ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

প্রবাদবাক্যগুলিকে চিরন্তন সত্য কিছু বলে ধরে নেয়ার লোক এ সমাজে কম নেই। তবে এ বাক্যগুলির সবটি যে সঠিক নয় অথবা কিছু প্রবাদবাক্য যে পরস্পর বিপরীতার্থক মত প্রকাশ করে তার নিদর্শনও রয়েছে। ‘দুষ্ট গরুর চেয়ে শুন্য গোয়াল ভাল’ এবং ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল’ – উদাহরণ হিসেবে এ দুটো প্রবাদবাক্যকে বিবেচনা করা যায়। প্রথমটি যা বুঝিয়েছে দ্বিতীয়টি এর সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলছে। অর্থাৎ সত্য হিসেবে এ দুই বাক্যের একইসাথে টিকে থাকার কথা নয়। তাই এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, প্রবাদবাক্য মানেই অনস্বীকার্য কোনো সত্য। তবে কিছু প্রবাদবাক্য অনেক ক্ষেত্রে চুড়ান্ত সত্যটাই প্রকাশ করে, জীবন ও পৃথিবীকে বোঝার ও পরিমাপের পথ দেখায়।

আমার এ লেখার বিষয়বস্তু অবশ্য প্রবাদবাক্য বিশ্লেষণ নয়। বরং একটি প্রবাদবাক্য ব্যবহার করে কিছু কথা বলা। ‘যেমন কর্ম তেমন ফল’। আসলেই। কেউই তার কর্মফলের বাইরে যেতে পারে না। কর্মফলই মানুষের অমোঘ নিয়তি।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী বৃহত্তম দল আওয়ামীলীগের বিপরীতে সময়ের পরিক্রমায় শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে আবির্ভুত হয়েছিল বিএনপি নামক দলটি, যেভাবেই হোক। কিন্তু আজ এ দলটি নিজের অস্তিত্ব বাঁচানোর সামর্থ্যই হারিয়ে ফেলেছে। কেনো? এর সংক্ষিপ্ত উত্তর হল, ভুল পথে গঠিত হওয়া ও কর্মফলের দরুণ। কোনো ষড়যন্ত্র বা অবস্থানই পাপের ফসল হিসেবে জন্ম নেয়া কোনো দলকে টিকিয়ে রাখতে পারে না, কখনো পারে নি। হিটলারের অভাবনীয় সামরিক সামর্থ্য তার দল নাৎসি পার্টিকে রক্ষা করতে পারে নি। পাকি সামরিক স্বৈরাচারদের পদলেহী দল মুসলিম লীগের অস্তিত্ব এখন অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

তাই অস্তিত্বের সংকটে পড়া বিএনপির জন্য সময়ের ব্যাপার ছিল মাত্র। বাংলাদেশের জনগণের এক অংশকে নানা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত করে দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপি যে ফায়দা লুটেছিল তার বিনিময়ে তো তারা তাদের পাপের ফল ভোগ করা থেকে বেঁচে যাবে না। সত্যের আঘাতে মিথ্যার অস্তিত্ব বিলীন হবেই। এ সেই বিএনপি যার প্রতিস্টাতা মদ-জুয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে এগুলির অবাধ ব্যবহার নিশ্চিত করেছিল আবার একই সময়ে ধর্ম রক্ষার ধোঁয়া তুলে দেশের সংবিধানে ‘আল্লার উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ শব্দগুচ্ছ যোগ করে তামাশা করেছিল। এ সুচতুর প্রতারকের প্রকৃত চাওয়া কী ছিল তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।

দু:খজনক ব্যাপার হল, যে ধুরন্ধর দল ধর্মকে এমন নোংরাভাবে ব্যবহার করেছে সেই দলকেই ধর্মের আধার মনে করে এদেশের কিছু সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন খুশি থেকেছে। বলতে গেলে এরা জেনে শুনে প্রতারিত হতে চেয়েছে এবং হয়েছেও, অর্থাৎ এদের মুখে শেখ ফরিদ বগলে ইট।

কেউ তার ইচ্ছে মতো যে কোনো দলকে সমর্থন করতে পারে কিন্তু ধর্মের ব্যাপারটি সুনির্দিষ্ট এবং অনতিক্রম্য। ধর্ম যে কর্মকে পাপ বলে উল্লেখ করেছে সেটাকে পাপ হিসেবেই দেখতে হবে, ধর্ম মানতে চাইলে। এখানে ব্যক্তিগত ইচ্ছের কোনো মূল্য নেই। তাহলে ধর্ম অবমাননাকারী দলকে ধর্ম রক্ষাকারী বলে সমর্থন করার সুযোগ কোথায়?

ষড়যন্ত্র ও খুনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী এক সামরিক স্বৈরাচার ক্যান্টনমেন্টে বসে সরকারী অর্থ খরচ করে সরকারী গোয়েন্দাদের ব্যবহার করে এবং বিভিন্ন দলের পঁচে যাওয়া রাজনীতি ব্যবসায়ীদের ভাগিয়ে এনে যে গোঁজামিল পার্টি গঠন করেছিল তা তো বালির বাঁধের মতো হারিয়ে যাওয়ার জন্যই সৃস্টি হয়েছিল। সেই সময় এখন উপস্থিত হয়েছে।

অথচ দেশের স্বার্থেই, জনগণের বৃহত্তর কল্যাণে আওয়ামীলীগের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সমশক্তির একটি আদর্শ রাজনৈতিক দলের একান্ত প্রয়োজন ছিল, আছে এবং থাকবে। তেমন কোনো দল যে নেই তার দায়ভার নিশ্চয় আওয়ামীলীগের নয়, এ দায়ভার তেমন দল হয়ে উঠতে না পারা বিএনপির, জাসদের এবং অবশ্যই জনগণের একটি অংশের যারা স্বেচ্ছায় চিহ্নিত ভন্ডদের সৃষ্ট বিভ্রান্তিতে পড়ে থাকে।

বিএনপি-জামাতের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চরম বিরোধী হয়েও ব্যক্তিগতভাবে আমি চাই, দেশে আওয়ামীলীগের বিপরীতে এমন একটি রাজনৈতিক পক্ষ থাকুক যারা একটি আদর্শ রাজনৈতিক দলের সব গুণাবলী ধারণ করে আওয়ামীলীগের ভুলগুলির বিরুদ্ধে জনগণের পক্ষে দাঁড়াবে।