ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

Replacement কথাটার বাংলা কী হবে – ভাবি আমি।
পরিবর্তন। না। ওটাতো change শব্দটার মানে।
বদল। ঠিক যুৎসই হলো না।
প্রতিস্থাপন। মনে পড়ে আমার। কিন্তু শব্দটা কেমন খটোমটো লাগে। একটা ভাল বাংলা শব্দ নেই- মনে মনে ভাবি আমি।
‘১৯৫৬ সালে আইনষ্টাইন মারা যান। সত্যেন বোস সায়েন্স কলেজে একটা বক্তৃতা দেন। সেখানে তিনি একটা ইংরেজী শব্দও ব্যবহার করেন নি। আদতে আমরা আমাদের প্রতিশব্দটা ব্যবহার করিনা। আমরা বিদেশী ভাষার শব্দগুলো নিত্য ব্যবহার করি। এজন্য আমাদের কাছে বাংলা শব্দগুলো অচেনা লাগে। কঠিন মনে হয়। ‘- স্মৃতির ভেতর থেকে কে যেন কথা বলে ওঠে।
ও- আপনি।
তরুন স্যান্যাল। কত কথা তিনি বলছিলেন সেদিন। তার স্মৃতির সাথে হাঁটতে থাকি। পুরো রাস্তা জুড়ে গাছ আর গাছ। গাছের কত রকম পাতার মধ্যে খোলা এক টুকরো আকাশ ঝলকাচ্ছে, আমরা সেই রাস্তা ধরে হেঁটে যাই।
বাংলাভাষার একটা নিজস্ব শ্রেষ্ঠতা আছে । …আমরা যে দৃশ্যমান পৃথিবী দেখি – গাছ, ফুল, লতা, পাতা, হাত পা এগুলো হলো বিশেষ্য । এই বিশেষ্য গুলোকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে ইংরেজী ভাষা, ফরাসী জার্মান, আর বাংলা ভাষাটা আদতে ক্রিয়াকে বেশি মর্যাদা দিয়েছে। ব্যকরণগতভাবে বলতে গেলে কৃদন্ত শব্দের বাহুল্য আছে আর ওদের তদ্ধিতান্ত শব্দের বাহুল্য আছে। ফলে দেখা যাচ্ছে- চিন্তার দিক থেকে সভ্যতার যদি স্তর ভাগ করা যায়- একটা স্তরে যখন প্রকৃতিগতভাবে মানুষ ছিল তখন বিশেষ্যর ভূমিকাই বেশি ছিল। যখন সে আরও বিকষিত হয়েছে তখন তার নানা কাজ এসছে, একশন এসছে, ভার্ব এসছে, ফলে ক্রিয়া ভিত্তিক জগতের যে ভাষাগত নির্মান, যে স্ফেয়ার – সেই অর্থে বাংলা ভাষাটা ইউরোপীয় ভাষা থেকে অনেক এডভান্সড। অনেক এগুনো।
একসময় গুপ্তরা এখানে এসেছিলেন। তারা সংস্কৃতি নিয়ে এসছিলেন
তারপর সংস্কৃতের পাশে অবহট্ট ঢুকেছে।
প্রাকৃতও এসেছিল।
আসলে সংস্কৃত ভেঙ্গে যে অবহট্ট কার্যত সেই ভাষাটাই পরবর্তীকালে বদলাতে থাকে। পাঠান আর মোগলেদের সময় ফার্সী তার সাথে যুক্ত হয়েছে। ফলে ভাষার ভেতরে আমরা ফার্সীকে বাংলাকরন করেছি। ফার্সী ভাষাও বাংলাকরন করা হয়েছিল। ফলে ফার্সী ক্রিয়াপদকেও বাংলা ক্রিয়াপদ হিসেবে প্রকাশ করেছি আবার বাংলা ক্রিয়াপদকেও ফার্সী ভাষায় প্রকাশ করেছি। এরপরে ইংরেজী এসেছে। ইংরেজী শব্দকেও বাংলায় নিয়ে নিয়েছি। যেমন জাদরেল শব্দটা- জেনারেল থেকে নিজেরা তৈরী করে নিয়েছি এরকম ফিরিঙ্গি গোরা – গোরা মানে ফর্সা লোক। এরকম অনেক শব্দ আমরা আমাদের করে নিয়েছি। ফলে শব্দ সম্ভার বাঙ্গালীর ইংরেজদের থেকে বেশি। আমাদের শব্দ সম্ভার দেড় কোটিরও বেশি। আমরা এত শব্দ ব্যবহার করি যে আমরা নিজেরাই জানি না। অনেকে বলে একই শব্দের এত প্রতিশব্দ আছে এটা ঠিক না। মানে পাল্টে যেতে পারে। কিন্তু এটা ঠিক না। ভাষাও একটা অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতার সাথে মানুষ বা জাতি যে ভাষায় কথা বলতে চায় সেটিই স্বাভাবিকভাবে গড়ে ওঠে।
আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এপথ ও পথ দিয়ে হাঁটতে থাকি।
: ডঃ মুহাম্মদ শহিদুল্লাহর নামে একটা হল আছে না তোমাদের।
: হ্যা। আমি বলি। সন্তের মত তার চেহারাটা মনে পড়ে।
: অনেক খোলামেলা মানুষ ছিলেন। যা দেখতেন বিচার করে সেইটিই নিতেন। যখন তিনি পালি ও সংস্কৃত শিখতে গিয়েছিলেন তখন ওখানকার ব্রাহ্মন পণ্ডিতেরা তার সাথে কি রকম যে নিষ্ঠুর আচরন করেছিল! ব্রাহ্মনের বাইরে এই ভাষা জগতে কেউ বলবে না – বলাটাও পাপ। সেই সময় যিনি ওদের শিক্ষক, পণ্ডিতমশাই নলিনীকান্ত ভট্টশালী তাকে ক্লাসে বসতে অনুমতি দেননি – তিনি তাকে বাইরে বসতে আদেশ দিয়েছিলেন। তিনি কিছুদিন পরে একটা বিশেষ শ্লোক পড়তে দিয়েছিলেন। সব ক্লাসের ছেলেদেরকে সাতদিন পরে তাকে দেখিয়ে এবং মুখে উচ্চারণ করতে হবে। সাতদিন পর দেখা গেল শহীদুল্লাহ সাবেই একমাত্র সেটা সঠিক উচ্চারণ করে বললেন।
– তুই কি করে বললি, ম্লেচ্ছ?
– আমি প্রতিদিন ভোরবেলা উঠে গঙ্গা স্নান করতাম যা ব্রাহ্মণদের করার কথা। যখন খেতাম সন্দভ লবণ দিয়ে আতপ চালের ভাত খেতাম, ঘি দিয়ে। সাতদিন এভাবে আমি চর্চা করেছি। এর ফলে আমার জিবটা পরিচ্ছন্ন হয়ে গেল।সংস্কৃত উচ্চারনের জন্য
– আমি তোকে বলছি, এই ক্লাসে তুইই একমাত্র ব্রাহ্মণ। আর কেউ ব্রাহ্মন নয়। তুই আমার বাড়িতে যাবি। কালকে দুপুরে খেতে তোকে নেমতন্ন করছি।
তো শহীদুল্লাহ সাহেব সত্যি গেলেন। গিয়ে দেখলেন আগেকার দিনে খাবার যে কায়দা ছিল – সে কায়দায় দুটো আসন পাতা আছে। একটা আসন শহীদুল্লাহকে দেখিয়ে তিনি বললেন
-তুই এইটায় বোস – আমি এইটায় বসি। হাতটা ধুয়ে আয়।
ব্রাহ্মনের স্ত্রী দু’জনকে থালায় করে খাবার দিয়ে বললেন
– বাবা আজকে আমার খুব পূণ্যের দিন। কারণ আমাদের পুত্র নেই- আমাদের দু’জনকেই সবসময় একলা খেতে হয়। আজকে আমরা একটা পুত্র পেলাম।
তিনি তাকে এটা কি করে খেতে হয় ওটা কি করে খেতে হয় -এসব বলতে বলতে পুত্রের মত ছেলেটিকে খাওয়ালেন।
পরবর্তীকালে যখন কোন প্রশ্ন উঠেছে ভাষা নিয়ে- সংস্কার যেটা হয় মানুষ সেটা তৈরী করে পরিবেশের জন্য। আর আসলে মানুষ যেটা সত্যিকারের যেটা জানে সেটি উত্তীর্ণ হয়ে যায়। সেই ব্রাহ্মন ক্লাসে ছিলেন সংস্কারচ্ছন্ন। কিন্তু একটা উপযুক্ত ছাত্র পাওয়া যাওয়ার পওে তিনি সংস্কার কাটিয়ে উঠতে পারলেন।
নলিনীকান্ত ভট্টশালীর কাছে – জ্ঞানে বুদ্ধিতে যিনি পণ্ডিত মানুষ তার সাথে ব্রাহ্মনে কোন পার্থক্য নেই। তার কাছে শহিদুল্লাহ সাহেব ছিলেন ব্রাহ্মন আর শহিদুল্লাহ সাহেব এর কাছে নলিনীকান্ত ছিলেন বুজুর্গ।
হাঁটতে হাঁটতে তার কথা শুনতে শুনতে তাকে হিরন্ময় ঠাকুরের মত লাগে। যেন উত্তর পুরুষকে পূর্ব পুরুষের অভিজ্ঞান দিয়ে যাচ্ছেন যেন তারা ভাসমান হয়ে না পড়ে। আর একবার মনে হয় মা বুঝি তাকে পাঠিয়েছে- ভুলে যাওয়া কথাগুলো যেন আমাদের মনে পড়ে। আমার ভাষা শূন্যতা একটু একটু করে দূর হয়ে যেতে থাকে। আমি পূর্ণ হতে থাকি।
