ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

একটি সিমেন্টের বিজ্ঞাপন। টিভি-তে দেখা যায়, স্কুলে এক দিদিমণি রমেশ নামের এক ছাত্রকে প্রশ্ন করেছেন বিচ্ছেদ মানে কী? ছাত্রটি উত্তরে বলছে, আমি আর সামসুল খুব ভালো বন্ধু । আমরা দুজনে একসঙ্গে ফুটবল খেলতাম। এরপর রমেশ সামসুলের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে, কিন্ত দাদু বলেছে ও মুসলমান। ওর সঙ্গে মিশবি না। আমরা দেখি সামসুলের মাথা হেট, রমেশের মুখে কষ্ট আর দিদিমণি ভ্যাবাচ্যাকা। বিজ্ঞাপনটা দেখতেই চোখটা আটকে গেল। ধর্ম । এক মারাত্মক খতরনাক জিনিস এই ধর্ম। যা মানুষে মানুষে ভেদাভেদ তৈরি করে। অবিশ্বাস তৈরি করে। অন্যকে ঘৃণা করতে শেখায়। পেশায় সাংবাদিক হওয়ার সুবাদে, অনেক জায়গায় যেতে হয়। কথা বলতে হয় বিভিন্ন ধর্মের, পেশার মানুষের সঙ্গে । দরিদ্রের সঙ্গে, ধনীর সঙ্গে। চোরের সঙ্গে, সাধুর সঙ্গে। কিন্ত এমন কোনও এলাকা-গ্রাম-পাড়া খুঁজে পায়নি, যেখানে হিন্দু আর মুসলমান একসঙ্গে পাশাপাশি বাস করছে। সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিচ্ছে। একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসছে। এর মূলে আছে ৩ টি জিনিস। অশিক্ষা, অশিক্ষা এবং অশিক্ষা। লিখতে লিখতে একটা প্রশ্ন মাথায় এলো। আচ্ছা, সেই প্রস্তর যুগে, যখন মানুষ গুহায় থাকত, জন্তুর সঙ্গে লড়াই করে খাবার যোগাড় করত, তখন কি ধর্ম বলে কিছু ছিল? তখন কি হিন্দু, মুসলমান, খ্রিশ্চান ছিল? না কি শুধুই মানুষ ছিল? বেঁচে থাকার তাড়নায় তারা বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। কিন্ত তাদের আলাদা ধর্ম ছিল না। সেই জায়গা থেকে অশিক্ষিত, বর্বর মানুষ শিখল শিকার করতে, পশুপালন করতে, চাষ করতে। শিখল আগুনের ব্যবহার, চাকার ব্যবহার। ধীরে ধীরে তারা সভ্য হল। উদ্বৃত্ত সম্পত্তি জমিয়ে রাখতে শিখল, তখন থেকে তার মনে ভয় ঢুকল। বন্যা থেকে নিজেকে বাঁচাতে, নিজেদের ফসল বাঁচাতে, আগ্নেয়গিরি থেকে, দাবানল থেকে বাঁচতে তারা এক মহাশক্তির স্মরণ নিল। মানুষ তৈরি করল তাদের ভগবান। মানুষের সভ্যতা যেমন এগিয়েছে, পাল্লা দিয়ে তৈরি হয়েছে ধর্ম। মানুষ ভাগ করেছে, ওরা হিন্দু, ওরা মুসলমান, ওরা খ্রিশ্চান। শুধু ভুলে গেছে তাদের নিজস্ব ধর্ম, মনুষ্যধর্ম।
একটু ভেবে দেখুন, একটি শিশু কি কোনও ধর্ম নিয়ে জন্মায়? না। মুসলমান পরিবারে জন্ম নিলে তার মুসলমানি হবে। খ্রিশ্চান পরিবারে জন্মালে তাকে ‘হোলি ওয়াটার’-এ স্নান করানো হবে। এরকম আরও উদাহরণ দেওয়া যায়। তাহলে কি ধর্ম মানে হিন্দু, মুসলমান, ইহুদি, খ্রিশ্চান ইত্যাদি ইত্যাদি। এই ধর্মের সংজ্ঞা খুঁজতে গিয়ে ‘মহাভারত’-এর একটি জায়গা চোখে পড়ল। যেখানে ভীষ্ম (তখন দেবব্রত) গঙ্গা’কে জিজ্ঞেস করছেন, ধর্ম ঠিক কী মা? উত্তরে গঙ্গা বলছেন,” ধর্ম হল আইন, ধর্ম আবার চলিত প্রথাও বটে। ধর্ম তোমার কর্তব্য। তবে সবার ওপরে ধর্ম হল তোমার বিবেক, সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধি, যা দিয়ে ন্যায় থেকে অন্যায়কে পৃথক করা যায়। অপরাধকেও কোন পরিস্থিতিতে ক্ষমা করে দেওয়া যায় সে বোধ জন্মায়। দায়িত্ব আর কর্তব্য, স্নেহ আর প্রশ্রয়ে তফাত করা যায়।” এরপরেই গঙ্গা বলছেন, ” সবকিছু তো আর এভাবে শিখিয়ে দেওয়া যায় না। তবে তোমায় একটা সূত্র বলতে পারি – ধর্ম সেটাই যাতে শুভ হয় তাকে আইনেরও ওপরে, প্রথারও ওপরে স্থান দিতে হয়।”

