ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

 
    বিষয়টা সর্বজ্ঞাত। তবুও আবার উল্লেখ করতে চাই। কারণ উপলব্ধিকে প্রকাশ করার ইচ্ছেটা সহজাত।

    মানুষই এ দুনিয়ার ভাগ্যবিধাতা। তারপরও সেই মানুষই এখানকার সবচেয়ে অসহায় প্রাণী। অন্যসব প্রাণীর সামর্থ্য যেমন সীমিত তাদের চাহিদাও তেমনি কম। মানুষ অসাধারণ এক মস্তিস্কের অধিকারী। অথচ সুখী হওয়ার পাগলপারা প্রতিযোগিতায় মানুষের চেয়ে বেশি ব্যর্থ কোনো জীব আর নেই।

    কিসের বিনিময়ে মানুষ সুখী হওয়ার চেষ্টা করছে না? কোন্ অর্জন মানুষ তার জীবনকথায় লিপিবদ্ধ করে রাখতে চাইছে না এবং রাখছে না? ফলাফল? সেরা অর্জনসমুহের চূড়ায় বসেও মানুষকে বাঁচতে হছে দেহে কৃত্রিম হার্ট লাগিয়ে, ডায়াবেটিসে কাতর হয়ে, সন্তানের বখে যাওয়া অবলোকন করে কিংবা অবৈধ আয়ের উৎস প্রকাশ হয়ে যাওয়ার লজ্জায় লাল হয়ে।

    অন্যভাগে বিরাটসংখ্যক মানবসন্তান উদয়াস্ত খেটে সামর্থ্যের সবটুকু ঢেলে দিয়েও বেঁচে থাকার ন্যুনতম আনন্দটুকুও পাচ্ছে না, হচ্ছে চরম অবিচারের মুখোমুখি। মানবিক বৈশিষ্ট্য ধারণে অগ্রগামী হলেও সুখ লাভে তারা কোটি কদম পিছিয়ে। সুখ তাহলে কাদের জন্য? মানুষের চিন্তাতীত ক্ষমতাসম্পন্ন মস্তিস্ক শেষ পর্যন্ত কী দিচ্ছে মানুষকে?

    হ্যাঁ, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রহস্য উন্মোচনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়াকে মস্তিস্কের একটা অর্থবহ কাজ বলে মানতে হবে। কিন্তু মানবপ্রজন্মের যাত্রা তো উল্টো পথে। মানুষ আত্মবিনাশী গুণের অধিকারী হতেই বেশি ভালোবাসে। স্বার্থপরতা, পরশ্রীকাতরতা, অহংবোধ আর অন্যের অধিকার হরণের মাঝেই অধিকাংশ মানুষ সুখ খোঁজে, শেষে মোহভঙ্গের বেদনায় আক্রান্ত হয়ে প্রকৃত সুখকে হারিয়ে ফেলে।

    দূর অতীতে মানুষ জ্ঞানের বইটি তেমনভাবে মেলে ধরতে পারে নি বলে মানুষের ঐ সময়ের যাবতীয় অনাচার আর ভুলকে হালকা করে দেখা যায় কিন্তু বর্তমানের মানুষেরাও যদি সেই একই পথে যাত্রা করে, মানব হওয়ার চেয়ে দানব হওয়াকে ভালো মনে করে তাহলে এটা বলা কি ভুল হবে যে, গুটিকয়েক ছাড়া বেশিরভাগ মানবমস্তিস্কই বিভ্রান্ত?

    দেশের সেরা ধনীর সন্তান হওয়াটাই যদি সুখ হতো তাহলে ঐ ধনীর মেয়েকে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করতে হতো না কিংবা তথাকথিত একাডেমিক শিক্ষায় সর্বাধিক ভালো ফল করে সেরা চাকুরী পেয়ে ঘুষ খাওয়াটাই যদি সব হতো তাহলে বাংলাদেশী ঐ সচিব এক বিদেশী নারী কুটনীতিবিদকে ‘How is your body?’ প্রশ্ন করে চরম বিপত্তিতে পড়তো না, বরং যতটুকু সম্ভব প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করতো আর জিজ্ঞেস করতো ‘How are you?’

    যেনতেনভাবে খবরে আসা, যুদ্ধবাজ হওয়া, কালোটাকার ধান্ধা করা, মিথ্যে বলা বা দুর্বলের অধিকার হরণ করাকে পৃথিবী কখনো বীরত্ব বলে স্বীকৃতি দেয় না, শেষতক মানবতার জন্য ত্যাগ স্বীকার করা মানুষেরাই শুধু কালের বুকে বীর হিসেবে অমর হয়ে থাকেন।

    প্রাসঙ্গিক বলে সদ্য প্রয়াত কালজয়ী প্রতিবাদী ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ আলীর একটি উক্তি এখানে উল্লেখ করছি।
    “আমি ধূমপান করি না কিন্তু আমি আমার পকেটে একটি ম্যাচ বাক্স রাখি। যখন আমার মন কোনো পাপের দিকে ধাবিত হয় তখন আমি একটি খাটি জ্বালিয়ে আমার হাতের তালুতে তাপ অনুভব করি। তারপর নিজেকে বলি – আলী, তুমি এ উত্তাপই সহ্য করতে পারছো না, কীভাবে তুমি নরকের অসহ্য তাপ সহ্য করবে?”

    তাই ঠিক পথে হাটতে হবে। তাহলে আর পথে দেরি হবে না, আকাঙ্ক্ষিত গন্তব্য নিকটেই থাকবে।