ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

এক মেক্সিকান নারীকে আটকিয়ে রেখে প্রায় আড়াই বছর যাবত দাসী হিসেবে ব্যবহার করে এক আমেরিকান, করে অবর্ণনীয় নির্যাতন। একদিন ভাগ্যক্রমে সেই নারী মুক্তি পান। দীর্ঘদিন বাধা থাকায় সেই নারীর হাতে কালো দাগ পড়ে যায়। গল্প নয়, বাস্তব ঘটনা এটি, বছর দেড়েক আগে একটি ব্রিটিশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিলো।

পত্রিকাটি তাদের ফেসবুক পেজে এ খবর শেয়ার করার পর সেখানে একজন মন্তব্য করেন, “ঈশ্বর পরম দয়ালু, তিনি দয়া করেছেন বলেই ঐ নারী মুক্তি পেয়েছেন।” এ মন্তব্যের প্রতিউত্তরে আরেকজন লিখেন, “হ্যাঁ, ঈশ্বর দয়ালু বলেই ঐ নারীকে বিনা কারণে আড়াই বছর এমন পাশবিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। আপনার ঈশ্বর কেনো এতদিন অপেক্ষা করলেন? কেনো তিনি আরো আগে ঐ নিষ্পাপ নারীর মুক্তির ব্যবস্থা করলেন না?”

এ গল্প উল্লেখের কারণ জানানোর আগে আরেক কাহিনী স্মরণ করতে চাই। গতবছর রাজন নামের শিশুটিকে কিছু দ্বিপদী পশু যে জাঙ্গলিক প্রক্রিয়ায় নির্যাতন করে খুন করেছে তা শব্দমালার গাঁথুনিতে প্রকাশ হবার নয়। এমন নির্যাতন দেখে মানুষ হিসেবে যারা নিম্নশ্রেণীর তারাও তা থামাতে ছুটে যেতো। কিন্তু পরম দয়ালু ঈশ্বর নীরবে তা দেখে যান। কেনো ঈশ্বরের একবারও ইচ্ছে হলো না ঐ অসহায় নিষ্পাপ মানবশিশুটিকে নিজের ঐশ্বরিক ক্ষমতা দিয়ে বাঁচানোর তা বোঝা মুশকিল।

হাজারো বছর ধরে বিশ্বব্যাপী এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটে চলেছে। জিজ্ঞাস্য বিষয় একটিই। সব ধর্মে দয়াময় হিসেবে স্বীকৃত ঈশ্বর পৃথিবীতে সংঘটিত এতসব জঘন্য অপকর্ম সংঘটনকালে কেনো নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে যান? সর্বময় ক্ষমতাধারী প্রভু হিসেবে শত শত কোটি মানুষের দ্বারা পুজিত ঈশ্বর কোন্ যুক্তিতে এমনটা করেন?

উদাহরণ স্থাপনের জন্য? কত লক্ষ উদাহরণের প্রয়োজন? মানুষকে দাস বানিয়ে নির্যাতন করার মতো নির্মমতা কি এ পৃথিবী আগে দেখে নি? যুগ যুগ ধরে লাখো লাখো মানুষের উপর নরপশুরা এ নির্যাতন করেছে। রাজন হত্যার আগে কি এ দুনিয়ায় আর কোনো শিশু খুন হয় নি? নিষ্ঠুরতার শিকার হয় নি? তাহলে এখনো কেনো শিশুদের খুন হতে হবে, মানুষকে দাস হতে হবে?

ঈশ্বর সবচেয়ে বড় দয়ালু, ঈশ্বরের চেয়ে মহান কেউ নেই – এসব আপ্তবাক্যে বিশ্বাস রাখতে হবে আবার পৃথিবীতে ঘটে চলা চরম অমানবিকতা প্রতিরোধে দয়াময় ঈশ্বরের নীরবতাকেও মেনে নিতে হবে? পরম দয়ালুর তো অবশ্যই, স্বাভাবিক আবেগসম্পন্ন হলেও এসব নিষ্ঠুরতা থামাতে এগিয়ে আসার কথা, তাও যদি আবার হাতে থাকে যা ইচ্ছে তা করার ক্ষমতা। কিন্তু ঈশ্বর কি তা করছেন?

ঈশ্বর একদিন অত্যাচারীদের শাস্তি দিবেন বলে এখন নিষ্পাপ রাজনদের, ফিলিস্তিনী শিশুদের বা জাপানী বাচ্চাদের নির্দয়ভাবে খুন হয়ে যেতে হবে অথবা পারমাণবিক বোমায় পুড়ে মরতে হবে? অসহায় নারীদের নির্যাতিত হতে হবে? জনগণের চাকরেরা জনগণের টাকা চুরি করে যাবে? রাজনীতির সাথে সম্পর্কহীন লাখো ইরাকী শিশুকে রাজনৈতিক খেলার ফাঁদে পড়ে অসহায়ভাবে মরতে হবে?

শিশুদের যদি এভাবেই মরতে হয় তাহলে কেনো তাদের দুনিয়ায় আসতে দেয়া হলো? ওরা তো জীবনের ভালোমন্দ বুঝে উঠার ক্ষমতাসম্পন্ন নয়, তারা তো স্বর্গ বা নরকের পথ পরিষ্কার করার কর্মে লিপ্ত নয়! তাহলে কোন্ দয়ার পরিচয় দিতে গিয়ে ঈশ্বর তাদের এমন মৃত্যুর ব্যবস্থা করেন? যে দরিদ্র শিশুটি বেঁচে থাকার তাগিদে দিনমান নিজের শিশুশ্রম বিক্রি করে ক্লান্ত হয়ে ফিরে তার নির্মমভাবে খুন হওয়ার সময় কেমন করে ঈশ্বর চুপ থাকেন?

গুলশান হামলায় যে গর্ভবতী নারী অমানবিক জীবদের হাতে জবাই হয়ে খুন হন তার অপরাধ কী ছিলো? তার গর্ভের ৭ মাস বয়সী শিশুটি নিরাপদতম আশ্রয়ে অবস্থান করে মায়ের সঙ্গী হয়ে কী দোষ করেছিলো?
৭১’ এ বাংলাদেশের শিশুরা কী পাপ করেছিলো? নাপাম বোমায় পুড়ে মরা ভিয়েতনামী শিশুরা কী অন্যায় করেছিলো? খেতে না পেয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে মরতে থাকা ইথিয়পীয় শিশুদের কি ঈশ্বর পছন্দ করেন না?

এসব জঘন্য অপকর্ম থামানোর ইচ্ছে কেনো ঈশ্বরের হবে না? কেনো তাঁর দয়ার সাগরে ঢেউ উঠবে না?