ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

আমি অনেক দিন আপনাদের মাঝে ছিলাম না কারন আমার আম্মা গত ১৯ জুন ২০১২ইং রাত ১১টা ১৯মিনিটে ক্যান্সার নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইহকালিন জীবন ত্যাগকরে চলেগেছেন।ঠিক তার ১মাস পর ১৯ জুলাই রাত ১১টা ২৯ মিনিটে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেখলাম আমার প্রিয় স্যার আর নেই! তাই প্রিয় স্যারের “জীবনী” সংগ্রহে তখন থেকেই নেমে পরলাম।সংগ্রহ করার পর মনে হল আমি যা জানতাম না তা হয়ত অনাকেই জানে না তাই সকলের সাথে শেয়ার করতে ব্লগে লিখে দিলাম।
প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ স্যার গতকাল ১৯ জুলাই ২০১২ ইং বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ২০ মিনিটে ক্যান্সার নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের বেলভ্যু হাসপাতালে মারা যান হুমায়ূন। ৬৪ বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ করলেন। এই সম্মানিত ও স্রদ্ধাবাজন স্যারের “জীবনী” আপনাদের সামনে তুলেধরার চেষ্টা করলাম।আর কিছু জানা থাকলে আপ্নারাও শেয়ার করুন।

জন্ম
বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তী হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলায় কুতুবপুরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জন্মগ্রহণ করেন।

*হুমায়ূন আহমেদ এর কিছু অজানা কথা

সিলেটের মীরা বাজার৷ ১৯৫০-৫৫ সালের দিকের শহর৷ গাছপালা শোভিত, প্রাচীন আমলের ঘর দোর, ভাঙা রাস্তা কোথাও কোথাও কাঁচা বাড়ি৷ আবার মাঝে মাঝে খুব সুন্দর করে সাজানো গোছানো বনেদি বাড়ি৷ স্কুল ছুটির পর এমনি এক রাস্তা ধরে হেঁটে চলছে এক বালক৷ দুরন্ত ঘাস ফড়িঙের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে তাঁর চলা৷ নির্দিষ্ট কোন লক্ষ্য নেই, যেন কোন একদিকে গেলেই হল৷ ইচ্ছে হল আর হুট করে ঢুকে পড়ল কোন বাড়িতে৷ কোন কোন বাড়ি থেকে অনাহুত ভেবে বের করে দেয় আবার কোন কোন বাড়িতে একটা ছোট্ট দেব শিশু ভেবে আদর আপ্যায়নও করে৷ এমনিভাবে হাঁটতে হাঁটতে সামনে পড়ে গাছগাছালিতে ছাওয়া এক বিশাল ঘেরা জায়গা, সেখানে ধবধবে সাদা রঙের বাংলো প্যাটার্নের একটা বাড়ি৷ সিলেট এম. সি. কলেজের রসায়ন শাস্ত্রের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান এস কে রায় চৌধুরী সাহেবের বাড়ি৷ বালকের কাছে অধ্যাপকের পরিচয় হচ্ছে প্রফেসর সাব, অতি জ্ঞানী লোক- যাঁকে দূর থেকে দেখলেই পূণ্য হয়৷ তো সেদিন দুপুরে সেই প্রফেসর সাবের বাড়ির গেট খোলা পেয়ে হুট করে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে বালক৷ গাছপালার কী শান্ত শান্ত ভাব৷ মনে হচ্ছে সে যেন ভুল করে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি কোন বাড়ির বাগানে ঢুকে পড়েছে৷ একা একা অনেকক্ষণ সে হাঁটল৷ হঠাত্‍ দেখতে পেল কোনার দিকের একটি গাছের নিচে পাটি পেতে ষোল সতের বছরের একটি মেয়ে উপুর হয়ে শুয়ে আছে৷ তার হাতে একটা বই৷ সে বই পড়ছে না- তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে৷ বালকের মনে হল এত সুন্দর মেয়ে সে আর দেখেনি৷ মনে হচ্ছে মেয়েটির শরীর সাদা মোমের তৈরি৷ মেয়েটি হাত ইশারায় তাঁকে ডাকল৷ কাছে যেতেই মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, কী নাম তোমার খোকা? কাজল, বালকের উত্তর৷

এই সেই কাজল যিনি বড় হয়ে বাংলা কথাসাহিত্যে এক স্বপ্নলোকের রচনা করেছিলেন৷ আর এই স্বপ্নলোকের চাবি তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন প্রফেসর সাহেবের এই মেয়ে শুক্লা৷ সেই চাবিটির নাম অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষীরের পুতুল’৷

