ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

যে কোনো বিচারে খেলার রাজা ফুটবল। বাংলাদেশ খেলে বলে ক্রিকেট নিয়ে উৎসাহ প্রকাশ করি, তা না হলে ফুটবলের নান্দনিকতা ভুলে গিয়ে ক্রিকেটে মেতে উঠার কোনো উপায় নেই।

ক্রিকেট এতই যন্ত্র নির্ভর খেলা যে, মাঝে মাঝে দ্বন্দ্বে পড়ে যেতে হয় এতে যন্ত্র না মানুষের নৈপুণ্যের প্রতিযোগিতা হয় তা ভেবে। সেই তুলনায় ফুটবলে যন্ত্রের ব্যবহার নেই বললেই চলে।

দলীয় খেলা হিসেবে ফুটবলে প্রতি মুহুর্তে দুই দলের ২২ জনকেই দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে যেতে হয়। ক্রিকেটে ২২ জন খেললেও প্রতিযোগিতা হয় মূলত দুইজনের, ব্যাটসম্যান ও বোলারের, অন্যরা খেলা চলাকালীন সময়ে চাইলে কলা খেতে পারে, টিভি দেখতে পারে, বাড়ি থেকে ঘুরে আসতেও পারে।

ফুটবলে খেলা চলাকালীন সময়ে আকস্মিক অনিবার্য বিরতি ছাড়া কোনো বিরতি নেই বরং দমে দমে উত্তেজনা। কিন্তু ক্রিকেটে প্রতি মিনিটেই খেলায় ছেদ পড়ে। বোলার হেলেদুলে রান আপ মার্কে যায়, ফিল্ডিং করা দলের অধিনায়ক সতীর্থদের সাথে পরামর্শ করে, থার্ড আম্পায়ার টিভিতে রিপ্লে দেখে সিদ্ধান্ত দেন।

ফুটবলে মানুষ তার দেহের সর্বাধিক কার্যকর অংশ হাত ব্যবহার করতে পারে না, গোলকিপিংটা ব্যতিক্রম। ফুটবল মূলত পা দিয়েই খেলতে হয় অর্থাৎ ফুটবল মানেই চ্যালেঞ্জে অংশ নেয়া। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জ ক্রিকেটে নেই, ক্রিকেট খেলার জন্য সবার আগে দরকার হাত দুটি।

ক্রিকেটে সুন্দর শট খেলে যেমন বাউন্ডারি মারা যায় তেমনি শুধুমাত্র গায়ের জোরের উপর ভর করেও বাউন্ডারি মারা যায়। কিন্তু ফুটবলে গায়ের জোরের উপর নির্ভরশীল হয়ে খেললে বরং গোল খাওয়ার আশংকাই বাড়ে।

পৃথিবীতে ক্রিকেটই একমাত্র খেলা যাতে মাঠে নির্বিঘ্নে প্রতিপক্ষকে কটুবাক্য বলা যায়, এমনকি এজন্য বাহবাও পাওয়া যায়। ফুটবলে তো দূরের কথা, আর কোনো খেলায়ই এমন কিছু করে পার পাওয়া যায় না। ক্রিকেট নাকি আবার ‘ভদ্রলোকের’ খেলা।

ক্রিকেটে সময় ও সমতার ব্যাপারটিও খুব গোলমেলে। একটা মাত্র ম্যাচ ৫ দিন খেলতে হয়, এরপরও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফল হয় না, ম্যাচ ড্র হয়। আর কোনো খেলায় কি এক ম্যাচ একটানা ৫ দিন খেলতে হয়? ফুটবল মাত্র ৯০ মিনিটের খেলা।

যে কোনো খেলার প্রধান নীতি হলো উভয় প্রতিপক্ষকে সমান সুযোগ প্রদান করা। কিন্তু বৈষম্যই যেন ক্রিকেটের ভিত্তি। যেমন টস। ক্রিকেটে টসে জয়ী পক্ষ আবহাওয়া ও কন্ডিশনের সুবিধাকে ইচ্ছেমত কাজে লাগানোর সুযোগ পেয়ে এগিয়ে যায় আর অন্যপক্ষকে এই ক্ষতি মেনে নিতে হয় শুধুমাত্র টসে হারায়। ফুটবলে এমন বৈষম্য নেই।

ক্রিকেটের বৃষ্টি আইন আরো বেশি বৈষম্যমূলক। বৃষ্টি হয়েছে – শুধু এই কারণে একটি পক্ষের জয়কে আইনের মাধ্যমে কঠিনতর করে তোলা হয় আর অন্যপক্ষের জয়কে সহজতর করে দেয়া হয়, ১৫ বলে ২২ রানের লক্ষ্যকে ১ বলে ২২ রানের লক্ষ্য বানিয়ে দেয়া হয়। অথচ বৃষ্টিতে ফুটবল খেলা বন্ধ হয় না কিংবা বৃষ্টির ফলে ফুটবলে কোনো পক্ষ বাড়তি সুবিধাও পায় না।

ক্রিকেটে রেকর্ডের ইস্যুগুলি হাস্যকর পর্যায়ের। খেলার ফরমেট, দেশ, ভেন্যু, সময়, বলের সংখ্যা, প্রতিপক্ষ, জুটি, ব্যাটিং অর্ডার, বোলিংয়ের ধরণ, জায়গায় দাঁড়িয়ে নেয়া রান ইত্যাদি হচ্ছে ক্রিকেটের রেকর্ডের সূচক। ফুটবলে এত সূচক নেই।

ফুটবলের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর অনেক আগে শুরু হয়েছে ক্রিকেটের আনুষ্ঠানিক পথচলা। কিন্তু এখনো ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক আইসিসির পূর্ণাঙ্গ সদস্য দেশের সংখ্যা মাত্র ১০ টি। আর ফুটবলের বিশ্বসংস্থা ফিফার সদস্য দেশের সংখ্যা ২০৬ টি যা জাতিসংঘের সদস্য দেশের সংখ্যার চেয়েও বেশি।

সর্বোপরি ফুটবলের প্রতিক্ষণের উত্তেজনা, সৃষ্টিশীল পাস, নান্দনিক ড্রিবলিং, ভিনগ্রহীয় গোল অথবা অলৌকিক সেভের কাছে ক্রিকেট রীতিমতো পানসে।