ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

ব্যাপারটাকে যেনো নিয়ম বানিয়ে ফেলা হয়েছে। অনেকজনের চোখের সামনে একজন মানুষকে খুন করা হতে থাকলেও তাকে রক্ষা করতে কেউ এগিয়ে যাবে না কিন্তু মোবাইল ফোনের ভিডিও রেকর্ডার ব্যবহার করে সেই নৃশংসতার দৃশ্য রেকর্ড করে রাখতে ভুলবে কম জনই।

একদিকে দ্বিপদী পশুদের জাঙ্গলিক আক্রমণ আর অন্যদিকে কিছু লোকের পলায়নরতার এ যুগলবন্দী রূপ এখন প্রায়ই দেখা যাচ্ছে। একের পর এক এমন অভাবিত ঘটনা ঘটে চলেছে। সর্বশেষ ঘটনাটি গত সোমবারের।

এক অমানবীয় জীব একটি নিরীহ মেয়েকে শত শত ছাত্র-ছাত্রীর উপস্থিতিতে একটি কলেজ ক্যাম্পাসের সবুজ ঘাসের উপর ফেলে চাপাতি দিয়ে ক্রমাগত কুপিয়ে যাচ্ছিলো কিন্তু কেউই মেয়েটিকে বাঁচাতে এগিয়ে যায় নি। বরং নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থেকে মেয়েটির যন্ত্রণাকাতর মুহুর্তগুলিকে ক্যামেরাবন্দী করে রাখছিলো অনেকে।

মানবিকতাবোধের কতটা অবনতি হলে, আত্মকেন্দ্রিকতা কতটা জেঁকে বসলে মানুষ নামক প্রাণিরা এমন পরিস্থিতিতে এভাবে ভাবলেশহীনতার আশ্রয় নিতে পারে তা নিয়ে ভাবতে বসার সময় এখনই।

জ্ঞানার্জনের মতো মহৎ কর্ম সাধনের ইচ্ছে নিয়ে যারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমুহে যায়, মানুষের করের টাকায় যাদের শিক্ষাব্যয় নির্বাহ করা হয় তারা কীভাবে একজন মানুষের এমন বিপদে নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারে?

এধরনের মানসিকতার শিক্ষার্থীদের পিছনে রাষ্ট্রীয় অর্থ খরচ করার কোনো মানে হয়? শিক্ষালাভের ফলে বিবেকবোধ জাগ্রত হওয়ার কথা। কিন্তু শিক্ষার বর্তমান রূপ স্বার্থপরতা, লোভ আর কাপুরুষতার ভিতকেই পোক্ত করছে।

মেযেটির জীবন-মরণের এ সন্ধিক্ষণে তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে একটা মানুষেরও হলো না? এত লোকজনের মধ্যে কয়েকজন মাত্র বাঁধা দিতে গেলেই তো মেয়েটিকে এভাবে কোপানোর সুযোগ পেতো না ঐ পশু, নিজেকে বাঁচানোর চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠতো সে। ফলে মেয়েটির গায়েও কম আঘাত পড়তো।

উপস্থিত কয়েকজন পরে বলেছে, চাপাতির ভয়ে তারা এগিয়ে যায় নি। একা চাপাতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য নি:সন্দেহে মাত্রাতিরিক্ত সাহসের প্রয়োজন কিন্তু ১০/১২ জন এগিয়ে গেলে খুনি একা কি কিছু করতে পারতো? একজনকে মারতে গেলে অন্যরা খুনিকে আঘাত করে কাবু করে ফেলতে পারতো। এ ফাঁকে মেয়েটি রক্ষা পেতো।

তাছাড়া চাইলে কেউ একাও খুনিকে বাধা দিতে পারতো। দূর থেকে ইট-পাথর নিক্ষেপ করে কি খুনিকে আঘাত করা যেতো না? আমি হলে তাই করতাম। আসল কথা হলো, কোনো নির্যাতিত মানুষকে বাঁচাতে এগিয়ে যাওয়ার জন্য যে সদিচ্ছা ও সাহসের দরকার হয় তা অধিকাংশেরই নেই।

অথচ এরাই যখন তাদের কোনো ‘ভাই’য়ের বিরুদ্ধে দাযেরকৃত মামলা প্রত্যাহার কিংবা পরীক্ষা বাতিলের দাবীতে দলবদ্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে সাধারণ মানুষের গাড়ি ভাংচুর করে তখন কী ‘বীরত্ব’ই না দেখায়! প্রকৃতপক্ষে এদেশের বেশিরভাগ মানুষই বাধা গরুকে জবাই করতে ভালোবাসে কিন্তু মাতাল ষাঁড়কে তোয়াজ করে চলে।

ঐ খুনি নির্বিঘ্নে কোপানোর কাজ শেষ করে চলে যাচ্ছিলো, তখন পর্যন্ত সে কোনো বাধা পায় নি। কিন্তু যেই মাত্র পুলিশ গুলির ভয় দেখিয়ে খুনিটিকে চাপাতি ফেলে দিতে বাধ্য করে তখনই উপস্থিত সবাই বিবেকের তাড়না অনুভব করে, ঝাপিয়ে পড়ে খুনির উপর, শুরু করে গণপিটুনি।

বাঙালির মতো গণপিটুনিপ্রিয় জাতি পৃথিবীতে আর আছে কি না সেটা নিশ্চিত করে বলা সহজ কাজ নয়। অপরাধ ঠেকানোর সুযোগ পেয়েও তারা তা ঠেকাবে না কিন্তু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর হাতের নাগালে পেলে অপরাধীকে তারা মনের সুখে কিলাবে, আইনের তোয়াক্কা না করে।

অপরাধ সংঘটনের পর অপরাধীকে পিটানোর চেয়ে অপরাধ করতে বাধা দেয়া কিংবা খুন হতে চলা মানুষটিকে বাঁচাতে এগিযে যাওয়া যে বেশি জরুরী তা এদেরকে কে বুঝাবে?