ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 
gonoovyutthan

২৪শে জানুয়ারি ১৯৬৯। স্বৈরাচার আইয়ুব খানের সাধের সিংহাসন জনতার রুদ্র রোষে ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেলো। শত ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ভেঙ্গে বাঙালি তার প্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে জেলের তালা ভেঙ্গে মুক্ত করে আনলো, পতন ঘটালো প্রায় ১১ বছর ধরে জাতির কাধে চেপে বসা লৌহমানব নামে খ্যাত স্বৈরাচার আইয়ুব খানের। ১৯৬৮ সালে উন্নয়নের দশ বছর পালনের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার আইয়ুব এদেশের মানুষকে বুঝিয়েছলেন তিনি আরো দশ বছর ধরে এই দেশকে শাসন করবেন। অথচ তখনো তিনি জানতেন না বাঙ্গালীর গণঅভ্যুত্থানের রূপ কেমন। বাঙ্গালী যখন জেগে উঠে তখন তার কি রূপ হয় সেটা তার কল্পনাতেও ছিলো না।

বাঙালির প্রানের দাবি ৬দফা আর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফার ভিত্তিতে সারা দেশে আন্দোলন তখন তুঙ্গে। বাঙালির নেতা শেখ সাহেব তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তার সঙ্গীসাথী সহ জেলে। প্রহসনের বিচার চলছে, বিচার শেষে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে তাঁকে এবং তার সহযোগিদের ফাঁসীতে ঝোলানোর পরিকল্পনায় ব্যস্ত স্বৈরাচারী আইয়ুব।

এইরকম এক উত্তাল সময়ে বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ বিক্ষোভে ফেটে পড়লো। ৬২ শিক্ষা কমিশন বিরোধী  আন্দোলন, চৌষষ্টির আন্দোলনের অভিজ্ঞতা কে সঙ্গে নিয়ে ছাত্র সংঘঠন গুলো ৬ দফা এবং ১১ দফার ভিত্তিতে স্বৈরাচার উৎখাতের ডাক পাঠালো সারা দেশে। আহবান জানালো সারা দেশে যেখানে ভাবে হোক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পুরো ৬৮ সাল জুড়ে আইয়ুবের উন্নয়নের দশ বছর বিরোধী প্রচারনা, ইস্যু ভিত্তিক আন্দোলন আর শেখ সাহেবের নিঃশর্ত মুক্তির দাবীতে দুর্বার আন্দোলন গড়ে উঠেছে। জননেতা মাওলানা ভাষানীও আরা বাংলা চষে বেড়াচ্ছেন স্বৈরাচারকে উৎখাতের আন্দোলনে মানুষকে সঙ্ঘবদ্ধ করার কাজে।

এলো ১৯৬৯। বছরের শুরুটাই শুরু যেনো এক অন্যরকম দিক নির্দেশনা নিয়ে। ৪ঠা জানুয়ারি ছাত্রসমাজ এই স্বৈরাচারকে উৎখাতের লক্ষ্যে মরণপন শপথ গ্রহন করে জানান দিলো যে, স্বৈরাচারের পতন না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরবে না এই ছাত্র সমাজ।ছাত্রসমাজের সেই ইস্পাত দৃঢ় শপথ বাস্তবায়ন করেই ছাত্রসমাজ ঘরে ফিরেছিলো এবং ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহন করার তাগিদ অনুভব করেছিল।

২০শে জানুয়ারি ১৯৬৯ সালে শহীদ আসাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সারা দেশ পরিনত হয় এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গে। জনতার বাধ ভাঙ্গা প্রতিবাদ আর প্রতিরোধে আইয়ুব মোনায়েম এর সকল ষড়যন্ত্র আর কলাকৌশল ব্যর্থ হয়ে যায়। সরকার ১৪৪ ধারা জারী এবং সান্ধ্য আইন জারী করেও পরিস্থিতিকে সামাল দিতে ব্যর্থ হয়। ২৪ জানুয়ারী সকাল থেকেই পূর্ব পরিকল্পিত প্রতিবাদ সমাবেশ ও মিছিলের কর্মসূচীতে ঢাকা শহরের বিভিন্ন পাড়া মহল্লা থেকে ১৪৪ ধারা ও সান্ধ্য আইন ভেঙ্গে মিছিল নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে।

