ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

 

সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান শহরে কয়েকদল যুবক মহাত্মা গান্ধীর মূর্তিতে সাদা রং লেপে দিয়েছে। সঙ্গে তেজি স্লোগান। অবশ্যই গান্ধী-বিরোধী। ঘটনাটি ঘটার কিছুক্ষণের মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড়। কিন্ত মনে প্রশ্ন জাগে, যে সময় মিডিয়ার বাড়াবাড়ি বেড়েই চলেছে, তখন হাতের সামনে থাকা ‘জাতির জনক’-এর এই অসম্মানের এমন মুখরোচক খবরকে সংবাদমাধ্যম এড়িয়ে গেল কী করে? কেনই বা গেল? কারন, কেঁচো খুঁড়তে গেলে কেউটে বেরতে পারে ।

এবারে খবরটার একটু ভেতরে যাওয়া যাক। যারা গান্ধীর মূর্তি নোংরা করেছিল তারা একই সঙ্গে আরও কিছু মূর্তি নোংরা করেছিল, কিছু ক্ষেত্রে ভেঙে ফেলাও হয়। উল্লেখ্য তাতে ছিল রানি ভিক্টোরিয়া, প্লাস সেসিল রোডস-এর মতো কিছু মানুষ যাঁরা ‘হোয়াইট সুপ্রিমেসি’ বা অশেষ সাম্রাজ্যবাদের মূল পতাকাবাহক এবং বর্ণবৈষম্যের পক্ষে। এবং গান্ধীও তাঁদেরই একজন। আমরা যে ইতিহাস পড়ি তা তো বিদেশিদেরই লেখা। সত্যের গন্ধ পর্যন্ত সেখানে নেই। থাকলে আজ যাঁদের ছবি অফিস, আদালতে শোভা পাচ্ছে তাঁদের অনেককেই আমরা টান মেরে আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিতাম।কেন দক্ষিণ আফ্রিকার একাংশ গান্ধীকে বিসর্জন দিতে চায়? সেই চোরা স্রোতের উৎসই বা কোথায়? এর মস্ত এক কারন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতি তাঁর অসীম আনুগত্য। হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। ১৯০৬ সালে জুলু স্মপ্রদায় ইংরেজদের চাপিয়ে দেওয়া দম বন্ধ করা কর দিতে অস্বীকার করায় শুরু হয় ‘বামব্যাথা’ বিদ্রোহ। সড়ে তিন হাজার জুলু মারা যায়। হবেই তো, বন্দুকের সঙ্গে পেরে ওঠে না কি! পুড়ে ছারখার হয়ে যায় প্রায় ৭ হাজার জুলু বাড়ি। অন্যদিকে ব্রিটিশপক্ষে মৃতের সংখ্যা নগণ্য। তাঁদেরইগান্ধী ও তাঁর স্ট্রেচার বহনকারী বাহিনী নিষ্ঠা ভরে নিরাপদে নিয়ে যেতেন। এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকা ভারতীয়দের আহ্বান জানিয়েছিলেন ব্রিটিশদের হয়ে যুদ্ধ করতে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তিনি আবার ইংরেজ বাহিনীর স্ট্রেচার বওয়ার কাজ করতে চেয়েছিলেন। আর ১৯১৮ সালে যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ওপর পরাজয়ের ঘন কালো মেঘ, তখন তো বন্দুক হাতে যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে যেতে উদ্যত হয়েছিলেন। অন্য কারনটি, গান্ধীর কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানদের প্রায় একঘরে করে রেখে দেওয়ার প্রবণতা। ভাবনাপ্রবাহ। হ্যাঁ, আবার ঠিকই পড়েছেন। সাধারণ মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকলেও, যাঁরা গান্ধী-চর্চায় নিমজ্জিত, তাঁদের কাছে এই তথ্যটা সাংঘাতিক নতুন কিছু নয়, যে গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের তেমন ধর্তব্যের মধ্যে আনতেন না। তাদের বলতেন ‘কাফির’। শুধু বলতেন না, লিখে পর্যন্ত গিয়েছেন। ১৯০৮ সালে ৩৯ বছর বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকায় তাঁর জেল হয়। সেই বিবরণ দিতে গিয়ে গান্ধী লিখেছেন, ‘ আমাদের সবাইকে ধরে নিয়ে গিয়ে জেলে পুরে দেওয়া হল। গিয়ে দেখি সে জেল আদতে কাফিরদের জন্যে ছিল। আমাদের পোষাকে N চিহ্ন ছাপ দেওয়া হল। অর্থাৎ Native আফ্রিকান ও আমরা ভারতীয়রা এক পর্যায়ের। আমরা কঠোর হাজতবাসের জন্যে তৈরি ছিলাম, কিন্ত এমন মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা হবে ভাবতেও পারিনি…’ (দ্যা সাউথ আফ্রিকান গান্ধী, গুলাম ওয়াহেদ)।
১৮৯৬ সালে তৎকালীন বম্বেতে এক বক্তৃতায় নেটাল প্রদেশে ভারতীয়দের দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘ নেটাল-এর শ্বেতাজ্ঞরা ইচ্ছে করেই যেন আমাদের ওই কাফিরদের পর্যায়ে নামিয়ে আনতে চাইছেন। যে কাফিরদের একমাত্র কাজই হল শিকার করা, আর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য যত সম্ভব গরু বাছুর জোগাড় করে, সেগুলো বেঁচে বউ কেনা। তারপর বাকি জীবনটা হইহল্লা ও নগ্নতায় হেলায় বইয়ে দেওয়া…’ যে গান্ধীকে আমরা চিনি, যাঁর কথা ইতিহাসে পড়ি তাঁর সঙ্গে তো একে মেলানো যাচ্ছে না। এমন তো নয়, তাঁর এসব মন্তব্য, তাঁর এমন কাজের কথা কেউ জানে না।

প্রত্যেক বাঘা ইতিহাসবিদ, গান্ধী-গবেষকই তার সন্ধান পেয়েছেন। কিন্ত খুব ফলাও করে লেখেননি এই যা। কিছু গবেষক গান্ধীর কীর্তি মেনে নিয়ে বলেন, ‘মানুষ মাত্রই তো ভুল করে, মহাত্মাও ইমপারফেক্ট ছিলেন না, কিন্ত তিনি অন্যদের থেকে অনেক বেশি প্রগেসিভ ছিলেন।’ অর্থাৎ, এক রকম আড়াল করার প্রচেষ্টা। যা আজও হয়ে চলেছে। এসব দেখে-শুনে-পড়ে আমরা বলতে পারি, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ‘মহাত্মা’ নামের উপযুক্ত তো ননই, তিনি ‘মানুষ’ও হয়ে উঠতে পারেননি।