প্রবাদে পরিণত হওয়া ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির এই ধর্মবোধ বুঝিয়েছিলেন দারুণ ভাবে। বনবাস কালে জল খেয়ে মারা গেলেন চারভাই। সবার শেষে এলেন যুধিষ্ঠির। শুরু হল ধর্মরূপী যক্ষের সঙ্গে যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে ধর্ম নিয়ে কথোপকথন। যক্ষের একের পর এক প্রশ্নের উত্তর দিলেন যুধিষ্ঠির। যক্ষ প্রসন্ন হয়ে বললেন,” তোমার এক ভাইকে আমি বাঁচিয়ে দেব।বল কাকে বাঁচাব?” যুধিষ্ঠির বললেন, ” আপনি নকুলকে বাঁচিয়ে দিন।” যক্ষ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ” অর্জুনের মতো যুদ্ধনিপুন, ভীমের মতো মহা-পরাক্রমশালী ভাই থাকতে তুমি কিনা বাঁচাতে চাইছ নকুলকে? ভীম কিংবা অর্জুন একাই তো কৌরবপক্ষ ধ্বংস করে দেবে।” এখানে যুধিষ্ঠির বাঁধিয়ে রাখার মতো উত্তর দিয়েছেন। তিনি বললেন, ” আমার দুই মা। আমি বেঁচে আছি এতে মা কুন্তীর কোল খালি হল না। আর নকুল বাঁচলে মা মাদ্রীও সন্তানহারা হবেন না। এতে দুই মায়েরই একটি করে সন্তান জীবিত থাকবে। আপনি তাই নকুলকেই বাঁচিয়ে দিন।”

তাহলে যা দেখা যাচ্ছে তা হল, ধর্ম মানে কোনও ফুল-বেলপাতা-হোলি ওয়াটার বোঝাচ্ছে না, নৈবেদ্যর ধর্ম বোঝাচ্ছে না এবং বিশেষ কোনও ধর্ম সম্প্রদায়ের কথাও বোঝানো হচ্ছে না। অতএব হিন্দু, মুসলমান, ইহুদি, খ্রিষ্টান কারও এটা মানতে আপত্তি থাকবে না যে, ধর্ম মানে এখানে সামাজিক শৃঙ্খলা, order,ধর্ম মানে এক সার্বিক সুমঙ্গল যেখানে রাজার শাসন থেকে আরম্ভ করে সাধারণের শাসিত বোধের যন্ত্রণা তৈরি হয় না। এর সঙ্গে বৃষ্টিবাদল, বন্যা, ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক সুস্থিতি তৈরি হয়ে যায়, অর্থাৎ সবকিছু তুরীয় অবস্থায় চলে আসে এবং এটাই ধর্মের সুস্থিতি। একেই বলে ধর্ম।

শেষে বলতে হয় আমির খান-এর PK সিনেমায় জ্যোতিষিকে যে কথাগুলো বলেছিলেন, ” যে ভগবান আমাদের সৃষ্টি করেছেন, তাঁর সম্পর্কে আমরা কিছু জানি না। আর যে ভগবানকে তোমরা তৈরি করেছ, সে তোমাদের মতোই মিথ্যেবাদী, স্বার্থপর, গরিবের টাকা লুটে তাকে ফুটপাথে দাঁড় করিয়ে দেওয়া একজন।”