মিছিলের শহরে পরিনত হয় ঢাকা শহর। সদর ঘাটের ঘাট শ্রমিক, তেজগাঁওয়ের ও টঙ্গীর কল কারখানা থেকে খেটে খাওয়া শ্রমিক, দিনমুজুর, ভিখারী, ছিন্নমুল নারী পুরুষ, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, বেশ্যা কে ছিল না সেই প্রতিবাদী মিছিলে। বাড়ির কাজ করা চাকর বাড়ির গিন্নী কেউ বাদ যাননি সেদিনের সেই মিছিলে। পুলিশ ইপিয়ার আর সেনাবাহিনীর সকল বাধা নিষেধকে পায়ে মাড়িয়ে মিছিল এগিয়ে যায় শুধুই এগিয়ে যাওয়া। এমনি এক মিছিলে পুলিশ লাঠিচার্জ, কাদুনে গ্যাস ছুড়ে ছত্রভং করার চেষ্টা চালালে জনগন হয়ে উঠে আরো আপ্রতিরোধ্য। পুলিশ সরাসরি গুলি চালায় ছাত্র জনতার এই বাধ ভাঙ্গা মিছিলে। শহীদ হোন নব কুমার ইনিস্টিটিউটের নবম শ্রেনীর ছাত্র মতিউর রহমান। দিকে ছড়িয়ে পরে মতিউরের শহীদ হওয়ার কথা। আগুন গ্বলে উঠে দিগুন। ঢাকা শহরের নিয়ন্ত্রন তখন পুরোপুরি ছাত্র নেতৃবৃন্দের হাতে। জনতার ঢেউ তখন জেলখানার দিকে। জেলখানার তালা ভেঙ্গে তাদের নেতা, বাংলার নেতা শেখ মুজিব কে মুক্ত করে আনবে এই ছিলো দীপ্ত শপথ। একপর্যায়ে লৌহমানব আইয়ুব পদত্যাগের ঘোষনা দেন,  শেখ সাহেব কে নিঃশর্ত মুক্তির কথা ঘোষনা করেন।

এভাবেই সেদিনের জনতার রুদ্র রোষে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষেপিত হয় স্বৈরাচারী আইয়ুব এবং তার সকল দোসর। বাংলার মানুষ ৫২ এর পরে আরো এক ধাপ এগিয়ে যায় তার স্বাধীনতার লাল সুয্যটাকে ছিনিয়ে আনার লক্ষ্যে।

আজ যখন বিএনপি জামাত জোট তাদের গনতন্ত্র উদ্ধারের নামে আন্দোলন করছে তখন তাদের মনে করিয়ে দেওয়ার বড়োই প্রয়োজন যে, জনগণের অংশগ্রহন ছাড়া কোন আন্দোলনই তার যৌক্তিক লক্ষ্যে পৌছতে পারেনা।

বিএনপি নেত্রী জনগণকে রাস্তায় নেমে আসতে বলেছেন বহুবার কিন্তু জনগন সেই আহবানে সাড়া দেয়নি। এই সাড়া না দেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন সরকারের পেটোয়া বাহিনী এবং পুলিশ বিজিবির গুলির ভয়ে জনগন রাস্তায় নামছে না। জনগন পুলিশ বা বিজিবি বা সেনা বা কোন পেটোয়া বাহিনীর ভয়ে আন্দোলন থেকে পিছপা হয়না। জনগন শধু দেখতে চায় এই আন্দোলন তার জন্যে কিনা। এই আন্দোলন নতুন কোন সম্ভাবন নিয়ে আসবে কিনা। যদি তা না দেখে তবে জনগন কখনোই রাস্তায় নেমে আসবে না।