বাংলার হিন্দু
বাংলার খৃষ্টান
বাংলার বৌদ্ধ
বাংলার মুসলমান
আমরা সবাই বাঙ্গালী
একাত্তরের সেই শ্লোগান সন্ধ্যার আলোকরেণুর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। সেই আলোকরেণু গায়ে স্পর্শ করে আমরা হাঁটতে থাকি।
বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা
নক্ষত্রপুঞ্জের মতো জ্বলজ্বলে পতাকা উড়িয়ে আছো আমার স্বত্তায়।
শামসুর রাহমানের কন্ঠ ধ্বণিত হয়। তার ধ্বনি গায়ে মেখে শহীদ মিনার প্রজ্বোল সূর্যের মত মাথা উঁচিয়ে চোখের সামনে জেগে ওঠে। তরুন স্যান্যাল শহীদ মিনারের দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে থাকেন। পায়ের স্যান্ডেল খুলে নগ্ন পায়ে বেদিতলে উঠেন। তার কন্ঠ থেকে গুনগুন করতে থাকে আমার ভায়ে রাঙানো একুশে ফেব্র“য়ারী। লাল রঙের শুনশান বেদির প্রতিটি সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সাথে সাথে রক্তের ভেতরে বরকত, সালাম, রফিকের রক্ত গুঞ্জন তোলে -অ’ তে ঐ অজগর আসছে তেড়ে। আ’ তে আমটি আমি খাবো পেড়ে…
কয়েকটা নীরব মূহূর্ত। অনন্তকালের মত। স্রোতের মত শামসুর রাহমানের কণ্ঠস্বর বয়ে যায়।
সালামের হাত থেকে নক্ষত্রের মতো
ঝরে অবিরত অবিনাশী বর্ণমালা
আর বরকত বলে গাঢ় উচ্চারণে
এখনো বীরের রক্তে দুঃখিনী মাতার অশ্র“জলে
ফোটে ফুল বাস্তবের বিশাল চত্বরে
হৃদয়ের হরিৎ উপত্যকায়।
আমরা নেমে আসি শহীদ মিনার থেকে। তরুণ স্যান্যালের চোখজোড়া স্বপ্নাতুর মনে হয়। একটা মৌনতা তাকে ঘিরে থাকে। আকাশে তখন সূর্য তার রৌদ্র গুঁটিয়ে নিচ্ছে। তরুন স্যান্যাল একটু অস্ফুট স্বরে সেই অস্তায়মান সূর্যের দিকে তাকিয়ে বলেন
শামসুর রাহমান একবার বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছিল- কেমন লাগে আমার? আমি বলছিলাম – সাহিত্যতো দু’রকম। একটা সৃষ্টিশীল। গল্প, উপন্যাস, কবিতা যেগুলো মানুষের জীবন গড়ে। চিত্রকলাও আছে। চিত্রকলার সম্পর্কে আমাদের পুরনো জানাশোনাতো- জয়নুল আবেদীন, আরও পরে সুলতানের ছবি ভাল লাগতো। সেই ১৯৭১- কামরুল হাসানের ছবিতো লড়াই ঐ সময় খুবই পরিচিত হয়েছিল। কিন্তু ও বারবার কবিতার কথায় ফিরে যাচ্ছিল। কিন্তু আমি কিছুতেই বলতে চাচ্ছিলাম না। তবু ও জোর করেই চলল। শেষ পর্যন্ত আমি বললাম – বাংলাদেশের কবিতা আমি পছন্দ করি, আমার ভাল লাগে। এই কারণে আমি সমালোচনা করে বলতে পারবো না। লোকে যাকে ভালবাসে তার ভালমন্দ তফাৎ করতে পারে না। তবু শাসুর রাহমান বারবার বলতে লাগলেন বলুন না .. কী মনে হয় , কী মনে হয়।
উনি পুরনো স্মৃতিতে ফিরে গিয়ে আবার ফিরে এলেন। কিন্তু চুপ হয়ে গেলেন। তার পাশে হাঁটতে হাঁটতে আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি। শামসুর রাহমানের জোরাজুরি আমার মধ্যে ফিরে আসে।
: কী মনে হয় আপনার?
