ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

যাদের কথা ভেবে রাজনীতিকদের ভুঁড়ি হয়ে যায় আর চামড়া গণ্ডারের মতো শক্ত হয়ে যায়, তারা সাধারণ মানুষ? যাদের জন্যে প্রতিদিন মন্দির মসজিদে পুজো-প্রার্থনা চলে, তারা সাধারণ মানুষ? নিত্য যাদের রাস্তা-ঘাটে যাদের হেঁটে বেড়াতে দেখি তারা সাধারণ মানুষ? চারপাশের অবস্থা দেখে-শুনে বেশ কিছুদিন ধরে এই প্রশ্নটা মনে ঘুরপাক খাচ্ছে যে,মানুষ আর সাধারণ মানুষে পার্থক্য কী? কাকে বলব মানুষ আর কাকে বলব সাধারণ মানুষ? একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, মানুষ মানে হল এই সমগ্র মনুষ্যসমাজ। আর সাধারণ মানুষ হল তার ভ্যাবলা সদস্য। আরও নিখুঁত ভাবে বললে, সাধারণ মানুষ সেই, চৌবাচ্চার প্রবলেম দেখলেও যার হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যায়। দাবা খেলতে বসলে যার সর্দি হয়। আর সাধারণ মানুষ অবশ্যই সে, ভিড় রাস্তায় কাউকে ফেলে লাথিয়ে কুপিয়ে খুন করা হচ্ছে দেখলেও যে কিচ্ছুটি বলে না। যে বাজার করছিল সে বাজার করে, কেউ একমনে রাস্তার কুকুরকে দেখে, উল্টো দিকে নতুন রঙ হওয়া বাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকে আর আড় চোখে দেখে মানুষটাকে মারা কতদূর এগোল। ঠিক যেভাবে ঢাকার প্রকাশ্য রাস্তায় খুন করে মারা হল ওয়াশিকুর রহমান, অভিজিৎ রায়, অনন্তবিজয় দাসকে। মার খাওয়া মানুষটার সঙ্গী আর্ত চিৎকার করে সাহায্য চাইলেও কেউ শুনতে পায় না। তাঁদের অপরাধ, তাঁরা একটি ব্লগে মৌলবাদ-বিরোধী লেখালিখি করতেন।
দেখুন, যেখানে দুষ্কৃতিদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র আছে, সেখানে না হয় ভয়ের ব্যাপারটা বোঝা যায়। কিন্ত খুবই সাধারণ ব্যাপার, যেখানে একটা সম্মিলিত ‘অ্যাই’ বলে উঠলেও কাজ হয়। অ্যাটলিস্ট হবার একটা সম্ভাবনা থাকে। সেখানে? হাজার চোখের সামনে একটা মানুষকে চারজন মিলে লাঠি, রড দিয়ে বেধড়ক মারছে, বাইকটা ফেলে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তার সঙ্গী আকুল সাহায্য চাইছে। কিন্ত কেউ বলছে না, ‘চলুন তো দাদা দেখি, ছেলেটাকে বাঁচাই।’ ২০ জন তো দূরের কথা, ৫ জনেরও মনে হচ্ছে না, যেটা ঘটছে সেটা ঠিক হচ্ছে না, কিছু করা উচিৎ! আশ্চর্য! বাঙালি কবে থেকে এতটা অমেরুদণ্ডী হয়ে গেল?

যখন কোনও লোককে রাস্তায় ফেলে কয়েকজন পেটাচ্ছে, আর অন্য মানুষগুলোর সেটা সহ্য হচ্ছে না, এমনটা কিন্ত নয়। আর যে উচ্ছে কিনছিল, যে বেগুন কিনছিল, যে মাছের দর করছিল, যে মোবাইলে কথা বলছিল, যে রাস্তা পার হচ্ছিল তারা সেগুলো করতে করতে আড় চোখে কেউবা সামনে দাঁড়িয়ে ‘দুচোখ’ মেলে ওই মার খাওয়াটা, ওই রক্তাক্ত হওয়াটা, ওই কাতর গোঙানিটা তারা শুনছিল, দেখছিল। এবং এটা শুনতে তার ভালোই লাগছিল। তারা উপভোগ করছিল।নাহলে তো সে একছুটে বাড়ি গিয়ে দরজা বন্ধ করে বসে থাকত। তা কিন্ত সে করছে না। উল্টে জিভে লাল ফেলতে ফেলতে গোটা ঘটনাটা গিলছে।

সব দেখেশুনে বলতে ইচ্ছে করে, সত্য সেলুকাস কী বিচিত্র এই সাধারণ মানুষ। ছোটবেলা থেকে এদের শেখানো হয়েছে, অশান্তি হচ্ছে হোক, তুমি কিন্ত ঝুট-ঝামেলায় যাবে না। কী হবে কাউকে বাঁচাতে গিয়ে? কারোর উপকার করে? বরং শুধু নিজেরটা দেখো। এতে তোমার জীবন সুখের হবে। এরা সবসময় চায়, ক্ষুদিরাম হবে আমার পাশের বাড়ির ছেলে। নেতাজী সুভাষ হয়ে দুঃসাহসে ঘর ছাড়বে অন্য কেউ। আমার ছেলে নেতাজীর জীবনী লিখে এ্যাওয়ার্ড পাবে। এরাই সাধারণ মানুষ। এরা চায়, দেশের মুক্তি প্রাণের মূল্যে কিনে আনবে অন্য কেউ। আর সাধারণ মানুষ মুক্ত স্বদেশে ঘাড়ে পাউডার লাগিয়ে গদ্গদ কন্ঠে গণসংগীত গাইবে। বাঃ।

এরা হচ্ছে সেই জাত, যারা নিজের অধিকারের ব্যাপারে দু-কাঠি বেশি চায়। কিন্ত অন্যের জন্যে কিছু করতে বললেই এদের মুখে ” হেঃ হেঃ স্যর, আমি তো ফুটকি মাত্র। আমি আর কি অন্যকে সাহায্য করব বলুন! আপনি একটু বসে যাবেন না। খাঁটি দার্জিলিং টি এনেছি কাল। হেঃ হেঃ” এরা হল খাঁটি সাধারণ অ-মানুষ। হ্যাঁ, সচেতন ভাবে লিখছি সাধারণ মানুষ এখন অ-মানুষে বদলে গেছে। এদের থেকে মানবিকতা আশা করাটাই মুর্খামি।