ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

Mir-Quasem-Ali

যে স্বাধীন দেশের আলোবাতাসে আমরা বেড়ে উঠছি সেই দেশকে মুক্ত করতে গিয়ে যারা অসীম ত্যাগ স্বীকার করেছেন, অকাতরে নিজেদের জীবনদান করেছেন সেই মহান শহীদদের দেশপ্রেমের ঋণ শোধ করতে হলে অবশ্যই রাজাকার পাকিপ্রেমীদের বিচার চালিয়ে যেতে হবে, তাদের উপযুক্ত পাওনা মিটিয়ে দিতে হবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে মূল প্রেরণা এটাই।

দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন বলে আমাদের শহীদদেরকে শুধু তাদের প্রাণই দিতে হয়নি, তাদের পরিবারকেও অনেক মূল্য দিতে হয়েছে রাজাকারদের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে। দেশমাতৃকার সেরা সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের পবিত্র রক্তে ভেজা এ মাটিতে সেই রাজাকারদের দর্পভরে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ দেয়া কোনোভাবেই উচিত নয়। অন্তত স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর আদর্শধারীরা ক্ষমতায় থাকতে আমাদের শহীদদের প্রতি এ অবিচার চলতে পারে না।

রাজাকারদের সমর্থক, তাদের সহগামি রাজনৈতিক কুচক্রী মহল এবং দেশি- বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের ভাবনা ও তৎপরতা এক্ষেত্রে মূল্যহীন। পাকিদের এদেশীয় দালালেরা বন্দুকের মুখে ক্ষমতা দখল করে তাদের সঙ্গী রাজাকারদেরকে এমপি-মন্ত্রী এমনকি প্রধানমন্ত্রীও বানিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের প্রতি এ নিদারুণ অবহেলা মেনে নেয়া কোনো দেশপ্রেমিকের পক্ষে সম্ভব নয়।

যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানী হানাদারদেরকেও বিচারের মুখোমুখি করা আমাদের স্বাধীনতার ঋণ পরিপূর্ণভাবে পরিশোধের জন্য জরুরী। তবে পাকি জানোয়ারদের চেয়েও বড় অপরাধী দেশী মুনাফিকেরা। তারা নিজ দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে, স্বদেশীদেরকে শত্রুর হাতে তুলে দিয়েছে, স্বজাতির উপর কাপুরুষোচিতভাবে খুন-ধর্ষণ-লুটপাটের মতো পাশবিকতা চালিয়েছে।

সাপের মতো বারংবার খোলস বদলানো এ রাজাকাররা এতই নির্লজ্জ যে, যে দেশের জন্মের বিরোধিতা করেছে সেই দেশেরটা খেয়ে, সেই দেশেরই নাম ধারণ করে আবার রাজনীতির ব্যবসা করে যাচ্ছে। দেশের স্বার্থে এ দুমুখো অমানুষদের সমূলে উৎখাত করা সময়ের দাবী। তাদের সহযোগী ক্যান্টনমেন্টভিত্তিক স্বৈরশাসনের  কলঙ্কিত উত্তরাধিকারীদেরও রেহাই পাবার কথা নয়।

রাজাকারদের ফাঁসির রায় হওয়ার পর তাদের অনুচরদের অনেকে বলে বেড়ায় যে, দণ্ডিত রাজাকাররা নাকি বেহেশতে গিয়ে জড়ো হচ্ছে! অসংখ্য নিরীহ নারী-পুরুষকে খুন করে, খুন করার নির্দেশ দিয়ে, খুনি-ধর্ষকদের দালালী করে যদি বেহেশতে যাওয়া যায় তবে সেই বেহেশতে কি কোনো ভালোমানুষ যেতে চাইবে? কোনো নীতিবান পরোপকারী মানুষ কি এ খুনিদের প্রতিবেশী হয়ে মৃত্যুপরবর্তী অনন্ত জীবন কাটাতে আগ্রহী হবে?

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার জন্য যে কর্মযজ্ঞ সম্পাদিত হয়েছে রাজাকার ও তাদের সহযোগীরা সম্ভবত তার চেয়েও বেশী অপতৎপরতা চালিয়েছে এ বিচারকাজ বন্ধ করার জন্য। কী না করেছে তারা প্রমাণিত সত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে?