কাজল সিলেট থানার ওসি ফয়জুর রহমান সাহেবের বড় ছেলে৷ থানার দারোগা পুলিশ সাধারণত যেমন হয়, এই একটু খিটিমিটি স্বভাব, একটু আধটু ঘুষ, জনতা দেখে অযথাই ধমক দেওয়া তেমন নন এই ওসি সাহেব৷ বিপরীতে কবিতার প্রতি ঝোঁক, গানের প্রতি দরদ, মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর কিছুটা বিচিত্র খেয়াল নিয়ে এই ওসি সাহেবের জীবন৷ ইনি পূর্ণিমার রাতে শিশুদের আকাশ দেখাতে ভালোবাসেন৷ রাত দুপুরে স্ত্রীর বায়না মেটাতে দু’জনে মিলে নেমে যান পুকুরে৷ মাসিক বেতন নব্বুই টাকা যার একটা অংশ পাঠিয়ে দেন গ্রামের বাড়িতে, এক অংশ দিয়ে প্রতি মাসে বই কেনেন, আর বাকী যা থাকে তা তুলে দেন স্ত্রীর হাতে, আর তিনি থাকেন সারা মাস নিশ্চিন্ত৷ একবার এক মাসের প্রথম তারিখে খুব হাসিমুখে বাড়ি ফিরলেন ফয়জুর রহমান৷ বিশ্বজয় করা এক হাসি দিয়ে স্ত্রীকে বললেন, আয়েশা একটা বেহালা কিনে ফেললাম৷ স্ত্রী বিস্মিত হয়ে বললেন, কী কিনে ফেললে? বেহালা৷ বেহালা কী জন্য? বেহালা বাজানো শিখব৷ কত দাম পড়ল? দাম সস্তা, সত্তর টাকা৷ সেকেন্ড হ্যান্ড বলে এই দামে পাওয়া গেল৷ ফয়জুর রহমান সংসার চালাবার জন্য স্ত্রীর হাতে দশটি টাকা তুলে দিলেন৷ স্ত্রী হাসবেন না কাঁদবেন ভেবে পেলেন না৷ এই বিচিত্র খেয়ালি মানুষটি শেষাবধি অবশ্য বেহালা বাজানো শিখতে পারেননি৷ একদিন তাঁর সাধের বেহালা তাঁর শিশু সন্তানদের অধিকারে চলে গেল৷ তারা বেহালার বাক্স দিয়ে পুতুলের ঘর বানাল৷ এই খেয়ালি মানুষটিই একদিন পাহাড়ের মতো কঠিন আর অটল হয়ে গিয়েছিলেন৷ তখন ১৯৭১ সাল৷ বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বছর৷ তিনি তখন পিরোজপুর থানার ওসি৷ পাকিস্তানি হায়েনারা তাঁর সামনে এলে তিনি পাহাড়ের মতো অটল ও স্থির থেকে হাসিমুখে মেনে নিয়েছিলেন মৃত্যুকে৷ মাতৃভূমির মর্যাদা রক্ষায় ধনুকের ছিলার মতো বুক টান টান করে দাঁড়িয়েছিলেন হানাদারদের বেয়নেটের সামনে৷ মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার অপরাধে পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে লাশ ফেলে দেয় ধলেশ্বরী নদীর পানিতে৷ স্থানীয় লোকজন তাঁর মৃত শরীর পানি থেকে তুলে নদীতীরেই দাফন করেন৷ পরবর্তীতে যুদ্ধশেষে তাঁর সন্তানেরা তাঁর দেহাবশেষ সেখান থেকে তুলে আবার কবর দেন৷ এই শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদ সাহেবের বড় ছেলে কাজল আমাদের আজকের বাংলা কথাসাহিত্যের নতুন স্রোতের নকীব হুমায়ূন আহমেদ৷

পাকিস্তান জন্মের পরের বছর জন্ম নেন হুমায়ূন আহমেদ৷ সাল ১৯৪৮৷ তারিখ ১৩ নভেম্বর৷ এক শীতের রাতে৷ জন্ম মাতুলালয়ে, নেত্রকোণা জেলার মোহনগঞ্জের কুতুবপুর গ্রামে৷ বাবা ফয়জুর রহমান ও মা আয়েশা ফয়েজের প্রথম সন্তান তিনি৷ ফলে অত্যধিক বাড়াবাড়ি রকমের আদরের মধ্য দিয়ে তাঁর শৈশবের দিনগুলি রাতগুলি পার হতে থাকে৷ বাবার ধারণা ছিল তাঁর প্রথম সন্তান হবে মেয়ে৷ তিনি মেয়ের নামও ঠিক করে রেখেছেন৷ তাঁর অনাগত কন্যা সন্তানটির জন্য তিনি একগাদা মেয়েদের ফ্রক বানিয়ে রেখেছেন৷ বানিয়ে রেখেছেন রূপার মল৷ তাঁর মেয়ে মল পায়ে দিয়ে ঝুম ঝুম করে হাঁটবে- তিনি মুগ্ধ হয়ে দেখবেন৷ কিন্তু ছেলে হওয়াতে তাঁর সব পরিকল্পনা মাঠে মারা গেল৷ তবে তিনি হাল ছাড়েন নি৷ তাঁর এই পুত্র সন্তানটিকে তিনি দীর্ঘদিন মেয়েদের সাজে সাজিয়ে রেখেছেন৷ এমন কি তাঁর মাথার চুলও ছিল মেয়েদের মতো লম্বা৷ লম্বা চুলে মা বেণি করে দিতেন৷ বেণি করা চুলে রংবেরংয়ের ফিতা পরে হুমায়ূন আহমেদের শৈশবের শুরু৷ তাঁর শৈশবের প্রথম অধ্যায়টি যতটা স্নেহ ও মমতায় কেটেছে দ্বিতীয় অধ্যায়টি কেটেছে ততটাই বঞ্চনার ভেতর দিয়ে৷ শৈশবে তাঁর মা টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হন৷ জ্বর থেকে সুস্থ হওয়ার পর তাঁর স্মৃতিবিভ্রম দেখা দেয়৷ তিনি কাউকেই চিনতে পারছেন না, এমন কি তাঁর ছেলেকেও না৷ ফলে হুমায়ূন আহমেদকে পাঠিয়ে দেয়া হয় নানার বাড়ি মোহনগঞ্জে৷ সেখানে দু’বছর তিনি নানা-নানির আদরে বেড়ে উঠেন৷ দু’বছর পর মা সুস্থ হয়ে ওঠে৷ এরপর দশ বছর বয়স পর্যন্ত হুমায়ূন আহমেদের মোহনীয় শৈশব কেটেছে৷ বাবার চাকুরী সূত্রে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায়, বিচিত্রসব দৃশ্যাবলীর ভেতর দিয়ে তিনি ঘুরে ঘুরে তাঁর শৈশব অতিবাহিত করেছেন৷ সিলেট থেকে বাবা বদলী হন দিনাজপুরের জগদ্দলে৷ সেখানে জঙ্গলের ভেতর এক জমিদার বাড়িতে তাঁরা থাকতেন৷ জগদ্দলের দিনগুলি তাঁর কাছে ছিল হিরন্ময়৷ বাবার সাথে জঙ্গলে ভ্রমণ করতেন৷ গুলিভর্তি রাইফেল হাতে বাবা তাঁর ছেলেমেয়েদের নিয়ে জঙ্গলে ঢুকতেন৷ ঘন পাতার ফাঁক দিয়ে অল্প অল্প আলো আসত৷ থমথমে জঙ্গল৷ বিচিত্র সব পাখি ডাকত৷ বুনো ফুলের গন্ধ৷ পরিষ্কার বনে চলার পথ৷ বিচিত্র বন্য ফল৷ জঙ্গল পেরোলেই নদী৷ চকচকে বালির উপর দিয়ে স্বচ্চ পানি বয়ে যেত৷ দুপুরে সেই নদীতে গোসল করতেন৷ একবারেই আলাদা এক জীবন৷ জগদ্দল থেকে আবার বদলী৷ পঞ্চগড়ে৷ সেখানে ভোরবেলা বাসার সামনে দাঁড়ালে কাঞ্চনজঙ্ঘার তুষার শুভ্র চূড়া চোখের সামনে ঝলমল করে উঠত৷ পঞ্চগড় থেকে এবার রাঙামাটি৷ পাহাড়ি উপত্যকায় আবার সেই উদ্দাম ঘুরে বেড়ানোর দিন৷ কী লোভনীয় শৈশব কেটেছে তাঁর! হুমায়ূন আহমেদের শৈশব কেটেছে এমনি স্বপ্নময়তার ভেতর দিয়ে৷