: আমি তোমাকে যেটা বলতে চাইছি-
তরুন স্যান্যাল বলতে শুরু করলেন
বিশেষ করে শব্দ সাহিত্য বা শব্দ শিল্প – এগুলো ওয়ার্ড বা সিম্বল। প্রত্যেকটা শব্দই এক একটা আইডল বা একটা ইমেজ। একজন কবি হলো তার আইডোলেটর। অন্যরা যেভাবে শব্দ ব্যবহার করেন কবিতো সেইভাবে শব্দ ব্যবহার করেন না। এখন যে পৌত্তলিকতাকে সংস্কৃতি হিসেবে মানে- তার কাছে কিছু পৌরাণিক ইমেজ আছে। আমি ভারতীয় কবি, একজন ভারতীয় বাঙ্গালী কবি হিসেবে একটা উত্তরাধিকার আছে। পুরনো কাল হতে আমি এখন জীবনানন্দ দাশের উত্তরাধিকার। তুমি বললে এখন হবে না। দেশ যখন ভাগ করেছিলে – তখন তোমার কাছে বড় কবি মনে হয়েছিল তোমাদের ওখানে যে সমস্ত কবিরা ছিল – বেনজির আহমেদ. কায়কোবাদকে। তাদেরকেই বড় কবি হিসেবে প্রচার করা হত। জীবনানন্দ না, বিষ্ণু দে ও না – এমনকি তোমাদের দেশে রবীন্দ্রনাথকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ফলে তুমি একটা আগ্রাসনের ভেতরে ছিলে। আক্রান্ত মানুষ হিসেবে বারবার খুঁজে খুঁজে তোমার ভাষাকে মুক্ত করেছো।
তরুন স্যান্যাল একটু থামেন। ভাষা শব্দটার উপর জোর দেন আবার।
ভাষা। কিন্তু ভাষার সঙ্গে অজস্র ইমেজ আছে যেগুলো রিলিজিয়াস ইমেজ হয়। রিলিজিয়াস বলতে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম বুঝাচ্ছি না – সাংস্কৃতিক ধর্ম বুঝাতে চাচ্ছি। হিন্দুরা নিয়েছে রামচন্দ্রকে- দেবতাসূলভ একটা নায়ক হিসেবে। সীতা, একটা এপিক হিরোইন- অর্জূন কর্ণ এরা সব হিরো হিরোইন। একটা জাতির এগুলো সব ইমেজ। ইলিয়াডে কাকে কাকে পাচ্ছি আমরা- আগামেমনন হেলেন .. এরা ইউরোপীয় সাহিত্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ফরাসী পণ্ডিত সার্ত্রে যখন মাছি লিখছেন তিনি কিন্তু অরেষ্ট্রিসকে নিচ্ছেন – পুরনো গ্রীক কাহিনীতে ফিরে যাচ্ছেন। আর তুমি – তোমাকে এমন জায়গায় ঠেলে আনা হয়েছে তোমার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নাই। তোমার ঐতিহ্যকে টেনে ছিড়ে দিয়েছে। বাংলাদেশে যে অংশটা তোমাকে ছিড়তে ছিড়তে যে কাণ্ডটা করেছে – ভারতবর্ষে যে উত্তরাধিকার তোমার সেটাকেও বাতিল করে দিয়েছে। ফলে যে মুহূর্তে তুমি এগুলো ভূলে গিয়েছো – যখন তোমার এতগুলো সম্পদচ্যূত হয়ে গেছো তখন যাদের সেই সম্পদটা আছে তাদের সঙ্গে তো তুলনা করতে পারবে না। মুশকিলটা হচ্ছে তোমাকে এইসব সম্পদ ফিরে পেতে হবে এবং আরো নতুন সম্পদ যুক্ত করতে হবে- যেটা পশ্চিম বঙ্গে নাই পূর্ববঙ্গে আছে। কী আছে তোমার- লোক জীবনের যে মহিমা- সেটা। পশ্চিমবঙ্গে জসিমউদ্দিনের মত কোন কবি নেই। কিন্তু পূর্ব বাংলায় ছিলেন। আসলে সোজন বাদিয়ার ঘাটই বলো আর নক্শী কাথার মাঠই বলো সেখানে তুমি তোমার লোকজ পরিচয় খুঁজে পাবে। পশ্চিম বঙ্গে একজন লানন নেই। তোমাদের পূর্ব বাংলায় ছিলেন। আর লোকজ পরিচয়ের পাশাপাশি অসংখ্য গল্প আছে। এগুলো যোগ হতে পারে। আমি শামসুর রাহমানকে শুধু বললাম – তোমাদের কবিতা ম্যাচিউরিটি পাচ্ছে। ও বোধহয় মানতে পারেনি, একটু কষ্ট পেয়েছিল।
