ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

এখানে প্রথমেই প্রথম পর্বের একটি ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। শান্তি চুক্তি আমি লিখেছিলাম ১৯৯৮ সাল কিন্তু সেটা হবে ১৯৯৭ সাল। ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি ছিলো বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মাইলফলক। ভারত পাকিস্তান অস্ট্রেলিয়া সহ বিভিন্ন দেশের আদিবাসি এবং মুল জাতিগোষ্টির যে দ্বন্ধ যে অশান্তি চলছিল সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে একমাত্র বাংলাদেশেই নিজেদের এই বিরোধকে এক যৌক্তিক চুক্তির মাধ্যমে মিমাংসিত হয়েছিলো। অথচ আজো পশ্চিমবাংলার দার্জিলিং গুর্খাল্যান্ড প্রতিষ্ঠার আন্দোলন আব্যহত আছে। পাকিস্তানের বেলুচ, ওয়াজিরিস্তান, পাখতুন সহ বিভিন্ন পার্বত্য অঞ্চলের জাতিগত যুদ্ধ বন্ধ হয়নি আজো। বরঞ্চ এই জাতীগত দ্বন্ধ সারাদেশে জঙ্গী বিস্তার ঘটিয়েছে।

আমার এই লেখা পড়ে একজন মন্তব্য করেছেন আমি বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর ভুমিকাকে ইচ্ছেয় হোক বা অনিচ্ছায় হোক খাটো করে দেখাতে চেয়েছি বা শান্তিবাহিনীর সেদিনের সেইসব ভুমিকাকে চেপে যাবার চেষ্টা  চালিয়েছি। আদোতে কোনটাই আমার লক্ষ্য নয়। শান্তিবাহিনীর সেইসময়ের কার্যক্রমের কিছুটা স্বাক্ষী আমাদের পরিবার টের পেয়েছিলো। অন্যদিকে ১৯৯১ এর পরে কর্নেল অলি সাহেবের নেতৃত্বে একটি সংসদীয় দল পাহাড়ে শান্তি আনয়নের জন্যে কাজ করেছিলেন কিন্তু তা ফলপ্রসূ হয় নি একথা সবার জানা। এবং প্রসঙ্গে আগেই বলেছি বাংলাদেশের পাহাড়ের সমস্যা আপাত দৃষ্টিতে শুধুমাত্র বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ সমস্যাই ছিলো না পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর স্বার্থও জড়িত ছিলো। সেই হিসাবে আমার লেখার মন্তব্যকারীকে স্মরন করিয়ে দিতে চাই যে, কোন সমস্যা সমাধানে কেউ আগ্রহী হলে তাকে দেশের এবং বিদেশের সকল দিক নিয়েই এগোতে হয়।

যাহোক আমার লেখায় মন্তব্য করায় আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি এবং সমালোচনাকে পাথেয় হিসেবে গ্রহন করছি।

এখন মুল লেখায় আবার ফিরে আসি। সরকার দলের হিসাবে শান্তিচুক্তির মোট ৭২ টি ধারার মধ্যে ৪৮ টি ধারা বাস্তবায়ন করা হয়েছে, ১৫ টি ধারার আংশিক কাজ হয়েছে এবং ৯টি ধারার বাস্তবায়ন পক্রিয়াধীন আছে। অন্যদিকে জনসংহতি সমিতির হিসাব মতে ৭২ টি ধারার মধ্যে মাত্র ২৫ টি বাস্তবায়ন হয়েছে, আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে ১৩ টি এবং অবাস্তবায়িত রয়েছে  ৩৫ টি ধারা। সেক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন করার যে ধারাগুলো ছিলো তার মধ্যে বেশ কিছু বাস্তবায়ন হয়েছে দুপক্ষের হিসাব মতে। মাঝখানে ২০০১ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত বিএনপি জামাত জোট ক্ষমতায় থাকায় এই চুক্তি বাস্তবায়নে কোন কাজই হয় নাই। এবং না হওয়াটাই বাস্তবযোগ্য। কারণ বিএনপি জামাত জোট শান্তি চুক্তি কে গ্রহন করে নাই। তবে এই চুক্তি বাতিলও করে নাই। ২০০৭ থেকে ২০০৮ জানুয়ারী পর্যন্ত চিলো উদ্দিনদের শাসনামল। সেই জগাখিচুড়ি মার্কা সরকারের দ্বারা কোন কিছু ভালো কাজের আশা করা বোকার স্বর্গে বাস করার নামান্তর।  এরপরে শেখ হাসিনা এবং মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসেন। এবং সাধারন মানুষ এবার আশা করেছিলো উনাদের আগের আমলে করা ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি এবার পরিপূর্ণতা পাবে। পাহাড়ের মানুষ আবার শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। কিন্তু তা যে আসলে হয় নাই তার প্রমান এই কয়বছরে বেশ কয়েকবার পাহাড়ে আগুন জ্বলেছে। পুড়েছে নিরীহ মানুষজনদের সহায় সম্বল। আর এই সম্বল হারা মানুষগুলি প্রায় সবাই পাহাড়ী।

