ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

0807_lrap_03_z+graffiti_fusion_art+sun (1)

মাত্র একটা কলমের খোচায় সূর্য এখন এক নশ্বর মহিলার সম্পত্তি। মানে সূর্য বিক্রি হয়ে গেল। স্পেনের ৪৯ বছর বয়সী অ্যাঞ্জেলস ডুরান বলেছেন, স্থানীয় নোটারি থেকে কাগজপত্রে সইসাবুদ কমপ্লিট। আইন-টাইন সমুদয় ঠিকঠাক ও নির্ভেজাল। আজ থেকে তিনিই সূর্যের মালকিন। এমন কথা শুনে সক্কলে হাঁচবে না কাশবে থই পাচ্ছে না। এমন বাণিজ্যও ঘটে বুঝি? ‘এ কি হল, ক্যামনে হল’ গাইতে গিয়ে ইন্টারনেট অবধি কেশে তুতলে একাকার।
তা, এই সূর্য স্পেনের কোথায় কিনতে পাওয়া যাচ্ছিল? কোন অফিসে দেখা করতে হল? ক’টাকা নিল? দরাদরি কি অ্যালাউ ছিল? টাকাটা কি নিজ পকেটে গুঁজল? সূর্যকে কি স্যাটেলাইট মারফত জানানো হল, ভায়া টইটই বেড়ানো ঘুচল। এবার মা ডাকলেই সুড়সুড় করে ঘরে ফিরে রুটি-কুমড়ভাজা খেয়ে হিস্ট্রি বই খুলে বসবে? এসব প্রশ্নের উত্তরে মহিলা শুধু মিটিমিটি হেসে জানিয়েছেন, ১৯৬৭ সালে হওয়া মহাকাশ চুক্তি অনুসারে, কোনও রাষ্ট্র কোনও মহাজাগতিক বস্তুকে নিজ-সম্পত্তি হিসেবে দাবি করতে পারবে না। এই আইনে দেশ বা রাষ্ট্রের কথা থাকলেও কোনও ব্যক্তির কথা তো আলাদা করে উল্লেখ নেই। তাহলে এর মানে দাঁড়ায়, যে কোনও ব্যক্তি যে কোনও মহাজাগতিক বস্তুকে যে কোনও মুহূর্তে নিজের বলে দাবি করতে পারে। মহিলা বলেওছেন, ‘যে কেউই কাজটা করতে পারত। স্রেফ আমার মাথায় সবচেয়ে আগে এসেছে, এই আর কী?’
যুক্তিটি চমৎকার। মেট্রো স্টেশনে লেখা আছে “থুতু কিংবা পানের পিক ফেলবেন না।” মন দিয়ে পড়ে আপনি ভাবলেন, ওই দুটো ছাড়া সবই তো তাহলে ফেলা যেতে পারে। “প্রস্রাব বা পায়খানা ফেলিবেন না” তো লেখা নেই। ফলে স্টেশনে বসে মহানন্দে প্যান্ট নামিয়ে নিজ-কাজে মন দিলেন। পুলিস হাঁ হাঁ করে ধরতে এলে বললেন, লেখা দেখাও। সে অর্ডার দিয়ে সাইনবোর্ড বানাতে-বানাতে আপনি মিনারেল ওয়াটারে প্রক্ষালন সেরে গন্তব্যে পৌঁছে সাতঘুম। স্বাভাবিক বুদ্ধি শিকেয় তুলে, যা লেখা আছে শুধু সেইটুকু পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে পড়ে, তার আক্ষরিক, পাঁড় আভিধানিক মানে করে সেই আনুযায়ী চলতে শুরু করলে এঁড়ে তর্কবাজকে রোখা শক্ত। যত স্মভাব্য উদ্ভট ঘটনা ভেবে তো আর নোটিস বা বিজ্ঞপ্তি লেখা যায় না। তাহলে বাড়ির সামনে সাইনবোর্ড টাঙাতে হয় – “এখানে নিষিদ্ধ-গেটের সামনে গাড়ি পার্কিং, মানুষ খুন,ধর্ষণ, চুন-সড়কি ফেলা, হাফপ্যান্ট পরে শীর্ষাসন, গ্যাস সিলিন্ডারের ওপর দাঁড়িয়ে কত্থক নাচ, জীবন্ত মাগুর মাছ গেলার চেষ্টা…”। ‘মহাশূন্য চুক্তি’-র সময় রাষ্ট্রের সর্বগ্রাসী নোলা সম্পর্কে মানুষের একটা ধারণা ছিল বলে, ওইটুকু লিখেই ক্ষান্ত দিয়েছিল। কোনওদিন যে কোনও ব্যক্তি এমন উৎকট ভাবনা নিয়ে হাজির হবে, তা তারা বোধহয় কল্পনাতেও ভাবেনি। এবার সেই ছিদ্র দিয়ে গাঁতিয়ে ঢুকে ওপরচালাকি চলছে। নাও, এবার ম্যাও সামলাও।

