ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 
Sui2

সম্প্রতি ভারত সরকার আত্মহত্যাকে আইনি সম্মতি দিল। পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই আত্মহত্যা অপরাধ। আবার কিছু দেশে আত্মহত্যাকে আইনি মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এবার ভারতও সেই পথে হাঁটল। এবং আমরা আবার একটি হাস্যকর আইনি প্রহসন দেখলাম। একটা মানুষ তার জীবন নিয়ে কী করবে সেটা একান্তই তার ব্যক্তিগত। রাষ্ট্র সেখানে নাক গলাতে আসে কোন অধিকারে? অনেকেই বলতে পারেন, যে প্রাণ তোমার সৃষ্ট নয়, তার বিনাশের অধিকারও তোমার নেই। আর তুমি মানে শুধু তুমি, একলা তুমি এ ভাবনা নিতান্তই আত্মকেন্দ্রিক। অথচ যে মানুষটা তিন দিন না খেয়ে কাতরাচ্ছে তাকে কিন্ত কোনও ব্যক্তি বা রাষ্ট্র বলছে না, ভাই আমার বাড়িতে চাট্টি পান্তাভাত আছে,নুন-লঙ্কা দিয়ে খেয়ে উদ্ধার করো! কিংবা প্রকাশ্য রাজপথে কাউকে ফেলে লাঠি, টাঙ্গি দিয়ে কোপাচ্ছে কয়েকজন, আহতের স্ত্রী চিৎকার করে সাহায্য চাইছেন। কিন্ত এগিয়ে আসছে না কেউ।
তাহলে আমার সবচেয়ে একান্ত, নিজস্ব জিনিসটা তো আমার জীবন। তাকে শেষ করার অধিকার যদি আমার না-থাকে তাহলে মৌলিক অধিকার মানে কী?একজন তার জীবনটা রাখবে না শেষ করবে তা বুঝে নেওয়া তার জন্মগত অধিকার। আত্মহত্যার অধিকার রাষ্ট্র স্বীকার করে না। আত্মহত্যা করতে গিয়ে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্র শাস্তি দেয়। সঙ্গে থাকে মানুষদের কানাকানি ফিসফাস বিদ্রূপ – এ চরম হেরো, জীবন থেকে পালাতে গিয়েছিল সেটা অবধি ঠিকঠাক পারেনি। মুদি-ময়রার ঠোঁটে সে আন্দাজ করে বাঁকা চাহনি। দাঁড়িপাল্লায়, সে অনুভব করে তার কেচ্ছার ওজন চলছে।

জীবনটা আদৌ বেঁচে থাকার উপযুক্ত কিনা, তা বিচার করার চেয়ে মৌলিক দার্শনিক প্রশ্ন আর কী আছে? বাকি সমস্ত প্রশ্ন – বিশ্বের তিনটি মাত্রা আছে কি না, মনের বারোটা প্রকারভেদ আছে কি না – এসব অনেক পরে। এগুলো খেলা। কিন্ত কী করে বুঝব এই প্রশ্নটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর ওইটা কম? দেখতে হবে সমস্যাটার জন্যে মানুষ কতদূর যাচ্ছে। আজ অবধি তো তাত্ত্বিক তর্কের খাতিরে কাউকে মরতে দেখলাম না। গ্যালিলিও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈজ্ঞানিক সত্য আবিষ্কার করলেন, আর যেই না তার জন্যে তাঁর জীবন বিপন্ন হল, সত্যটিকে অনায়াসে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। এক অর্থে তিনি একদম ঠিক কাজ করেছিলেন। পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘোরে না উল্টোটা তাতে কি এসে যায়? ওই সত্যের জন্যে পুড়ে মরার কোনও মানে হয় না। আবার আমি অনেককে মরতে দেখেছি, কারন তাঁদের মনে হয়েছে বেঁচে থাকার কোনও মানে হয় না। অবশ্য এমন সব ধারণা বা স্বপ্নের জন্যেও লোককে মরতে দেখেছি, যেগুলোর জন্যেই সে বেঁচে ছিল। অর্থাৎ বেঁচে থাকার কারন যা, মৃত্যুবরণ করার কারন হিসেবেও তা চমৎকার কাজ করে।
একটু ভেবে দেখুন, ছাত্র-ছাত্রীদের রেজাল্ট বেরনোর দিন বা তার পরে কতজনের আত্মহত্যার সংবাদ আমরা সংবাদপ্ত্রে পড়ি। এরা কি সবাই রেজাল্ট খারাপ হয়েছে বলে, আশানুরূপ নাম্বার পায়নি বলে আত্মহত্যা করে? একটি বেসরকারি সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ৪০% মানুষ মানসিক অবসাদে আত্মহত্যা করেন। এরপরেই চমকে উঠতে হয়, শুধু একাকীত্বের কারণে আত্মহত্যা করেন ৩০% মানুষ। এছাড়াও আত্মহত্যার পেছনে কাজ করে যথাক্রমে সাময়িক সমস্যা,শরীর খারাপ, কাজের জায়গায় গন্ডগল এবং আর্থিক সমস্যার কারনে।
আত্মহত্যার প্রস্ততি চলে হৃদয়ের নিভৃত নিঃশব্দ অঞ্চলে, যেভাবে শিল্প সৃষ্টি হয়। মানুষ নিজেও এই প্রক্রিয়া বিষয়ে বিশেষ কিছু জানে না। একটা সন্ধেবেলা সে ট্রিগারটা টানে, বা ঝাঁপ দেয়। একজন আত্মহত্যাকারী ব্যক্তির সম্পর্কে শুনেছিলাম, পাঁচ বছর আগে তিনি সন্তানকে হারিয়ে নিজেকে ‘লঘু’, ‘গুরুত্বহীন’ ভাবতে শুরু করেন। পোকাটা বাস করছে ব্যক্তির অন্তরে। সংবাদপত্রে এ ধরণের খবরে প্রায়ই লেখে ‘ব্যক্তিগত দুঃখ’ বা ‘দুরারোগ্য ব্যাধি’র কারনে। এসব ব্যাখ্যা ঠিক হতেই পারে। সঙ্গে এটাও দেখতে হবে, লোকটার সঙ্গে সেদিনই তার বন্ধু খুব নির্বিকার ভাবে কথা বলেছে কি না। ওই ব্যবহারটিই মূল কারন। হয়তো যত ক্ষোভ আর গ্লানি আর একঘেয়েমির ক্লান্তি তখনও অবধি চেপে বসেনি, ওই ব্যবহারটাতেই তা কালান্তক থাবা বসাল। আত্মহত্যা মানে তো একরকম স্বীকারোক্তিই। যে, জীবন তোমার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে বা জীবনের ব্যাপার-স্যাপার তুমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছ না। কিংবা জীবনের মধ্যে তুমি এমন দারুণ কিছু খুঁজে পাওনি, যার জন্যে বেঁচে থাকার মতো কষ্টকর ব্যাপার চালিয়ে যাওয়া বা টেনে চলা যায়।
অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, আত্মহত্যা মানে ভীরুতা। মোক্ষম উল্টো চালে চার্লস কোল্টন বলেছেন, কখনও কখনও আত্মহত্যা না করাটাই ভীরুতা। কোনওমতে টিকে, সেটে, ঝুলে থাকার চেয়ে ধুত্তোর বলে উঠে চলে যেতে লাগে অতিমানবিক মনের জোর। আমাদের জীবনের ইতর আবর্জনার মধ্যে আঁকশি চালিয়ে আনন্দ খোঁজাটাই দীনতা নয় কি? যে কোনও জটিল ও তেরছা মস্তিষ্কচেষ্টার মতোই আমরা এ ব্যাপারটাকেও এড়িয়ে গিয়ে প্রকৃতি দেখি, সিনেমার পোস্টারে নজর দিই বা মোবাইলে ফেসবুক করি।