ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে বেশ খেল হল একচোট। এখনও চলছে অবশ্য। ‘সার্ধশতবর্ষ’ বলে কথা। বাঙালি অবশ্য বলে ফেলছে ‘শ্রাদ্ধশতবর্ষ’। তারপরেই বড় করে জিভ কাটছে। অ্যাল। ঠাকুর পাপ দেবে যে! মোটামুটি সবাই নোট ফোট বগলে চেপে ঘুরেছে। দেড়শ বছর বলে কথা। ব্যাটা একশরও বড়দা। এরপর মেগা-মচ্ছব বলতে সেই একশো পঁচাত্তর। ততদিনে যারা এখন ধুতিতে তারা সকলেই ভো-কাট্টা। যারা থাকবেন তারা কোমর ব্যথায় এতটাই কেবলে পড়বেন গাড়িতে সভাস্থলে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।শিরদাঁড়া রিজাইন দেবে। আর যুগ যেদিকে চলেছে, ২৫ বছর বাদে স্টেজ বেঁধে রাস্তা ব্লক করে রবীন্দ্রঘ্যানর, পুরসভা আর অ্যালাউ করবে না। অতএব এটাই লাস্ট বাস।
ভাইসকল ঝাঁপিয়ে পড়ো। রানিং-এ উঠে পড়। প্রবন্ধ লেখো ‘রবীন্দ্রনাথ ও শীতের কমলালেবু’, ‘রবীন্দ্রনাথ ও বিটি বেগুন’,’রবীন্দ্রনাথ ও বাঁ দিকের কিডনি’। শুধু একটাই কথা, একটু জায়গা দাও দাদু, তোমার মন্দিরে বসি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালির এক ও একমাত্র আইকন। সৌরভ রিটায়ার করে গেল, অমর্ত্য সেনের কথা কিস্যু মাথায় ঢোকে না,ইউনুস খান তাঁর সমবায় নিয়ে কোথায় গেলেন বাঙালি ভুলে মেরে দিয়েছে। কিন্ত দাড়িদাদু নট আউট। ওঁর গান শিখতে ওই তো গেঁড়ি ও গুগলি ছুটছে। মারকাটারি কবিরা তাঁর নিরস পদ্য খুঁটে ‘ইউরেকা কল্লুম’ জপছে। সিনেমাতে রবীন্দ্রধষন কমপ্লিট করে পরিচালক বলছেন ‘ইহারে নিরীক্ষা কয়’। মোবাইলে কনটেস্ট চলছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের সংখ্যা কত? (ক) তিন লাখ দুই, (খ) চার কোটি তেইশ, (গ) তেরো অযুত আঠারো। গুনুন, রিভাইজ দিন এবং কম্পিটিশন পোস্টকার্ডে স্পষ্ট হস্তাক্ষরে লিখে পাঠান এই ঠিকানায়। প্রথম পুরস্কার শান্তিনিকেতনে বাগানবাড়ি।

এমনিতে বাঙালির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ন্যুনতম লেনাদেনা নেই। সংস্কৃতি বলতে এই জাত বোঝে গোটা সন্ধেটা হামলে পড়ে সিরিয়াল দেখা। যাতে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা লোফারের মতো অশ্লীল কথা বলে ও পেছন নাড়িয়ে যৌন-ইঙ্গিত করে। যার সঙ্গে রাবিন্দ্রীক রুচি ও বুদ্ধি একটুও মেলেনা। সারাদিন বাঙালি এই টিভি মুখে নিয়ে কোলকুঁজো হয়ে বসে থাকে। তা বলে কি বাঙালি পড়ে না? আলবাত পড়ে। শিক্ষিত জাত বলে কথা! সে পড়ে গ্লসি পত্রিকা। যার প্রচ্ছদকাহিনী হয় ‘স্তন’, বা ‘খবরদার ব্রণ টিপবেন না’, কিংবা ‘কম খরচে সোফাসেট প্রতিবেশীর মাথা হেঁট’। নেতা ঘোষণা করেন, সবাই উঠে দাঁড়ান,’জনগ্ণমনঅধি’ হবে অথবা ‘সোনার বাংলা’। বুদ্ধিজীবীরা বলেন, রবীন্দ্রনাথের
লেখা আমাদের প্রাণের আরাম। আমাদের শ্বাসবায়ু। টিভি-তে ফোন-ইন করে দর্শক মত জানায়, ‘রোবিন্দনাত আজও পাসঙ্গিক’। মোবাইলে সবাই গাঁটের কড়ি খরচ করে রবীন্দ্রসঙ্গীতের কলার টিউন লাগায়। যদ্দিন না প্রীতম বা শান্তনুর পরের সুপারহিটটা আসছে।