তারা এক রাজাকারকে চাঁদে গিয়ে ‘আশ্রয় নিতে’ দেখেছে, ৪২ বছর ঘুমিয়ে থাকা হেফাজতকে এ বিচারের দন্ড কার্যকর করার ঠিক আগে মাঠে নামিয়েছে দেশে ধর্মীয় আইন চালু করার দাবী আদায়ের নাম করে, তাদের ভাষায় যারা কাফির সেই ব্রিটিশ-আমেরিকানদের অনেককে ব্যবহার করেছে বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে অপপ্রচার করে বেড়াতে, রায় প্রকাশের আগেই রায়ের কপি চুরি করে নিয়ে গিয়েছে আদালতের কর্মচারীকে টাকা খাইয়ে।

এছাড়াও যুদ্ধের সময় পাকিস্তানীদের সাথে থাকা দেশের একমাত্র মহিলা রাজাকারকে দিয়ে বিচার বন্ধের দাবী জানিয়েছে, পাকিদের সংসদকে কাজে লাগিয়েছে, ফটোশপের আশ্রয় নিয়ে বিচারকারী কর্তৃপক্ষের ভুয়া ছবি প্রকাশ করে অপপ্রচার করেছে, এমনকি এককালে যারা তাদের বিচারের দাবীতে আন্দোলন করেছে তেমন অনেককে কিনে নিয়ে বিচারকার্যকে ঝুলিয়ে দিতে চেয়েছে।

তাদের সর্বশেষ প্রচেষ্টা হলো এখন যারা রাজাকারদের বিচার দাবি করছে তারা ৭১ এ রাজাকারদের অপকর্ম নিজ চোখে দেখেছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা। ৭৫ পরবর্তী স্বৈরশাসক জিয়া রাজাকারদের দেশে ফিরিয়ে এনে, জেল থেকে ছেড়ে দিয়ে, দেশকে পাকিস্তানমুখী করে তুলে ৭১ কে ভুলিয়ে রাখার যে মিশন শুরু করেছিলো রাজাকারদের অপকর্মের প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা যে সেই মিশনের ধারাবাহিকতা তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

১৭৫৭ সালে মীরজাফর যে জঘন্য অপরাধ করেছিলো তা কি এখনকার কেউ চোখে দেখেছিলো? ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময় হিন্দু জমিদাররা যে ব্রিটিশদের দালালি করেছিলো তার কোনো চাক্ষুষ সাক্ষী কি এখন আছে? মুঘল আমলে পর্তুগীজ জলদস্যুরা যে এদেশের মানুষের উপর অত্যাচার করেছিলো তা কি এ যুগের কারোর চোখের সামনে ঘটেছিলো? না। তাই বলে কি এসব অপকর্ম হয় নি?

৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের অপরাধসমুহের প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী অনেক স্বাক্ষী যেমন এখনো বেঁচে আছেন তেমনি এগুলির প্রমাণ আছে তখনকার আন্তর্জাতিক মিডিয়া, দেশীয় মিডিয়া, পাকিস্তানীদের সরকারী দলিল-গোয়েন্দা প্রতিবেদন, যুদ্ধে অংশ নেয়া পাকি সামরিক কর্মকর্তাদের লেখা বইয়েও। তারচেয়ে বড় ব্যাপার, রাজাকারদের নিজেদের পত্রিকা দৈনিক সংগ্রামের সেই সময়ের কপিগুলিও তাদের অপকর্মগুলির অনেক চিহ্ন ধরে রেখেছে।

রাজাকার প্রধান গো আজম এমনকি স্বাধীনতার পরেও ‘পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি’ গঠন করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কাজ করেছে, বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেয়ার জন্য বিভিন্ন দেশকে অনুরোধ করেছে, বাংলাদেশীরা যাতে হজ্জ্ব করতে না পারে সেই ব্যবস্থা নিতে সৌদিআরবকে সাহায্য করেছে। আর এসবের প্রমাণ তো হাতের কাছেই। এরপর প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা কোনো ন্যায়পরায়ণ মানুষের কাজ হতে পারে না।

ইতোমধ্যে পাঁচ রাজাকারের ফাঁসির দন্ড কার্যকর হয়েছে, ষষ্ঠ রাজাকারের গলায় দড়ি লাগানোর অপেক্ষায় আছি আমরা। এ প্রক্রিয়া নির্দ্বিধায় চালিয়ে যেতে হবে। আমরা কোনো যুদ্ধাপরাধীর মেয়ের কান্না দেখবো না, আমাদের হৃদয় বিগলিত হবে আমাদের ৩০ লাখ শহীদের অতৃপ্ত আত্মার কান্নায়।