শৈশব

শৈশবে হুমায়ূন আহমেদ যত জায়গায় গিয়েছেন তার মাঝে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ছিলো দিনাজপুরের জগদ্দল৷ তার প্রধান কারণ ছিল তাঁরা যেখানে থাকতেন তার আশেপাশে কোন স্কুল ছিল না৷ স্কুলের কথা মনে হলেই হুমায়ূন আহমেদের মুখ এমন তেতো হয়ে যেত যে, মনে হত যেন তাঁর মুখে জোর করে কেউ ঢেলে দিয়েছে নিশিন্দা পাতার রস৷ বাবা মা তাঁকে স্কুলে পাঠাতেন বটে তবে স্কুলে সময় কাটাতেন কেবল দুষ্টুমি করে৷ টেনে টুনে পাশ করতেন৷ প্রাইমারি স্কুল পাশের পর এই হুমায়ূন বদলে যান৷ ষষ্ট শ্রেণিতে উঠার পর থেকে স্কুলের প্রতি তাঁর আগ্রহ বাড়তে থাকে৷ আগ্রহটা এমনি ছিল যে এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট হওয়ার পর দেখা গেল তিনি সম্মিলিত মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছেন৷ ১৯৬৫ সালে বগুড়া জিলা স্কুল থেকে তিনি এসএসসি পাস করেন ৷ ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৬৭ সালে তিনি এইচএসসি পাস করেন৷ এইচএসসি পরীক্ষাতেও তিনি মেধা তালিকায় স্থান করে নিয়েছিলেন৷ ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে৷ ১৯৭২ সালে রসায়ন বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সাথে স্নাতকোত্তর পাশ করে তিনি একই বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন৷ পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে প্রফেসর যোসেফ এডওয়ার্ড গ্লাসের তত্ত্বাবধানে পলিমার কেমিস্ট্রিতে পিএইচডি ডিগ্রি নেন৷ ড. হুমায়ূন আহমেদ লেখালেখিতে অধিক সময় এবং চলচ্চিত্রে নিয়মিত সময় দেবার জন্য পরবর্তীতে অধ্যাপনা পেশা ছেড়ে দেন ৷

বাংলাদেশের লেখালেখির ভুবনে প্রবাদ পুরুষ হুমায়ূন আহমেদ৷ গত ত্রিশ বছর ধরেই তাঁর তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা৷ ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাস দিয়ে সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর আত্মপ্রকাশ৷ ‘নন্দিত নরকে’ যখন প্রকাশ হয় তখনই বোঝা গিয়েছিলো কথা সাহিত্যের কঠিন ভুবনে তিনি হারিয়ে যেতে আসেন নি, থাকতেই এসেছেন৷ ফলে এদেশের সাহিত্যাকাশে তিনি ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করছেন৷ তাঁর মধ্যে এই অমিত সম্ভাবনা তখনই টের পেয়ে প্রখ্যাত লেখক সমালোচক আহমদ শরীফ এক গদ্যের মাধ্যমে তাঁকে অভিনন্দিত করেছিলেন৷ আহমদ শরীফের প্রশংসা যে অপাত্রে ছিল না তা তো আজ সর্বজন বিদিত৷ মধ্যবিত্ত জীবনের কথকতা সহজ সরল গদ্যে তুলে ধরে পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছেন আজ পঁয়ত্রিশ বছর ধরে৷ শুধু মধ্যবিত্ত জীবনের কথকতা বয়ানেই সীমিত নয় তাঁর কৃতিত্ব, বেশ কিছু সার্থক সায়েন্স ফিকশন-এর লেখকও তিনি৷ জনপ্রিয় চরিত্র মিসির আলী ও হিমুর স্রষ্টা তিনি- যে দু’টি চরিত্র যথাক্রমে লজিক এবং এন্টি লজিক নিয়ে কাজ করে৷

হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যের ভিতটা গড়ে ওঠে পারিবারিক বলয় থেকেই৷ বাবা ছিলেন সাহিত্যের অনুরাগী৷ বাসায় নিয়মিত সাহিত্য আসর বসাতেন, সেই আসরের নাম ছিলো সাহিত্য বাসর৷ গল্প লিখার অভ্যেসও ছিল তাঁর৷ যদিও সেসব গল্প কোথাও ছাপা হয় নি৷ তবে গ্রন্থাকারে তা প্রকাশিত হয়েছিলো৷ গ্রন্থের নাম ‘রিক্তশ্রী পৃথিবী’৷ তাঁর বাবা, সন্তানদের মধ্যে যেন সাহিত্য বোধ জেগে ওঠে সে চেষ্টা করেছেন সবসময়৷ মাঝে মাঝে দেখা যেত তিনি নির্দিষ্ট একটা টপিক দিয়ে ছেলেমেয়েদের কবিতা লিখতে বলতেন, ঘোষণা করতেন যার কবিতা সবচেয়ে ভাল হবে তাকে দেওয়া হবে পুরস্কার৷ হুমায়ূন আহমেদের বড় মামা শেখ ফজলুল করিম যিনি তাঁদের সাথেই থাকতেন এবং যিনি ছিলেন তাঁদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী, তিনি কবিতা লিখতেন, লিখতেন নাটক এবং সেই নাটক তিনি তাঁর ভাগ্নে-ভাগ্নিদের দিয়ে বাসায় গোপনে গোপনে মঞ্চস্থও করাতেন৷ আর হুমায়ূন আহমেদের নিজের ছিল গল্প উপন্যাসের প্রতি অসাধারণ টান৷ তাঁর এই টান তৈরি করে দিয়েছিলেন মীরা বাজারের প্রফেসর রায় চৌধুরী সাহেবের মেয়ে শুক্লা৷ যিনি তাঁকে ‘ক্ষীরের পুতুল’ নামের বইটি উপহার দিয়ে সাহিত্যের প্রতি এই অসাধারণ টানের সৃষ্টি করেছিলেন৷ প্রথম যেদিন তিনি ওই বাড়িতে ( যে বাড়ির বর্ণনা লেখার শুরুতে দিয়েছি) যান শুক্লা তখন তাঁকে মিষ্টি খেতে দিয়েছিলেন৷ মিষ্টির লোভে দ্বিতীয় দিন আবার সেই বাড়িতে গেলে শুক্লা আবার তাঁকে মিষ্টি খেতে দেন৷ তৃতীয় দিন তিনি তাঁর ছোট বোন শেফালিকে নিয়ে যান৷ শুক্লাদের বাড়িতে তখন মিষ্টি ছিল না৷ শুক্লা তখন মিষ্টির পরিবর্তে তাঁদের হাতে তুলে দেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষীরের পুতুল’ বইটি৷

‘ক্ষীরের পুতুল’ হলো হুমায়ূন আহমেদের পড়া প্রথম সাহিত্য৷ যদিও তার বাবার বিশাল লাইব্রেরি ছিলো৷ কিন্তু সমস্ত বই তিনি তালাবদ্ধ করে রাখতেন৷ তিনি হয়ত ভেবেছিলেন তাঁর বাচ্চাদের এসব বই পড়ার সময় এখনো হয়নি৷ কিন্তু ‘ক্ষীরের পুতুল’ পড়ার পর তিনি তাঁর বাবার বইয়ের আলমিরা থেকে বই চুরি করে লুকিয়ে পড়তে শুরু করলেন এবং একদিন বাবার হাতে ধরা খেলেন৷ বাবা তাঁকে নিয়ে গেলেন সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদে৷ বইয়ের এক বিশাল সংগ্রহ সেখানে৷ যেদিকে চোখ যায় শুধু বই আর বই৷ বাবা তাঁকে লাইব্রেরির মেম্বার করে দিলেন৷ সম্ভবত তিনিই ছিলেন এই লাইব্রেরির সর্ব কনিষ্ঠ সদস্য৷ এইভাবে হুমায়ূন আহমদের সাহিত্যের প্রতি জন্ম নেয় গভীর ভালোবাসা৷

যদিও তাঁর প্রথম রচনা ‘নন্দিত নরকে’ তবে তারও বহু পূর্বে তিনি একটি সাহিত্য রচনা করেছিলেন৷ দিনাজপুরের জগদ্দলে থাকা অবস্থায়৷ জগদ্দলের যে জমিদার বাড়িতে তাঁরা থাকতেন৷ সেখানে জমিদারের পরিত্যাক্ত সম্পত্তির তালিকায় ছিল একটি কুকুর৷ জমিদারের অনেকগুলি কুকুর ছিল৷ তিনি সবকটি কুকুরকে নিয়ে যেতে চাইলেও এই কুকুরটি যায়নি৷ রয়ে গিয়েছিল বাড়ির মায়ায় আটকা পড়ে৷ কুকুরটির নাম ছিলো বেঙ্গল টাইগার৷ তাঁরা যেখানেই যেতেন কুকুরটি সাথে সাথে যেত৷ কুকুরটির সাথে তাঁদের একরকম বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল৷ একদিন ভোরবেলা হুমায়ূন আহমেদ জমিদার বাড়ির মন্দিরের চাতালে বসে আছেন তাঁর সাথে আছে ছোট বোন শেফালি ও ছোট ভাই জাফর ইকবাল৷ কিছুক্ষণ পর তাঁর মা তাঁদের সবার ছোট ভাই আহসান হাবীবকে বসিয়ে রেখে গেলেন, আর তাঁদের উপর দায়িত্ব দিয়ে গেলেন তাঁকে দেখে রাখার জন্য৷ মা চলে যাওয়ার পর দেখতে পেলেন একটা প্রকাণ্ড কেউটে দরজার ফাঁক থেকে বের হয়ে এসেছে৷ ফণা তুলে হিস হিস শব্দে সে আহসান হাবীবের দিকে এগিয়ে আসছে৷ ঠিক তখুনি বেঙ্গল টাইগার ঝাঁপিয়ে পড়ে সাপটির ফলা কামড়ে ছিঁড়ে ফেলে৷ সাপও তার মরণ ছোবল বসিয়ে দিয়ে যায় কুকুরের গায়ে৷ দু’দিন পর যখন বিষক্রিয়ায় কুকুরের শরীর পচে গলে যেতে থাকে তখন তাঁদের বাবা মৃত্যুযন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবার জন্য কুকুরটিকে গুলি করে মেরে ফেলেন৷ এই ঘটনা হুমায়ূন আহমেদের মনে গভীর দাগ কাটে৷ এই কুকুরকে নিয়েই তিনি প্রথম কিছু লিখেছিলেন, নাম দিয়েছিলেন বেঙ্গল টাইগার (অথবা আমাদের বেঙ্গল টাইগার)৷ তারপর ১৯৭২ সালে ‘নন্দিত নরকে’ রচনা করেন৷ তারপর তো সবই ইতিহাস৷ একে একে শঙ্খনীল কারাগার, রজনী, গৌরিপুর জংশন, অয়োময়ো, দূরে কোথাও, ফেরা, কোথাও কেউ নেই, আমার আছে জল, অচিনপুর, এইসব দিনরাত্রিসহ দুইশতাধিক উপন্যাসের জনক হূমায়ূন আহমেদ৷