একবার আমাদের নিজেদের জীবনটার দিকে ফিরে তাকাই। আমাদের সকাল থেকে রাত অবধি জীবনটায় – অটোর ধোঁয়া খাওয়া জীবনটায়,সিকনির রুমাল খুঁজে না পেয়ে বউয়ের বাপ তোলা জীবনটায়, আমাদের চাকরি না পাওয়া জীবনটায়, পেলেও সম্মান না পাওয়া জীবনটায়, নিজের কাছ থেকে নিজে লুকিয়ে পড়া জীবনটায়, ডাক্তারের কাছে হেরে যাওয়া, চামার নাসিংহোমের কাছে হেরে যাওয়া, ইংরেজি মিডিয়ামের কাছে হেরে যাওয়া, শপিং মলের কাছে হেরে যাওয়া, গুটখা ছেটানো বড়লোকের কাছে হেরে যাওয়া, ইএমআই-য়ের কাছে হেরে যাওয়া, সব দিক থেকে সব কোন থেকে সব প্রান্ত থেকে হেরে যাওয়া জীবনটায় রবীন্দ্রনাথের গান-রবীন্দ্রনাথের ঞ্জান-রবীন্দ্রনাথের পুণ্যশ্লোক আমাদের প্রাণে আরাম দেয়? ইয়ার্কি হচ্ছে? রবীন্দ্রনাথের কথাবার্তা আমাদের পাঁকগর্ত থেকে হাত ধরে আলোয় নিয়ে আসে? রাতের ভিড় বাসে মুখ নীল করে শ্বাস টানতে টানতে বাড়ি ফিরে রবীন্দ্রনাথে অবগাহন করে আমাদের ক্লান্তি দূর হয়? আমাদের আমাশা-ডায়াবেটিস-হাঁপানি-সুগার- জোচ্চোর-রাজনীতিবিদ-ঠগ-নেতা-বনধ-অবরোধ ভরা এই জগতে রবীন্দ্রনাথ আনন্দযঞ্জের কার্ড বিলোন? মজা হচ্ছে? আমাদের এই ঘিনঘিনে, গা গুলনো, বিরক্তিকর জীবনটায় বিরাট কোহলি বা মুস্তাফিজুর রহমানের চেয়ে দামি, রবীন্দ্রনাথ? আমির খান কিংবা অমিতাভ বচ্চনের চেয়ে দামি, রবীন্দ্রনাথ? তিন দিন না খেতে পাওয়া মানুষের কাছে একথালা ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের চেয়ে দামি, রবীন্দ্রনাথ?

কারো কারো কাছে নিশ্চয় দামি। কেউ কেউ সত্যিই রবীন্দ্রনাথের থেকে প্রাণবায়ু শুষে নেন। সে তো কিছু মানুষ কালিদাসের কাব্যও নিবিষ্ট মনে পড়েন। ইলিনা ইসিনবায়েভার নয়া পোলভল্টের রেকর্ডের কথা ভেবে খুশি হন। কিংবা ‘পুতুলনাচ বাঁচাও কমিটি’র হয়ে তিন মাইল হাঁটেন। কিন্ত তাই বলে পুতুলনাচ অসম্ভব প্রাসঙ্গিক, সাংঘাতিক আধুনিক,তুমুল প্রয়োজনীয় কি? রবীন্দ্রনাথ নিশ্চয়ই বড় লেখক। অসম্ভব বড় লেখক। এত নাম। অফিশিয়াল স্বীকৃতি (নোবেল)। রবীন্দ্রনাথ অন্যান্যদের থেকে কয়েকশো মাইল এগিয়ে
থাকা শিল্পী। তিনি তুলনাহীন। তা নিয়ে কারো কোনও সংশয় নেই কিন্ত। তা নিয়ে আলোচনা নয়। আলোচনাটা হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের ভাষা-ভাব-ভঙ্গী-দরশন আজকের বাঙালির কাছে এতটুকু আকর্ষণীয় কি? এই সময়ে দাঁড়িয়ে, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সত্যি সত্যি কারো এতটুকু মাথাব্যথা আছে কি? রবীন্দ্রনাথের সত্যি কি এতটুকু ভূমিকা আছে আমাদের জীবনে? এমন কেউ আছে, যাকে মা খেতে দিয়ে ডাকছে, কিন্ত সে যাচ্ছে না, আধশোয়া হয়ে ‘যোগাযোগ’ পড়ছে বলে? না। আবার বলছি চাট্টি অনুভূতিপ্রবণকে নিয়ে কথাটা হচ্ছে না। হয়তো এ শহরেই এমন গোষ্ঠী আছে যারা হিটলারকে নিয়ে অসম্ভব প্যাশনেট। এবং তারা মনে করে হিটলারের বাণী ও কাজ থেকে সক্কলের শেখা উচিত।
