ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

hill tracks

 

মানুষের কাছে পাহাড় সবসময়ের জন্যেই বিস্ময়। পাহাড়কে ভালোলাগা আর অজানাকে জানার মতোই আকর্ষণীয় ।পাহাড় মানুষকে সবসময় ডাক দিয়ে যায় মানুষ কে। হিমালয়, কে-টু, আন্দিজ সহ বিভিন্ন দুর্গম পর্বত মালাও মানুষকে ডাক দিয়েছে সেই মানব সৃষ্টির প্রথম থেকেই। যত কষ্টকর আর দুর্গমই হোক না সেই  পর্বতমালা।

বাংলাদেশেও পাহাড় আছে। সিলেট, ময়মনসিংহ চট্টগ্রাম আর পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দয্য বাড়িয়েছে, বাড়িয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদ, বাড়িয়েছে জীববৈচিত্র্য আর পর্যটন খাতকে করেছে সম্ভাবনাময়। আমাদের দেশের এক উল্লেখসংখ্যক আদিবাসি এই পাহাড়ী অঞ্চল গুলোতে বসবাস করে আসছে প্রায় হাজার হাজার বছর ধরে নিজেদের আদি সাংস্কৃতিক ধারাকে বজায় রেখে। এইদেশ যখন সেন, পাঠান,  মোঘলদের দ্বারা শাসন হয়েছে তখনো এই পাহাড়গুলোর জীবন ধারায় কোন পরিবর্তনের ছোঁয়া এসে তাদের জীবনকে নাড়া দেয়নি। একই সংস্কৃতি কে ধারন করে একই জীবনাচার পালন করে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করে এসেছে এইসব আদিবাসী সম্প্রদায়।

প্রচন্ড কস্ট সহিষ্ণু আর সরজ সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত এইসব অঞ্চলের মানুষ। সেইসাথে ছিলো অতিথিপরায়নতা। নিজের খাওয়া জুটুক বা নাই জুটুক অতিথি আপ্যায়নে কখনোই তারা কার্পণ্য করেনি তাদের সমাজে।

সেই পাহাড়ে আজ অশান্তির আগুন জ্বলছে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে। আদিবাসী সমাজ নিয়ে শুধু যে বাংলাদেশে অশান্তির আগুন জ্বলছে তাই না। সারা পৃথিবী জুড়েই শুরু হয়েছে এই আদিবাসীদের অস্তিত্ব সংকট। প্রতিটি দেশে যেখানেই আদিবাসী আছে সেখানেই মুল জাতিগোষ্ঠীর সাথে বিরোধ লাগছে। মুল জাতি গোষ্ঠি তাদের জাত্যাভিমান থেকেই আদিবাসীদের অস্তিত্বকে করে তুলেছে সংকটাপন্ন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে সমস্যাটা আরো ব্যপক এবং আরো ভয়াবহ। ১৯৪৭ সালের পাক-ভারত বিভক্তির পর হতে এই পার্বত্য অঞ্চলগুলো তে আদিবাসীদের অস্তিত্ব নিয়েই সংকট দেখা দিয়েছে। “১৯১৮সালে যখন পার্বত্যচট্টগ্রামের জনসংখ্যা  মাত্র দুই লাখ, তখনও ব্রিটিশ সরকার পার্বত্যাঞ্চলে ভূমির দুষ্প্রাপ্যতার বিষয়টি মাথায় রেখে এই অঞ্চলে বহিরাগতের প্রবেশে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল।বর্তমানে অর্থাৎ ২০১১ সালের আদমসুমারী অনুযায়ী পার্বত্য তিন জেলার জনসংখ্যা হচ্ছে ১৬ লাখ ১৩ হাজার ৯৮৯ জন।এরমধ্যে আদিবাসীর সংখ্যা ৮ লাখ ৫২ হাজার ৫৪০ এবং বাঙালির সংখ্যা ৭  লাখ ৬১ হাজার ৪৪৯ জন। রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে আদিবাসীর সংখ্যা বাঙালির তুলনায় বেশি হলেও বান্দরবানে বাঙালির সংখ্যা দেড়গুণের বেশি । কিন্তু ১৯৪৭-পরবর্তী সরকারগুলো স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও তাদের সমস্যার প্রতি সংবেদনশীলতা দেখায় নি।

১৯৫৪ সালে প্রথম রাষ্ট্রীয়ভাবে বান্দরবানের লামায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাঙালি পরিবার এনে বসতি করানো হয়।পরে আবার ১৯৬০ সালে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে উর্বর ৫৪ হাজার একর জমি, যা পার্বত্যাঞ্চলে  মোট চাষযোগ্য  জমির ৪০ শতাংশ, পানির নিচে তলিয়ে যায়।বাস্তুহারা হয় এক লাখের বেশি মানুষ।সবচেয়ে চরম ও অপরিণামদর্শী পদক্ষেপ গৃহীত হয় ১৯৭৯ সালে।“ (সুত্রঃ দৈনিক সমকাল।)

১৯৭১ সাল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু সরকার তার এক রাজনৈতিক ভাষনে বাংলাদেশের সকল ভাষা, জাতি, উপজাত্‌, আদিবাসী সকলকেই বাঙালি হয়ে যাবার আহবান জানিয়েছিলেন কিন্তু পাহাড়ে নতুন করে বাঙ্গালী পুনর্বাসনের কোন সরকারী পদক্ষেপের কথা বলেন নাই বা কোন পদক্ষেপ নাওয়া হয় নাই। ৭৫ সালের মর্মান্তিক শোকাবহ অধ্যায়ের পর সামিরিক সরকার ক্ষমতায় আসার অব্যহিত পরেই অর্থাৎ ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের সরকার গোপনে গোপনে পাহাড়ে বাঙ্গালীদের পুনর্বাসনের কাজ শুরু করে। সেইসময় একই বছরে প্রায় ৪ লাখ বাঙ্গালীকে পাহাড়ের উন্নয়নের নামে পাহাড়ে পুনর্বাসিত করা হয়। শুরু হয় পাহাড়ে এক অশান্তির অধ্যায়। আইয়ুব খানের আমলে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সময় প্রায় ১লাখ উপজাতির উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়া সমস্যার সমাধান না করেই বাঙ্গালী দের নতুন করে পুনর্বাসন পাহাড়ীদের মনে অশান্তির ঝড় বয়ে আনে। শুরু হয় এক রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধ। পাহাড়ের শান্ত জীবন হয়ে উঠে যুদ্ধের দামামায় বিভীষিকাময়। প্রতিদিন এই যুদ্ধে মারা যেতে থাকে উভয়পক্ষের শতশত মানুষ। যে পাহাড় হয়ে উঠতে পারতো আমাদের পর্যটন শিল্পের আধার সেই পাহাড়ই হয়ে উঠলো মৃত্যু কূপ। (চলবে।)