VAT on education’ স্লোগান দেয়ার আগে তাদের উচিত ছিল প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলির শিক্ষা ব্যবসা আসলে কতটা ‘education’ তা জানানো।

এ আন্দোলন নাকি সরকারকে বিপদে ফেলে দিতে পারে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলির শিক্ষার্থীরা কবে কোথায় দেশের কোন্ আন্দোলনে অংশ নিয়েছে? বলা হচ্ছে, শিক্ষা পণ্য নয়। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলি কি শিক্ষাকে পণ্য বানিয়ে নেয় নি? তবে কেনো তাদের প্রাপ্য ফির উপর ভ্যাট বসানো যাবে না?

শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ নিশ্চিত করতে তারা কী না করছে? অধিকাংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিনেও নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা করার অত্যাবশ্যকীয় শর্ত পূরণ করে নি। হিসাবের অডিট না করানো, টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট বিক্রি করা ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের যোগান না দেয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে এগুলির বিরুদ্ধে।

একই ভবনে, এমনকি একই ছাদের নিচে রয়েছে একাধিক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। অনেকগুলির মালিকানা নিয়ে চলছে হাস্যকর দ্বন্দ্ব। সরকার কি এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না? নিচ্ছে। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলে চাইলেই এগুলি বন্ধ করে দেয়া যায় না। তার উপর আছে আদালতের বিভিন্ন বিধি-নিষেধ।

৮ কোটি কর্মক্ষম মানুষের দেশে করদাতার সংখ্যা যেখানে মাত্র ২২ লাখ সেখানে সরকার কেনো এ শিক্ষা ব্যবসায়ীদের ভ্যাটের আওতায় নিয়ে আসবে না?