এই বখেরা শুধু মালিকানা প্রতিষ্ঠায় শেষ নয়, মহিলার প্ল্যান – বেওসা। কী করে? কেন, সূর্যের আলো থেকে যারা উপকার পাচ্ছে, এবার সকলেই অ্যাঞ্জেলসকে খাজনা দেবে। সত্যিই তো, আমার উনুনে তুমি পাঁউরুটি সেঁকলে আমি পয়সা চাইতে পারি না? হক কথা। সূর্য তুমি কার? আগে ছিলাম ভগবানের, এখন ডুরান মহোদয়ার।মহিলার মুঠোর কাগজে স্পষ্ট লেখাও আছে, ” পৃথিবী থেকে মোটামুটি ১৪৯, ৬০০, ০০০ কিলমিটার দূরত্বে সৌরজগতের কেন্দ্রস্থলে আবস্থিত জি-২ টাইপের নক্ষত্র সূর্য, ডুরান তার মালিক।” তা হলে যে ভুঁড়িওলা মানষটি বাগুইহাটির বারান্দায় খালি গায়ে থেবড়ে বসে নাইকুন্ডলিতে সরষের তেল দিলেন, তিনি তেরো টাকা বারো আনা কার তহবিলে জমা করবেন? যে মধ্যমগ্রামের বৌদি সারে সারে লেপ শুকোতে দিলেন, যে অষ্ট্রেলিয়ান তরুণী চামড়া ট্যান করতে বিকিনি পড়ে সমুদ্র সৈকতে মরা বেড়ালের মতো পড়ে রইল, যে সোদপুরের দিদা আচারের বয়ামগুলো ছাদে শুকতে দিল – প্রত্যেকে এবার চার্ট দেখেশুনে ডুরানের কৌটোয় যথাযথ খুচরো ফেলে আসবে। গাছেদের (সূর্যের আলো ছাড়া খাবার তৈরি করতে পারবে না) বেলায় কী হবে? গাছ মালিকের থেকে পয়সা আদায় করা হবে? মালিকহীন গাছেদের কী পেটানো হবে? রসিকতা থাক। মহিলা সত্যিই যোগাযোগ করেছেন তাঁর দেশের শিল্প-মন্ত্রকের সঙ্গে। ইতিমধ্যে বৈঠকও সারা, যাতে সৌরশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কারখানাগুলোর লাভের বখরা তিনি পান। তবে যে টাকাটা পাবেন, পুরোটাই ফুর্তি করে উড়িয়ে দেওয়ার মতো পাষণ্ড তিনি নন। বখরার ৫০ শতাংশ তিনি দেবেন সরকারকে, ২০ শতাংশ যাবে বৃদ্ধদের পেনশনে,১০ শতাংশ বিশ্বের অনাহার দূরীকরণে, ১০ শতাংশ রিসার্চে। আর বাকি ১০ শতাংশ আসবে নিজের পকেটে, মৌজ-মস্তির জন্যে।