ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

মানুষ নাকি তার স্বপ্নের সমান বড়! আমাদের দেশে একটি মহল গত কয়েকবছর যাবত নিজেদের মিডিয়ার মাধ্যমে ক্রমাগত এরূপ প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের এ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুল বক্তব্যের ফাঁকটুকু চিহ্নিত করে আমি অনেকদিন আগে আমার ফেসবুক ওয়ালে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। এটি অবশ্য আরো বিস্তৃত ব্যাখ্যার দাবিদার।

‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’ – এ সাজানো আপ্তবাক্যটিকে আপাতদৃষ্টিতে উচ্চমার্গীয় ও মানবতাবাদী বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তলিয়ে দেখলে স্পষ্টত:ই অনুধাবন করা যায় যে, এখানে আসলে মানুষের জয়গান গাওয়া হয় নি, বরং মানুষকে ছোট করা হয়েছে। কারণ প্রকৃতপক্ষে মানুষ তার স্বপ্নের চেয়ে অনেক বেশি বড়।

ধরুন, পাড়াগাঁয়ে বাস করা নিরক্ষর নি:সন্তান দরিদ্র কোনো এক বৃদ্ধের স্বপ্ন একদিন তিনি বড় কোনো এক শহর ভ্রমণ করবেন যা আগে কখনো করা হয়ে উঠে নি তার পক্ষে। এটাই তার স্বপ্ন। তাহলে ঐ আপ্তবাক্য অনুসারে, এ বৃদ্ধ তার এ স্বপ্নের সমান বড় অর্থাৎ একটি বড় শহর দেখার মাঝেই তার মানবজন্মের সব স্বার্থকতা নিহিত। আসলেই কি তাই?

মানুষ হিসেবে এ বৃদ্ধের যে মর্যাদা, অসীম সৃজনশীলতা, অনুভূতি, সহমর্মিতা ও সম্ভাবনা রয়েছে তা কি একটি শহর দেখার মতো স্থুল বিষয়ের চেয়ে অনেক বড় নয়? সীমাহীন ক্ষমতাধারী হৃদয় ও মস্তিষ্ক শুধু মানুষেরই আছে। সেই মানুষ সুযোগের অভাবে কখনো কখনো তার স্বপ্নকে ছোট করে ফেলতে পারে, তাই বলে তার মানবীয় মর্যাদা ঐ স্বপ্নের কাতারে নেমে আসে না, এটি উঁচুই থাকে।

কোনো মেধাবি তরুণের স্বপ্ন যদি হয় কম্পিউটার বিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করা তবে মানুষ হিসেবে তার মূল্য কি ঐ ডিগ্রির সমান? মোটেই না। মানুষের মস্তিস্কের সামর্থ্য পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পিউটারের চেয়েও অনেক অনেক গুণ বেশি। আর মানুষের হৃদয়ের ক্ষমতা তো অসীম। হৃদয় দিয়ে অন্যের অদৃশ্য ব্যথা অনুভবের সামর্থ্য একমাত্র মানুষ নামের প্রাণিরই আছে।

তাই মানুষকে তার স্বপ্নের সমান বলে চিহ্নিত করা মানে তাকে অপমান করা। হোক সে স্বপ্ন আকাশছোঁয়ার ইচ্ছে, মানুষের মানবীয় মর্যাদা এসবের চেয়ে অনেক বড়। মানুষ মহাশুন্যে ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন সত্যি করেছে, চাঁদে গিয়েছে, মঙ্গলে বসবাস করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। এমনও তো নয় যে, মানুষ তার সামর্থ্যের সবটুকু ব্যবহার করে ফেলেছে, বরং মানুষ অনন্ত সাফল্যের দিকে যাত্রা শুরু করেছে মাত্র।

ঐ মিডিয়া সংশ্লিষ্ট মহলটির সাথে বুদ্ধিজীবী পরিচয়ধারী কিছু লোকও এ কোরাসে কন্ঠ মিলান সত্যটাকে দাবিয়ে রেখে। মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড় – এ শাশ্বত বাণী প্রচারের চেয়ে ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’ বলতে তারা একপায়ে খাড়া, কারণ এতে তাদের অন্নদাতা মিডিয়াটি খুশি হয়। আর নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তির দৌড়কে ঐ মিডিয়ার চিন্তার সীমানায় আটকে রাখতে পেরে তারাও আনন্দিত।

ব্যক্তিগতভাবে আমি স্বপ্নকে ধারণ করি কিন্তু স্বপ্ন দেখি না কারণ আমার চাওয়াটাই তো আমার স্বপ্ন আর আমার চাওয়া স্বপ্ন থেকে জারিত নয়, আমার বিশ্বাস ও সামর্থ্য থেকে উৎসারিত যা স্বপ্নহীন সময়েও আমার সঙ্গী।

আমি জানি যে, মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও অনেক বড়।