ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

যে ঘটনা নিয়ে লিখছি তা সহজবোধ্য করার জন্য প্রথমে বাংলার শাসনক্ষমতার ঐতিহাসিক বিভিন্ন পর্যায়গুলি সম্পর্কে কিছু বলা প্রয়োজন। বাংলাদেশ নামের এ ভূখন্ডটি অতীতে খুব কমই স্বাধীন একক রাষ্ট্র হিসেবে শাসিত হয়েছে।

যখন একক রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে তখন আবার বর্তমানের সব এলাকা এর সাথে ছিল না, তেমনি ভারতের অনেক অংশও এতে যুক্ত ছিল। স্বাধীন একক রাজ্য হিসেবে বাংলা প্রথম প্রতিষ্ঠা পায় সম্রাট শশাংকের আমলে, গৌড় নামে। এরপর এটা কখনো বিভক্ত হয়েছে, কখনো অন্য রাজ্যের সাথে প্রদেশ হিসেবে যুক্ত থেকেছে।

মুঘল শাসনামলে বাংলা ছিল ভারত রাজ্যের একটি বড় সুবা বা প্রদেশ। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, বিহার এবং উড়িষ্যাও সেই বাংলার সাথে সংযুক্ত ছিল। একজন সুবেদার মুঘলদের হয়ে বাংলা শাসন করতেন। দেওয়ান পদে নিযুক্ত ব্যক্তি সুবার আর্থিক বিষয়াদি তত্ত্বাবধান করতেন। সম্রাট আওরঙ্গজেব ১৭০০ সালে মুর্শিদকুলী খাঁকে বাংলার দেওয়ান হিসেবে নিয়োগ দেন।

বাংলার ইতিহাসের বড় বাঁক বদল ঘটে মুর্শিদকুলী খাঁর হাত ধরেই। তখন বাংলার সুবেদার ছিলেন আওরঙ্গজেবের নাতি আজিমুশ্বান। মুর্শিদকুলী খাঁর আগমনে তিনি খুশি হন নি তবে বাধ্য হয়ে তাকে তা মেনে নিতে হয়। মুর্শিদকুলী খাঁ প্রথমে ঢাকায় ছিলেন, এরপর নিরাপত্তার খাতিরে তিনি মুকশুসাবাদে চলে যান যা পরে মুর্শিদাবাদ নামে পরিচিত হয়।

১৭০৩ সালে আজিমুশ্বানকে বাংলা থেকে ফিরিয়ে নেয়া হয় এবং ফররুখশিয়ার নামকাওয়াস্তে বাংলার সুবেদার হন। সুবা দফতর মুকশুসাবাদে স্থানান্তরিত হয়, বৃদ্ধি পায় মুর্শিদকুলী খাঁর ক্ষমতা ও প্রভাব। ১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর আজিমুশ্বানের পিতা প্রথম বাহাদুর শাহ দিল্লির সম্রাট হন। তিনি মুর্শিদকুলী খাঁকে বাংলা থেকে সরিয়ে দেন।

পুত্র আজিমুশ্বানকে তিনি আবার বাংলার সুবেদার পদে নিয়োগ দেন। আজিমুশ্বানের চাওয়াতেই ১৭১০ সালে মুর্শিদকুলী খাঁকে পুনরায় দেওয়ান হিসেবে বাংলায় ফিরিয়ে আনা হয়। আর ফররুখশিয়ার সম্রাট হয়ে মুর্শিদকুলী খাঁকে বাংলার সুবেদার নিয়োগ করেন ১৭১৭ সালে। মুর্শিদকুলী খাঁ তখন একই সাথে দেওয়ান ও সুবেদার উভয় পদের ক্ষমতা পেয়ে যান।

এ অবস্থায় মুর্শিদকুলী খাঁ নিজেকে বাংলার নবাব বলে ঘোষনা করেন, বাংলার প্রশাসনিক কর্মকান্ডে মুঘলরা যাতে হস্তক্ষেপ করতে না পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। দুর্বল হতে থাকা মুঘলরাও এ নিয়ে মাথা ঘামায় নি। ফলে মুর্শিদকুলী খাঁ বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব হিসেবে আভির্ভূত হন আর বাংলাও প্রায় স্বাধীন হয়ে যায়।

এবার আসি মূল কাহিনীতে। মুর্শিদকুলী খাঁর কোনো পুত্র সন্তান ছিল না। তাই তার নির্দেশানুযায়ী তার মৃত্যুর পর ১৭২৭ সালে তার নাতি সরফরাজ খাঁ বাংলার নবাব হন। কিন্তু সরফরাজ খাঁকে নবাব বলে মেনে নেন নি তারই পিতা শুজাউদ্দিন খাঁ। তিনি নিজ পুত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আয়োজন করেন। সরফরাজ খাঁ পিতার সাথে যুদ্ধ এড়াতে স্বেচ্ছায় পিতাকে সিংহাসন ছেড়ে দেন।