পেশাগত জীবনে হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন শাস্ত্রের অধ্যাপক৷ শিক্ষক হিসেবে ছাত্রদের মাঝে তিনি ছিলেন তুমুল জনপ্রিয়৷ আর ঔপন্যাসিক হিসেবে তিনি এতটাই জনপ্রিয় যে শরত্‍চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পর বাংলা কথাসাহিত্যে এত জনপ্রিয়তা আর কারও মাঝে দেখা যায়নি৷ তিনি যেন গল্পের সেই পরশ পাথর- যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানেই ফলেছে সোনা৷ কেবল অধ্যাপনা আর কথাসাহিত্যই নয়, তিনি যখন অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে হাত দিলেন সেখানেও সাফল্যদেবী তাঁর মুঠোয় ধরা দিয়েছে৷ তাঁর নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমনি’ ৷ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এই চলচ্চিত্রটি দেখতে প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের ঢল নেমেছিল৷ মাসের পর মাস ধরে এই চলচ্চিত্রটি বক্স অফিস দখল করে রেখেছিল৷ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে আটটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে নিয়েছিল এই ছবিটি৷ তাঁর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আরেকটি চলচ্চিত্র ‘শ্যামল ছায়া’ বিদেশী ভাষার ছবি ক্যাটাগরিতে অস্কার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল৷ তাঁর অন্য কীর্তি শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, চন্দ্রকথা প্রভৃতি চলচ্চিত্রগুলি কেবল সুধীজনের প্রশংসাই পায়নি, মধ্যবিত্ত দর্শকদেরও হলমুখী করেছে বহুদিন পর৷ টিভি নাট্যকার হিসেবেও তিনি সমান জনপ্রিয়৷ তাঁর প্রথম টিভি নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’ মধ্য আশির দশকে তাঁকে এনে দিয়েছিল তুমুল জনপ্রিয়তা৷ তাঁর হাসির নাটক ‘বহুব্রীহি’ এবং ঐতিহাসিক নাটক ‘অয়োময়ো’ বাংলা টিভি নাটকের ইতিহাসে একটি অনন্য সংযোজন৷ নাগরিক ধারাবাহিক ‘কোথাও কেউ নেই’-এর চরিত্র বাকের ভাই বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছিল টিভি দর্শকদের কাছে৷ নাটকের শেষে বাকের ভাইয়ের ফাঁসির রায় হলে ঢাকার রাজপথে বাকের ভাইয়ের মুক্তির দাবীতে মিছিল হয়েছিলো৷ বাংলা নাটকের ইতিহাসে এমনটি আর হয়নি কখনো৷ এছাড়াও অসংখ্য বিটিভি ও প্যাকেজ নাটকের নির্মাতা তিনি৷ নাট্যকার- নির্দেশক দুই ভূমিকায়ই সমান সফল৷ সফল শিল্পের আরেকটি শাখা চিত্রকলাতেও৷ তাঁর চিত্রশিল্পের স্বাক্ষর নিজ বাড়ির দেয়ালে টাঙানো রয়েছে৷

হুমায়ূন আহমেদের জন্ম পীরবংশে৷ নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া থানার বিখ্যাত পীর জাঙ্গির মুনশি’র ছেলে মৌলানা আজিমুদ্দিন হুমায়ূন আহমেদের দাদা৷ তিনি ছিলেন একজন উঁচুদরের আলেম এবং মৌলানা৷ হুমায়ূন আহমেদের বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ছিলেন পুলিশ অফিসার আর মা ছিলেন গৃহিনী৷ তিন ভাই দুই বোনের মাঝে তিনি সবার বড়৷ তাঁর ছোটভাই জাফর ইকবাল একজন প্রখ্যাত কম্পিউটার বিজ্ঞানী৷ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান৷ তিনিও একজন কথাসাহিত্যিক৷ সবার ছোট ভাই আহসান হাবীব নামকরা কার্টুনিস্ট এবং রম্য লেখক৷ দেশের একমাত্র কার্টুন পত্রিকা উন্মাদ’র কার্যনির্বাহী সম্পাদক৷ হুমায়ূন আহমেদ ১৯৭৩ সালে গুলতেকিনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন৷ হুমায়ূন এবং গুলতেকিন দম্পতির চার ছেলে-মেয়ে৷ দীর্ঘ ৩২ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটিয়ে ২০০৫ সালে ডিভোর্সের মাধ্যমে তাঁরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যান৷ এরপর তিনি অভিনেত্রী ও পরিচালক মেহের আফরোজ শাওনকে বিয়ে করেন৷ শাওন ১৯৯০ সাল থেকে টিভিতে অভিনয় শুরু করেন৷ পরবর্তীতে চলচ্চিত্রের সঙ্গেও যুক্ত হন৷
হুমায়ূন শাওন দম্পতির এক পুত্র সন্তান৷

শৈশবের বালক হুমায়ূন আহমেদ যেমন ভালোবাসতেন গাছপালা শোভিত সবুজ অরণ্যানীর ভেতর ঘুরে বেড়াতে, বিটোভেনের সুরের মতন টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুনতে, তেমনি এই ষাট বছরেও তাঁর সবুজের ভেতর হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করতো, ইচ্ছে করতো আজও বৃষ্টির শব্দের ভেতর নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে৷ ইট কাঠের খাঁচায় বন্দী এই রাজধানী ঢাকা তাঁর দম বন্ধ করে আনতো৷ আর তাই তিনি গাজীপুরের শালবনের ভেতর তৈরি করেছিলেন এক বিশাল নন্দন কানন নুহাশ পল্লী৷ তাঁর বেশির ভাগ সময়ই কাটাতেন নুহাশ পল্লীর শাল গজারির সাথে কথা বলে , বৃষ্টির শব্দের সাথে মিতালি করে৷

বিংশ শতাব্দীর বাঙ্গালী জনপ্রিয় ঔপন্যাসিকদের মধ্যে অন্যতম। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার এবং নাট্যকার। বলা চলে যে বাংলা সায়েন্স ফিকশনের তিনি পথিকৃৎ। নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবেও তিনি সমাদৃত। তাঁর আরেক পরিচয়ঃ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর রসায়ন বিভাগের একজন প্রাক্তন অধ্যাপক। অতুলনীয় জনপ্রিয়তা সত্বেও তিনি অন্তরাল জীবন-যাপন করেছেন এবং লেখলেখি ও চিত্রনির্মাণের কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে, বেশ কিছু গ্রন্থ স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত।

প্রিয়তমার সাথে বিশেষ মুহুর্তে হুমায়ূন আহমেদ

পরিবার

তাঁর পিতা ফয়জুর রহমান আহমদ এবং মা আয়েশা আখতার খাতুন। তাঁর পিতা একজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন এবং তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। তার অনুজ মুহম্মদ জাফর ইকবাল দেশের একজন বিজ্ঞান শিক্ষক এবং কথাসাহিত্যিক; সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা আহসান হাবীব রম্য সাহিত্যিক এবং কার্টুনিষ্ট।

ছোটকালে হুমায়ূন আহমেদের নাম ছিল শামসুর রহমান; তাঁর পিতা নিজ নাম ফয়জুর রহমানের সাথে মিল রেখে ছেলের নাম রাখেন শামসুর রহমান। পরবর্তীতে তিনি নিজেই নাম পরিবর্তন করে ‌হুমায়ূন আহমেদ রাখেন। হুমায়ূন আহমেদের ভাষায়, তাঁর পিতা ছেলেমেয়েদের নাম পরিবর্তন করতে পছন্দ করতেন। তাঁর ছোটভাই মুহম্মদ জাফর ইকবালের নাম আগে ছিল বাবুল এবং ছোটবোন সুফিয়ার নাম ছিল শেফালি। হুমায়ূন আহমেদের মতে, তার বাবা যদি আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতেন, তবে তাদের নাম আরো কয়েক দফা পরিবর্তন করতেন।

হুমায়ূন আহমেদের প্রথম স্ত্রীর নাম গুলতেকিন আহমেদ। তাদের বিয়ে হয় ১৯৭৩ সালে। এই ঘরে তাদের তিন মেয়ে এবং দুই ছেলে জন্মগ্রহণ করে। তিন মেয়ের নাম বিপাশা আহমেদ, নোভা আহমেদ, শীলা আহমেদ এবং ছেলের নাম নূহাশ আহমেদ। অন্য আরেকটি ছেলে অকালে মারা যায়। ১৯৯০ খৃস্টাব্দের মধ্যভাগ থেকে শীলা আহমেদের বান্ধবী এবং তার বেশ কিছু নাটক-চলচ্চিত্রে অভিনয় করা অভিনেত্রী শাওনের সাথে হুমায়ূন আহমেদের ঘনিষ্ঠতা জন্মে। এর ফলে সৃষ্ট পারিবারিক অশান্তির অবসানকল্পে ২০০৫-এ গুলতেকিনের সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয় এবং ঐ বছরই শাওনকে বিয়ে করেন। এ ঘরে তাদের তিন ছেলেমেয়ের জন্মগ্রহণ করে। প্রথম ভূমিষ্ঠ কন্যটি মারা যায়। ছেলেদের নাম নিষাদ হুমায়ূন ও নিনিত হুমায়ুন।

শিক্ষা এবং কর্মজীবন

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন এবং বিএসসি ও এমএসসি ডিগ্রী লাভ করেন। পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার রসায়ন বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি লাভ করেন। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে তিনি অধ্যাপনা ছেড়ে লেখালিখি, নাটক নির্মাণ এবং চলচ্চিত্র নির্মাণে সম্পূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করেন।

সাহিত্যকৃতি <img

ছাত্র জীবনে একটি নাতিদীর্ঘ উপন্যাস রচনার মধ্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যজীবনের শুরু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসীন হল-এর অধিবাসী ছাত্র হুমায়ূন আহমেদের এই উপন্যাসটির নাম নন্দিত নরকে। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে উপন্যাসটি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। ১৯৭২-এ কবি-সাহিত্যিক আহমদ ছফার উদ্যোগে উপন্যাসটি খান ব্রাদার্স কর্তৃক গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রখ্যাত বাঙলা ভাষাশাস্ত্র পণ্ডিত আহমদ শরীফ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এ গ্রন্থটির ভূমিকা লিখে দিলে সবার মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি হয়। শঙ্খনীল কারাগার তাঁর ২য় গ্রন্থ। এ পর্যন্ত (২০০৯) তিনি দুই শতাধিক গল্পগ্রন্থ ও উপন্যাস প্রকাশনা করেছেন। তাঁর রচনার প্রধান কয়েকটি বৈশিষ্টের মধ্যে অন্যতম হলো 'গল্প-সমৃদ্ধি'। এছাড়া তিনি অনায়াসে ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে অতিবাস্তব ঘটনাবলীর অবতারণা করেন যাকে একরূপ যাদু বাস্তবতা হিসেবে গণ্য করা যায়। তাঁর গল্প ও উপন্যাস সংলাপপ্রধান। তাঁর বর্ণনা পরিমিত এবং সামান্য পরিসরে কয়েকটি মাত্র বাক্যের মাধ্যমে চরিত্র চিত্রণের অদৃষ্টপূর্ব প্রতিভা তাঁর রয়েছে। যদিও সমাজসচেতনতার অভাব নেই তবু লক্ষ্যণীয় যে তাঁর রচনায় রাজনৈতিক প্রণোদনা অনুপস্থিত। সকল রচনাতেই একটি প্রগাঢ় শুভবোধ ক্রীয়াশীল থাকে; ফলে 'ভিলেইন' চরিত্রও তাঁর লেখনীতে লাভ করে দরদী রূপায়ণ। অনেক রচনার মধ্যে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধির প্রচ্ছাপ লক্ষ্য করা যায়। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত উপন্যাস মধ্যাহ্ন তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা হিসেবে পরিগণিত। এছাড়া জ্যোৎস্না ও জননীর গল্প আরেকটি বড় মাপের রচনা যা কি-না ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তযুদ্ধ অবলম্বন করে রচিত। তবে সাধারণত তিনি সমসাময়িক ঘটনাবলী নিয়ে লিখে থাকেন। তাঁর গল্প সংগ্রহ ১৯৭১ বাংলা ছোটগল্প জগতে একটি নতুন দিগন্ত বলে গণ্য হয়। গল্প তৈরীতে তাঁর প্রতিভা তুলনা রহিত।

টিভি প্রোগ্রামে হুমায়ূন আহমেদ

টিভি নাটক

১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য নাটক রচনা শুরু করেন তিনি। এটি তাকে রাতারাতি জনপ্রিয় করে তোলে।
তার অন্যতম ধারাবাহিক নাটক –
এইসব দিন রাত্রি
বহুব্রীহি
কোথাও কেউ নেই
নক্ষত্রের রাত
অয়োময়
আজ রবিবার
এদের বেশিরভাগই ৮০ থেকে ৯০ এর দশকে নির্মিত। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি অনেক প্যাকেজ নাটক নির্মাণ করেছেন।

আমার আছে জল এর পোস্টার

চলচ্চিত্র নির্মাণ

টেলিভিশনের জন্য একের পর এক দর্শক-নন্দিত নাটক রচনার পর হুমায়ূন আহমেদ ১৯৯০-এর গোড়ার দিকে চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন। শ্যামল ছায়া চলচ্চিত্রটি তিনি নির্মাণ করেছেন ১৯৭১এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। এটি অস্কার প্রদর্শনীর জন্য মনোনীত হয়। আগুনের পরশমণি তাঁর আরেকটি দর্শক নন্দিত চলচ্চিত্র।

শুটিং স্পটে হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদের গান

হুমায়ূন আহমদের গান বলতে বাঙলা ভাষার অন্যতম প্রধান কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ রচিত গান বোঝানো হয়ে থাকে। হুমায়ূন আহমেদ মূলতঃ গান রচয়িতা বা গীতিকার নন। কেবল নাটক ও চলচ্চিত্রের প্রয়োজনে তিনি গান রচনা করে থাকেন। তার অনেকগুলো গান বেশ জনপ্রিয়। এসবের এলবাম প্রকাশিত হয়েছে।

ব্যক্তিজীবন

ঢাকা শহরের অভিজাত আবাসিক এলাকা ধানমন্ডীতে নির্মিত তাঁর বাড়ীর নাম দখিন হাওয়া। আর ঢাকার অদূরে গাজীপুরের গ্রামাঞ্চলে স্থাপিত বাগান বাড়ী নূহাশ পল্লীতে কাটে তার বেশীর ভাগ সময়। তিনি বিবরবাসী মানুষ তবে মজলিশী। রসিকতা তার প্রিয়। তিনি ভণিতাবিহীন। নিরবে মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি ও আচার-আচরণ পর্যবক্ষেণ করা তার শখ। তবে সাহিত্য পরিমণ্ডলের সংকীর্ণ রাজনীতি বা দলাদলিতে তিনি কখনো নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন নি। তিনি স্বল্পবাক, কিছুটা লাজুক প্রকৃতির মানুষ এবং বিপুল জনপ্রিয়তা সত্বেও অন্তরাল জীবন-যাপনে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তিনি ছবি এঁকেও অবসর সময় কাটাতে ভালবাসেন। তিনি অত্যন্ত অভিমানী প্রকৃতির মানুষ। স্ত্রী গুলতেকিনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদের পর আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের কাছ থেকে যে বৈরীতামূলক ব্যবহার পেয়েছেন তা তাঁক ব্যথিত করেছে। হৃদরোগের কারণে তিনি প্রায়শঃ মৃত্যুচিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়েন। বাংলাদেশে তাঁর প্রভাব তীব্র ও গভীর; এজন্যে জাতীয় বিষয়ে ও সংকটে প্রায়ই তাঁর বক্তব্য সংবাদ মাধ্যমসমূহ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে থাকে।