আসলেই লোক জীবনটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশে- যেটি পশ্চিমবঙ্গে নাই। পশ্চিমবঙ্গে সবসময় আদ্দেক সাহিত্য হয়। যারা লিখেছেন এখানে তাদের দিকে তাকালে বোঝা যাবে। বঙ্কিমচন্দ্র শরৎচন্দ্র হয়ে তারাশঙ্কর হয়ে মানিক বন্দোপাধ্যায় – যারা উচ্চ হিন্দু শ্রেণীর চোখ থেকে লিখছেন। কিন্তু বাংলাদেশে যারা লিখছেন, ওয়ালিউল্লাহর লাল সালুর কথাই ধরা যাক – সেখানে ওয়ালিউল্লাহ যেভাবে নিম্নবিত্তের কথা দেখাচ্ছেন শরৎচন্দ্র কিন্তু সেভাবে দেখাতে নিম্নবর্গকে পারেননি। আখতারুজ্জামান যখন খোয়াবনামা লেখে তখন পুরো সমাজটা উঠে আসে। ওয়ারিশ – শওকত আলীর, সেখানে বিরাট একটা সময় দেখা যাচ্ছে। শওকত আলীর ই আরেকটি উপন্যাস উত্তরের ক্ষেপ, অর্থাৎ ডিপরুটের নিচে যে লোকটা গাড়ি চালায় তাকে নিয়ে তৈরী উপন্যাস – এ বাংলা ও বাংলা একটা নতুন ব্যাপার। নাসরিন জাহানের উড়–ক্কু – চমৎকার একটা উপন্যাস। বাংলাদেশে উপন্যাসের ভবিষ্যতটা দারুণ ভাল।
এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হয় বলি- কেন বললেন আমরা যোগসূত্র ছিন্ন করেছি? আমরা তো রবীন্দ্রনাথের জন্য যুদ্ধ করেছি। আমরা ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি। পর মুহূর্তেই দোলাচলটার কথা মনে হয়। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ছাপিয়ে রাষ্ট্রধর্মের গল্পটার কথা মনে পড়ে। আমি আর কিছু বলি না। চুপ করে যাই। তরুন স্যান্যালের কথায় ডুবে যাই ।
বাঙ্গালী জাতিসত্বা ,তার ভাষা সত্বা পেছনে কিন্তু শেকড়ে কিন্তু এই লোক সত্ত্বাটা আছে। এই লোক স্বত্বাটা কিন্তু বিনষ্ট হয়ে গেলে জাতি স্বত্ত্বাটা ফিরিয়ে আনা যাবে না।
তরুন স্যান্যাল একটু থমকে গেলেন যেন। আমার দিকে গাঢ় চোখে তাকালেন।
একে ধরে রাখতে না পারলে … যা কিছু হারিয়ে গেছে তাকে খুঁজে বের করতে না পারলে…
ঠিক তখনই স্মৃতির ভাবনা ভেঙে সন্ধ্যার অন্ধকারের সাথে সাথে বড় বড় ফোটায় বৃষ্টি নামে। আমি তাকিয়ে এই বৃষ্টির ভেতরে তরুন স্যান্যালকে আর খুঁজে পাই না। দৌঁড়ে আমি বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য একটা যাত্রী ছাউনীর ভেতরে ঠাই নেই। যাত্রী ছাউনীগুলো সাধারনত এরকম বৃষ্টিতে গিজগিজ করে। কিন্তু এই ছাউনীটা একদম ফাঁকা। একজনও নেই। বৃষ্টির আঁচ বাচিয়ে আমি বৃষ্টি দেখি। অনেকক্ষন। মনে হয় বছরের পর বছর পেরিয়ে যাচ্ছে কিন্তু বৃষ্টি থামছে না।