পুত্রের মহানুভবতায় মুগ্ধ শুজাউদ্দিন খাঁ পুত্রকে নিজের উত্তরাধিকারী করে যান। পিতার মৃত্যুর পর ১৭৩৯ সালে সরফরাজ খাঁ আবার বাংলার নবাব পদে আসীন হন। কিন্তু নবাবীত্বে তার কোনো আগ্রহ ছিল না। তিনি ছিলেন ধার্মিক ও সাধু প্রকৃতির লোক। শুধুমাত্র নানার ইচ্ছা পূরণেই তিনি নবাব হয়েছিলেন।

রাজ্যের শাসনকার্য পরিচালনার দায়িত্ব তিনি ঘনিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তির উপর ছেড়ে দেন। এদের মধ্যে ছিলেন আলিবর্দি খাঁ ও তার ভাই হাজি আহমেদ যারা আর্থিক সংকটে পড়ে শুজাউদ্দিন খাঁর কাছে এসে চাকরি নিয়েছিলেন। আলিবর্দি খাঁ সুদক্ষ সেনাপতি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এছাড়া তিনি পাটনার নাজিমও নিযুক্ত হয়েছিলেন।

এর বিনিময়ে আলিবর্দি খাঁ সরফরাজ খাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। তিনি মুঘল সম্রাটকে চিঠি লিখে জানান, বাংলার ক্ষমতা দখলে দিল্লি যদি তাকে সমর্থন করে তবে তিনি উপহার হিসেবে সম্রাটকে ১ কোটি রুপি দিবেন, সঙ্গে থাকবে সরফরাজ খাঁর সব সম্পত্তিও। এ কৌশল তাকে দিল্লির সমর্থন পাইয়ে দেয়। তিনি তখন সরফরাজ খাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন।

একই সময়ে তিনি সরফরাজ খাঁকে জানান যে, যুদ্ধ করতে নয়, বরং নবাবের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতেই তিনি সৈন্য সহ মুর্শিদাবাদে আসছেন। সরফরাজ খাঁ এ কথাই বিশ্বাস করতে চেয়েছিলেন কিন্তু ঘটনাক্রমে পরে অনুগত সৈন্যদের নিয়ে আলিবর্দি খাঁকে প্রতিরোধ করতে অগ্রসর হন। তিনি ভাবতে পারেন নি আলিবর্দি খাঁ তাকে খুন করতে চাইছেন।

শেষ পর্যন্ত ১৭৪০ সালের ২৬শে এপ্রিল ভাগিরথী নদীর তীরে গিরিয়া নামক গ্রামে আলিবর্দি খাঁ সরফরাজ খাঁর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। চতুর আলিবর্দি খাঁ নিজ হাতে নিষ্ঠুরভাবে অনভিজ্ঞ যোদ্ধা সরফরাজ খাঁকে খুন করেন এবং নবাবের আসন দখল করেন। ভালো মানুষ সরফরাজ খাঁ তার কাছাকাছি থাকা বিশ্বাসঘাতককে চিনতে না পেরে চরম মূল্য দেন।

সময়ের পরিক্রমায় পরিস্থিতি পাল্টে যায়। আলিবর্দি খাঁর মৃত্যুর পর তার নাতি সিরাজুদ্দৌলা ১৭৫৬ সালে বাংলার নবাব হন। মানবিকতার ধারক ও বীর মুক্তিসংগ্রামী সিরাজুদ্দৌলাও সরফরাজ খাঁর মতোই নিজের প্রধান সেনাপতি মীরজাফরের জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতায় ক্ষমতা হারান, খুন হন, তাও ১ বছরেরই মাথায়, ১৭৫৭ সালে। এ কি মৃত আলিবর্দি খাঁর বিরুদ্ধে প্রকৃতির প্রতিশোধ ছিল?

যে জগৎ শেঠের সাহায্য নিয়ে তিনি সরফরাজ খাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করেছেন সেই জগৎ শেঠ তার নাতির বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্র পাকিয়েছে। যে সিরাজুদ্দৌলার করুণ মৃত্যু আমাদের দুঃখ দেয় সেই সিরাজুদ্দৌলার নানা আলিবর্দি খাঁ তার নিয়োগকর্তার সাথে ঠিক মীরজাফরের মতো বেঈমানি করেছেন। তাই কলংকের দাগ মীরজাফরের গায়ে যতটা আলিবর্দি খাঁর গায়েও ততটা।

যে কাপুরুষেরা রাতের আঁধারে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে খুন করেছিল তাদের পরিণতির কথা এখানে স্মরণ করা যায়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল জিয়া ও মুশতাক। অথচ বঙ্গবন্ধু তাদের খুব বিশ্বাস করতেন। তবে মৃত্যু বঙ্গবন্ধুকে হারাতে পারে নি।
বঙ্গবন্ধু বাংলার আকাশের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র হয়েই আছেন কিন্তু কোথায় সেই খুনি পিশাচেরা?