ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

‘চিংড়ি আবার মাছ নাকি! ধুর ও তো জলের পোকা। তোরা পোকা খাস।’ অম্লানবদনে বলত মোটা, বিপ্লব। সবকটা পাঁড় ইস্টবেঙ্গল সমর্থক। আমি আবার, গাভাসকার, মোহনবাগান নিয়ে কিছু বললেই সব খাপ্পা। – হ্যাঁ, তোদের বলেছে। খাস তো ওই কাটাপোনা। আর গপ্পো মারিস ইলিশের। চিংড়ির আর কতো দাম? ইলিশের দাম তারচেয়ে ঢের বেশি। আমি বলতাম, কখনো না। ধুমদুমাদুম লেগে যেত ঝটপট। স্কুলের শেষেও ঝগড়ার শেষ হত না। বাটি উল্টে যেতাম। পরদিন বাটি তুলে লাগ লাগ ফের।
কেন চিংড়িমাছ ঘটিদের হল আর ইলিশ বাঙালদের – তার একটা লজিক তবু সাজানো যায়। কিন্ত কেন যে পালতোলা নৌকো মোহনবাগানের আর মশাল ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের হাতজোড়া তা বোঝা মুশকিল। পদ্মার সঙ্গে ইলিশ আছে। পালতোলা নৌকো থাকার কথা ছিল সেদিকেই। কিন্ত তা না হয়ে বৈঠা পেল মোহনবাগান। অবশ্য তেমন ভাবে গাঁথতে পারলে নৌকোর সঙ্গে চিংড়ির একটা সম্পর্ক হয় বটে। শুনেছি এক ইস্টবেঙ্গল সমর্থক মাঠে আসতেন শিব সেজে। নিয়মিত। শিবঠাকুর ইস্টবেঙ্গলের, কেননা সর্বহারা মানুষের দেবতা তিনি। তাই বাঙালদের প্রাণের ঠাকুর। সারাদিন শ্মশানে মশানে লাল হলুদ লুঙ্গি পরেই কাটিয়ে দিলেন গোটা ম্যাচ।
বিভাজনটা এখানেই শেষ নয়। মোহনবাগানিরা হল খাস কলকাত্তাইয়া, পাঁড় বাবু কংগ্রেসি। আর ইস্টবেঙ্গল গৃহহারা – তাই কলোনি জুড়ে লড়কে লেঙ্গে মশাল চিহ্ন, সি পি আই-সি পি এম। আমি মফঃস্বলের বাসিন্দা। সেখানে ইস্টবেঙ্গলকে বলা হত জার্মানি। ফলে ইলিশ ছিল জার্মানদের খাদ্য। তা বলে বর্ষায় কোলাঘাট-সুন্দরী কিছু কম পড়ত না পাতে। কিন্ত মোহনবাগান জেতার উৎসবে চিংড়ি মাস্ট।
স্কুলে বন্ধুরা আওয়াজ দিত, কুচো চিংড়ি, কাদা চিংড়ি বলে। আমরা যেমন জার্মান বলতাম, ওরাও আমাদের ছারপোকা বলত। কম্পিটিশন ছিল কার মা-বাবা আগে ক্লাব রঙের জার্সি কিনে দেয়। পোস্টার কালার দিয়ে আমরা জার্সির পিঠে লিখতাম – ২২। ওটা শ্যাম থাপার নাম্বার। যার এক বাইসাইকেল কিক বহুকাল চুপ করিয়ে রেখেছিল বাচাল জার্মানদের।
মোহনবাগান পুজর মূল প্রসাদ চিংড়ি। যাকে কল্যাণী দত্ত বলেছেন – আমিষের সভাপতি। খুব কড়া ধরনের ইস্টবেঙ্গলি, জেদি সেসব বিরল সাপোর্টর, যারা চিংড়ি মাছের ছায়াও মারাতেন না সবুজ-মেরুন গন্ধ আছে বলে – সেই উদ্ভটকিসিমের আদমিদের জনে গুপ্তকবি থেকে দু’ছত্র টুকলি – “না করে তোমারে যে উদরে গ্রহন/ বৃথাই জীবন তার, বৃথাই জীবন।”
চিংড়ির রান্না বলতে সবাই অন্তত একটি পদে খাড়া – মালাইকারি। বিয়ে বাড়ি খাইয়ে খাইয়ে সে পদেরও অধুনা বারোটা বাজিতং। চিংড়ি এখন যে কোনও হেঁজিপেঁজি ক্যাটারারের চ্যাংড়া। ফোঁসফোঁস শ্বাস ফেলে লাভ নেই। কেন ক্লাবে সব বিদেশি প্লেয়ার এ নিয়ে কেঁদে লাভ নেই। ক্লাবের বিজয় পতাকা, বিজয় মলিয়া পতপত করে উড়ুক – শুধু মোহনবাগান নেশা লেগে থাক আজকের প্রন ককটেলে।
এ রান্না ঠাণ্ডা খেতে হয়। গরম চিংড়ি নিয়ে তো সারাজীবন কাটল। এবার না হয় ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা কুল কুল। আর কি আছে খাঁটি ঘটি, খাঁটি বাঙাল? আর কি আছে কোনও ময়দানের খাঁটি লড়াই? খাঁটি উত্তেজনা? সদস্য গ্যালারির খাঁটি ধুতি-পাঞ্জাবি? খাঁটি গালাগাল? মনে তো হয় না। সবারই বাড়িতে এসি, এ রান্নার মতোই, সবই দেখি এখন ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে।