ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

বাংলাদেশের সীমান্ত শহর দিনাজপুর। অবিভক্ত বাংলার সম্পদশালী জেলা বা পরগনা গুলোর অন্যতম এই সীমান্তবর্তী জেলা। এই জেলার সদর বা জেলা হেডকোয়ারটারের নাম অনুসারেই এই জেলার নামকরণ।  আবার দিনাজপুর নামটি এসেছে এখানকার মহারাজার নামানুসারে। যা হোক, দিনাজপুর শহরের ইতিহাস বা জেলার কথা বলতে লিখছি না এই নিবন্ধে। গত ২রা জানুয়ারি ২০১৫  দিনাজপুর শহরে অবস্থিত সাংস্কৃতিক সংগঠন নবরুপীর ৫২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হলো। এই তারিখ নিয়ে কিছুটা সন্দেহ বা দ্বিমত থাকলেও বছরটা ৫২ বছর।

১৯৫৯ সালে কোলকাতার বহুরুপী সংগঠনের আদলে নবরূপী নাম দিয়ে একটি  সংগঠনের জন্ম হলেও সেটির কার্যক্রম বেশিদিন চলেনি। কিন্তু পরবর্তীতে একই নাম নিয়ে ১৯৬৩ সালে শুরু করে পথচলা এই নবরূপী। তখন এই পূর্ববাংলা ছিল। স্বৈরাচারী তথাকথিত লৌহমানব আইয়ুবের সামরিক শাসন চলছে। স্বাধীন মতামত প্রকাশের বাধ্যবাধকতা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বিধিনিষেধের শিকল, নিত্য নতুন জারি করা বিধিনিষেধ পালনে যখন পূর্ববাংলার মানুষের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, প্রতিটা ক্ষণ যখন ভয়ভীতি আর অনিশ্চয়তায় এলোমেলো সেই সময় দিনাজপুর শহরের ৫/৬ জন যুবকের ঐকান্তিক উদ্যোগে ‘৫৯ সালে গড়ে ওঠা নবরূপী আবার এক সাংগঠনিক রুপ লাভ করে। খায়রুল আলম, কাজী বোরহান, আকবর আলী ঝুনু এবং মানস কুমার নাথ মনু ছিলেন এই সংগঠন তৈরির প্রধান পুরুষ। পরবর্তীতে সর্ব জনাব শাহজাহান শাহ, মাজেদ রানা, আলতাফ চৌধুরী, জিন্না, জীবন সহ আরো অনেক ত্যাগী মানুষের প্রচেষ্টায় এই সংগঠনটি আস্তে আস্তে এই মহীরূহে পরিনত করেছে।

একটি জেলা শহরে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের ৫২ বছরের প্রৌরত্বে এসে উপনিত হওয়া সত্যি এক বিস্ময়ের জন্ম দেয়, যেখানে প্রতিদিনের জীবন-জীবিকার সংগ্রামে কঠিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়। যেখানে রাজধানী থেকে অনেক দূরে হওয়ার কারনে সবার অলক্ষ্যে থেকেই সংগঠনের কাজ চালিয়ে যেতে হয় সম্পূর্ণ নিজেদের আর্থিক সহযোগিতায়। থাকে স্থানীয় রাজনৈতিক রেষারেষি, সামাজিক বিধিনিষেধ। থাকে ছোট পরিসরের ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া।

শুধু তাই নয় দেশ বিভাগের কারনে এই দিনাজপুরে ভারতের বিহার থেকে আগত মোহাজের সম্প্রদায় ছিলো অনেকটা আগ্রাসি মনোভাবাপন্ন। এই শহরে পাকিস্তান আমলে বাঙালিদের নিজভূমে পরবাসী হিসাবেই জীবন যাপন করতে হতো। এই সব সকল সীমাবদ্ধতাকে সঙ্গে নিয়েই নবরূপী হাঁটি হাঁটি পা পা করে ৫২ বছরে এসে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

এখানে উল্লেখ না করলেই নয়, দিনাজপুর শহরে একশত বছরের আরো একটি সংগঠনের কথা। দিনাজপুর শহরে ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দিনাজপুর নাট্য সমিতি। এই সংগঠনটি আজো দিনাজপুর শহরে নাট্য আন্দোলন চালিয়ে আসছে।

নবরূপী দিনাজপুর জেলার সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সবসময় অগ্রগন্য ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের বিভিন্ন জেলা এবং জাতীয় ভাবে বেশ কয়েকবার পুরস্কার গ্রহন করেছে নাটক করে, অভিনয় করে এবং যোগ্য সংগঠন হিসাবে। দিনাজপুর জেলা বরাবরি ছিলো বাম আন্দোলনের জন্য অন্যতম পীঠস্থান। এই জেলার মানুষ সবসময়ের জন্যে ছিলো অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল রাজনীতির চিন্তা ভাবনা এবং সংস্কৃতি বিকাশের অনুকূলে। অনেক বাধা বিপত্তি থাকা সত্বেও এই জেলায় ৫৮ থেকে ৬৮ পর্যন্ত স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দিনাজপুরবাসী ছিলো সবসময়েই সোচ্চার। আর নবরূপী ছিল এই সব আন্দোলন সংগ্রামের সহযোদ্ধা।

১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে নবরূপী ছিলো রাস্তায়, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নবরূপীর প্রায় সকল সদস্য সক্রিয় মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে দেশমাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করেছে। একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসাবে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেই নবরূপী আজ ৫২ বছরের পুরানো সংগঠন হিসাবে দিনাজপুর জেলাকে তথা সারাদেশকে সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব দিয়ে আসছে অত্যন্ত গৌরবের সাথে। একটি জেলা শহরের সাংস্কৃতিক সংগঠনের এই পথচলা সারা দেশের জেলা সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে আরো প্রত্যয়ী করে তুলবে, আরো সাহসী করে তুলবে নিজেদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাবার শপথে।