পুরস্কার

বাংলা একাডেমী পুরস্কার ১৯৮১
শিশু একাডেমী পুরস্কার
একুশে পদক ১৯৯৪
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ কাহিনী ১৯৯৩, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ১৯৯৪, শ্রেষ্ঠ সংলাপ ১৯৯৪)
লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩)
মাইকেল মধুসুদন পদক (১৯৮৭)
বাকশাস পুরস্কার (১৯৮৮)
হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯০)
জয়নুল আবেদীন স্বর্ণপদক

ক্যান্সারে আক্রান্ত ও চিকিৎসা
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ওঠা ছবি

উল্লেখ্য গত ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১১ বুধবার সকাল ৭ টার ফ্লাইটে উন্নত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র গিয়েছেন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ। বৃহদান্ত্রে ক্যান্সার ধরা পড়ার পর গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর চিকিৎসার জন্য নিউ ইয়র্কে যান হুমায়ূন আহমেদ। সেখানে মেমোরিয়াল স্লোয়ান-কেটরিং ক্যান্সার সেন্টারে চিকিৎসা নিতে শুরু করেন তিনি। দুই পর্বে মোট ১২টি কেমো থেরাপি নেওয়ার পর গত ১২ জুন বেলভ্যু হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের প্রধান ডা. জেইন এবং ক্যান্সার সার্জন জজ মিলারের নেতৃত্বে হুমায়ূন আহমেদের দেহে অস্ত্রোপচার হয়। অস্ত্রোপচারের পর ১৯ জুন বাসায় ফিরেছিলেন এই লেখক। স্ত্রী শাওনসহ সন্তানদের নিয়ে কুইন্সে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকছিলেন তিনি। বাসায় ফিরলেও অবস্থার অবনতি ঘটলে পুনরায় বেলভ্যু হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। ২১ জুন তার দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার হয়। এরপর গত কয়েকদিন ধরে হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ছিলেন তিনি।

অস্ত্রোপচারের আগে পরিবার-আত্মীয় স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে গত ১১ মে মাসে দেশে আসেন হুমায়ূন। দেশে ২০ দিন অবস্থানের পুরোটা সময় গাজীপুরে নিজের গড়া নুহাশ পল্লীতে কাটিয়েছিলেন তিনি।

মৃত্যু

২০১২,১৯ জুলাইক্যান্সার নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের বেলভ্যু হাসপাতালে মারা যান। তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তার মরদেহ দেশে পৌঁছাবে আগামী রোববার। শুক্রবার জুমার পর নিউ ইয়র্কের জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে তার প্রথম জানাজা হবে।লেখকের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন, ছোটভাই মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, বন্ধু মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে ড. মোমেনও মৃত্যুর সময় হাসপাতালে ছিলেন। গাজীপুরে হুমায়ূনের গড়া নুহাশ পল্লীতে তাকে দাফন করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন তার ছোট ভাই আহসান হাবিব।

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
জন্ম : ১৯৪৮, ১৩ নভেম্বর৷ নেত্রকোণা জেলার কুতুবপুর গ্রামে৷
বাবা : ফয়জুর রহমান আহমেদ৷
মা : আয়েশা ফয়েজ৷
স্ত্রী : মেহের আফরোজ শাওন৷
শিক্ষা : মাধ্যমিক, বগুড়া জিলা স্কুল, ১৯৬৫৷ উচ্চ মাধ্যমিক, ঢাকা কলেজ, ১৯৬৭৷ স্নাতক (সম্মান) রসায়ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭০৷ স্নাতকোত্তর (রসায়ন) ১৯৭২৷ পি এইচ ডি, নর্থ ডাকোটা ইউনিভার্সিটি, ১৯৮২৷
পেশা : অধ্যাপনা, রসায়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বেচ্ছায় অবসর, বর্তমানে লেখালেখি ও চলচ্চিত্র নির্মাণ৷
উল্লেখযোগ্য উপন্যাস : নন্দিত নরকে, লীলাবতী, কবি, শঙ্খনীল কারাগার, মন্দ্রসপ্তক, দূরে কোথায়, সৌরভ, নী, ফেরা, কৃষ্ণপক্ষ, সাজঘর, বাসর, গৌরিপুর জংশন, নৃপতি, অমানুষ, বহুব্রীহি, এইসব দিনরাত্রি, দারুচীনি দ্বীপ, শুভ্র, নক্ষত্রের রাত, কোথাও কেউ নেই, আগুনের পরশমনি, শ্রাবণ মেঘের দিন, বৃষ্টি ও মেঘমালা, মেঘ বলেছে যাবো যাবো, জোছনা ও জননীর গল্প প্রভৃতি৷
উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র : আগুনের পরশমনি, শ্যামল ছায়া, শ্রাবন মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, চন্দ্রকথা, নয় নম্বর বিপদ সংকেত৷
পুরস্কার : একুশে পদক (১৯৯৪), বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৮১), হুমায়ুন কাদিও স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯০), লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩), মাইকেল মধুসূধন দত্ত পুরস্কার (১৯৮৭), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩ ও ১৯৯৪), বাচসাস পুরস্কার (১৯৮৮)৷ দেশের বাইরেও হয়েছেন মূল্যায়িত৷ জাপান টেলিভিশন NHK তাঁকে নিয়ে একটি পনের মিনিটের ডকুমেন্টারি প্রচার করেছে Who is who in Asia শিরোনামে৷
—-প্রথম আলো অবলম্বনে—–