পার্বত্য জেলাগুলোর পথে পথে ঘুরে দেখা যাবে পাহাড়ের গায়ে লাগানো অসংখ্যসাইনবোর্ডগুলোতে চোখ আটকে যায়। এসব সাইনবোর্ডে জমির মালিক হিসেবে যাদের নাম লেখা আছে, তাদের প্রায় সবাই বাঙালি।

এই পর্যটন এলাকায় সরকারি-বেসরকারি অনেক কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে জমি কিনে ফেলে রাখছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার স্ত্রী-সন্তানসহ স্বজনদের নামেও জমি কিনেছেন। এই সাইনবোর্ডগুলো তাদেরই লাগানো। সরকারি কর্মকর্তারা শুধু জায়গা-জমি কিনেই ক্ষ্যান্ত হননি। প্রায়ই স্থানীয়দের সঙ্গে জায়গা-জমি নিয়ে বিরোধেও জড়িয়ে পড়ছেন। একজন ভিক্ষু জানালেন, তিনি নিজেও এমন একটি ঘটনার শিকার।বৌদ্ধবিহারের অদূরে ভিক্ষু গথিতার নিজেরও এক টুকরো জমি রয়েছে। তার জমির পাশে হোসনে জাহান নামে এক মহিলার নামে তার স্বামী জনৈক আশরাফ ২০ শতক জায়গা কিনেছেন।[সুত্রঃদৈনিকসমকাল]

এখানে উল্লেখ্য যে পার্বত্য রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি এই তিন জেলারই ১৯৮৯ সালের আইনের ৬৪ ধারার (ক)-তে উল্লেখ আছে পার্বত্য জেলার এলাকাধীন বন্দোবস্তযোগ্য খাসজমিসহ যে কোনো জায়গা-জমি, পরিষদের পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে ইজারা প্রদান, বন্দোবস্ত, ক্রয়, বিক্রয় বা অন্যবিধভাবে হস্তান্তর করা যাবে না। একই ধারার (খ)তে উল্লেখ আছে পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ও আওতাধীন কোনো প্রকারের জমি, পাহাড় ও বনাঞ্চল পরিষদের সহিত আলোচনা ও উহার সম্মতি ব্যতিরেকে সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ ও হস্তান্তর করা যাবে না।[সুত্রঃ দৈনিক সমকাল]

সরকারের এই আইন শান্তি চুক্তি সম্পাদনের প্রায় অনেক আগের, অথচ এই জেলায় পোস্টিং পাওয়া প্রায় সকল সরকারী বেসরকারী কর্মকর্তা কর্মচারী এইসব এলাকায় পোস্টিঙের সুযোগে নিজেদের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে অবিশ্বাস্য সস্তায় প্রচুর জমিজমা কিনেছেন এবং আইনের প্রতি বৃদ্ধা আঙ্গুল প্রদর্শন করে পাহাড়ী ভুমির মালিক হয়েছেন। শুধু মালিকই হোন নাই এনারা তাদের জমির উপড় সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে নিজেদের ক্ষমতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। সবচেয়ে দুঃখজনক হলেও সত্য এইসব নামে বেনামে কেনা জমি কেনা হয়েছে সব পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে। তাদের কে আইনের ভয়, সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীর ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অনেক কম মুল্যে জমিগুলোর মালিকানা তারা হয়েছেন। নিজের নামে, বৌ এর নামে, ছেলে মেয়ে বার শালা শালির নামে পার‍্য প্রত্যেকেই পাহাড়ীদের ভুমিগুলো আইনের তোয়াক্কা না করে নিজেদের আয়ত্তে এনেছেন।

পাহাড়ের শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে সরকারকে অবশ্যই এইসব সাইনবোর্ড ধারী জমির মালিকদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাহাড়ের মানুষের জীবন জীবিকা অনেকটাই নিরভর করে জুমচাষ করে। সেই জুমচাষের চাহযোগ্য জমি যদি এইভাবে হাত ছাড়া হতে থাকে তবে এইসব হতভাগ্য পাহাড়ি দের না খেয়ে থাকতে হবে। অথবা আমাদের সমতল ভুমি থেকে খাদ্য সরবরাহ করে বাচিয়ে রাখতে হবে এই পাহাড় কে যা কিনা একদিকে কষ্টসাধ্য এবং ব্যয় বহুলও বটে। এবং অবশ্যই কেউ এই পরিস্তিতি চায় না। সেক্ষেত্রে আবার বাংলাদেশের একটা অঞ্চল হয়ে উঠবে সশস্ত্র। দেশী বিদেশী নানাধরনের চক্রান্তের মুল ঘাটি হয়ে উঠবে আমার প্রিয় স্বদেশ।