কিন্ত এতে প্রমান হয় না যে বাঙালি জীবনে হিটলার ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে। আপনি বলতে পারেন, এত যে বলছ বাপু, রবীন্দ্রনাথ যদি পারেন না তবে আর কোনও লেখক কি পারেন, তাঁর লেখায় মানুষের আনন্দ-হতাশা-ক্রোধ-আক্রোশ বেঁটে নিতে? উত্তরে বলি, আপনি ঠিকই বলেছেন। যদি বা এমন লেখক থাকেন (অবশ্যই আছেন), এতে কোনও সন্দেহ নেই, তাঁর বা তাঁদের লেখাও কেউ পড়ে না। অন্তত মেজরিটি তো পড়েই না। তাহলে দাঁড়াল এই, রবীন্দ্রনাথ প্রাসঙ্গিক নন, অন্য কেউও প্রাসঙ্গিক নন।কিন্ত অন্য কেউ-এর কথা তোলার মানেটা কি? ‘ কী বললি আমায় দেখতে ভালো নয়, আয়নায় নিজের ছিরিটা দেখেছিস?’ – এটা কি একটা ভদ্র যুক্তি হল? হষ ভোগলে
নিজে ক্রিকেট ভালো খেলতে পারেন না বলে ধোনির খারাপ শটের সমালোচনা করার অধিকার রাখবেন না কেন,যখন তিনি ক্রিকেটটা জানেন বোঝেন? প্রাসঙ্গিক কেউই নয়। কোনও লেখকই নয়। কিন্ত একজনকে নিয়ে হুজুগের বন্যা বয়ে যাচ্ছে, অথচ তাঁর একটা লাইনও কেউ পড়ে না, অথচ রবীন্দ্রনাথ মাই কি জয়, বলে চেল্লাচ্ছে আর হার্টের রোগীর পিলে চমকে উঠছে এখানেই তামাশাটা আর অস্বস্তিটা। দোহাই, ব্যাপারটাকে ঔচিত্যের দিক দিয়ে দেখবেন না। এখানে বলা হচ্ছে না ‘রবীন্দ্রনাথ পড়া আর উচিত নয়।’ বলা হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ দূরে সরে গেছেন। অনেক দূরে। যে তার চওড়া কব্জি দিয়ে একটা গোটা জাতির সংস্কৃতিকে ধরে রেখেছেন – সেই রবীন্দ্রনাথ মৃত। বহুদিন।
আছেন তিনি আকাশ বাতাস ছেয়ে, একটি হাস্যকর মিথ্যে। রবীন্দ্রনাথ দিগন্তে ডট। লুপ্ত। এটা ফ্যাক্ট। সত্য। আর সত্য কোনও ঔচিত্যের ধার ধারে না। সত্যের মুখোমুখি আজ নয় কাল দাঁড়িয়ে পড়াই ভালো। রবীন্দ্রনাথ মৃত।
জন্ম থেকে হিন্দি সিনেমার গান আর রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনে শুনে তা ইচ্ছা নিরপেক্ষ ভাবে শব্দগুলো সুরগুলো গলায় আপনি এসে যায়। খেয়াল করে দেখবেন জনপ্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রথম দুটো লাইন সবার মুখস্থ। আর পরের লাইনগুলো পেটে বোমা মারলেও বেরবে না। তারওপর ছোটবেলা থেকে রবীন্দ্রনাথকে দেখিয়ে বাবা বলেছে, ‘নমো কর’। কিন্ত এই ভক্তিটা একধরণের অপমানই। যাচাই না করা, ভেতরে সার না-থাকা ভক্তি। জীবনে তাঁর লেখা একলাইনও পড়লাম না কিন্ত তাঁর নামে কেউ কিছু বললেই রে রে করে তেড়ে এলাম – সেই ঘিনঘিনে অশ্লীল ভক্তি। তা হলে কি রবিবাবু বেঁচে নেই? কেন থাকবেন না। অবশ্যই আছেন। যেভাবে বেঁচে আছেন কালিদাস বা ভবভূতি, বিভূতিভূষণ,জীবনানন্দ। যেভাবে বেঁচে থাকবেন সন্দীপন, সুনীল, হুমায়ূন আহমেদরা। সেভাবেই বেঁচে থাকবেন রবীন্দ্রনাথ। আমাদের আনন্দ হতাশার মধ্যে যখন তাঁর লেখার জ্বলা-নেভার তাল মিলে যায়, তখনই তিনি বেঁচে ওঠেন। সেইখানেই তাঁর স্থান।