ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

দেশের প্রতিটি বিপদে আপদে যাদের আমরা সবসময় প্রতিবাদী হয়ে উঠতে দেখি তারা হলেন জাতীয় তেল, গ্যাস বন্দর রক্ষা কমিটি। সুন্দরবনে ট্রাঙ্কার এক্সিডেন্ট করে তেল নিঃসরন হয়ে আমাদের জাতীয় সম্পদের ক্ষতি হওয়ার আশংকা হলো তারা ছুটে গেলেন। সুন্দরবনের পাশে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র তৈরির প্রকল্প পাশ হলো উনারা ছুটে গেলেন পরিবেশ বাদিদের কাছে, এই প্রকল্পের জন্যে সুন্দরবনের কি কি ক্ষতি হতে পারে তার আশংকা নিয়ে। এর প্রতিবাদে সুন্দরবন অভিমুখে পদযাত্রা, মানব বন্ধন, মিছিল আর স্মারক লিপি পেশ করে সরকারের টনক নড়ানোর ব্যবস্থা করলেন। ফুলবাড়ির কয়লা খনির কয়লা কি পদ্ধতিতে উত্তোলন হবে সে নিয়ে সারা দেশ ব্যাপি জনমত তৈরি, পদযাত্রা আর মিছিল মিটিং করে জীবন পর্যন্ত দিয়ে দিলো এই তেল রক্ষা কমিটির নেতা কর্মীরা।

জাতীয় তেল, গ্যাস বন্দর রক্ষা কমিটির এইসব আন্দোলনে সাধারন মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহন না থাকলেও নিরব সমর্থন পেয়েছে সবসময়ে। মংলা বন্দর রক্ষার পদযাত্রায় একবার আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিলো একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে। সেইসময়ের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি গ্রাম গঞ্জের সাধারন মানুষ এই জাতীয় কমিটির বিভিন্ন কর্মসূচী তে তাদের সমর্থন দিয়েছে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের দাবীগুলোকে যৌক্তিক দাবী বলেই মনে করে আসছেন সবসময়।

ঢাকা শহরে কোথাও কোন গাছ কাটা হলেও পরিবেশবাদীদের একটি দল আছেন তারা সেই গাছ কাটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠেন। কোন খেলার মাঠ দখল হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে সেই মাঠের সামনে যেয়ে মানব বন্ধন করতে দেখা গেছে এইসব পরিবেশ সচেতন বিদগ্ধজনদের। আমরা আশাবাদী হয়ে উঠি উনাদের এইসব কাজকর্ম দেখে। আমরা সাহসি হয়ে উঠি যে আমাদের সমাজে এখনো কিছু মানুষ আছেন যারা তাদের বিবেকবোধকে বিক্রি করে দেন নি।

তাই যখনই কোন বিপদ এসে আমাদের দেশের মানুষকে নাস্তানাবুদ করে তোলে তখন প্রথমেই উনাদের কথা স্মরন করি। আমরা ভরসা করে থাকি যেসব গুনীজন আমাদের জাতীয় সমপদ রক্ষার জন্যে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করছেন, যারা সামান্য বেআইনি গাছ কাটা পছন্দ করেন না, তাদের উপর নির্ভর করে বিপদের সময়টা পার করা যাবে।

এবার এবং গত নির্বাচনের আগে যখন একদল মানুষ আমাদের দেশের সাধারন মানুষ কে পুড়িয়ে মেরে তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্যে পৌছাতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন তখন এইসব গুণীজনদের কে সাধারন মানুষের পাশে দাড়াতে দেখতে চেয়েছিলাম। যখন সারা দেশে একটি বিশেষ রাজনীতির কর্মীরা নির্বিচারে বাসে, ট্রেনে, ট্রাকে আর সিএনজিতে আগুন বোমা ছুড়ে মানুষ হত্যার পৈচাশিক উল্লাসে মেতে উঠলো, তখন নির্বিচারে মানুষ হত্যার বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদী হয়ে উঠবেন  এই আশা সকল শ্রেণী পেশার মানুষ করেছিলো। জনগন মনে করেছিলো যিনি এই হত্যা উৎসব চালিয়ে যাওয়ার হুকুম দিয়েছেন তাঁর কার্যালয় বা বাসা অভিমুখে একটা পদযাত্রা এইসব শান্তিবাদী মানুষগুলো শুরু করবেন। আর সাধারন মানুষ তাদের এই পদযাত্রায় অংশ নিয়ে হানাহানির রাজনীতির একটা অবসান ঘটাতে পারবেন।

গত নির্বাচনের আগে যে সহিংসতা চলেছিলো তার প্রতিবাদে এইসব গুনীজনদের কারো কোন পদক্ষেপ আমাদের চোখে পরে নি। আর এবার যখন আবারো গত বত্রিশ দিন ধরে সাধারন মানুষকে পুড়িয়ে মারার নারকীয় উল্লাস চলছে তখনো আমাদের এই পরিবেশবাদী, জাতীয় সম্পদ রক্ষাকারী দলের নেতা কর্মীদের কোন কার্যকর পদক্ষেপ চোখে দেখছে না সাধারন মানুষ।

সাধারন মানুষ তাহলে কি ধরে নিতে পারে এইসব পরিবেশবাদি কর্মীদের, জাতীয় সম্পদ রক্ষাকারীদের প্রতিবাদের লক্ষ্য শুধুই জড়বস্তুর উপর, মানুষের মৃত্যু তাদের কাছে কোন ব্যাপারই নয় । অথবা তারা স্বজ্ঞানে এইসব আগুনে পুড়িয়ে মানুষ মারার কর্মসূচীকে সমর্থন দিচ্ছেন।

আমাদের দেশের সকল আন্দোলনে বাম সংঘঠন গুলোর অংশগ্রহন ছিলো নির্দ্বিধায় প্রশংসনীয়। এদেশের কৃষক আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের স্বাধীনতা যদ্ধ এবং স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে এইসব বাম সংঘঠনের অংশগ্রহন ছিলো অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির চেয়ে অনেকবেশী আপোষহীন, অনেকবেশী ত্যাগতিতীক্ষার।

আমাদের দেশে যখন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিলো তখনো কিন্তু প্রথম প্রতিবাদ এসেছিলো বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির নেতৃত্বে। অথচ আজ যখন বাংলাদেশের মানুষ স্বাধিনতা বিরোধীদের আগুনে বোমার আঘাতে সাধারন মানুষকে পুড়ে মরতে হচ্ছে তখন উনাদের সংঘঠিত কোন প্রতিবাদ মানুষ দেখছে না। বাংলাদেশের বাম রাজনৈতিক দলগুলো যদি মএ করে থাকে এই ক্ষমতায় যাওয়া আসার এই আন্দোলনে তাদের কিছুই আসে যায়, তাহলে ভুল করবেই বলে মনে হয়। আফগানিস্তানের মতো এদেশের কমিউনিস্ট পার্টি গুলোরও ভাগ্য বরন করতে হবে যদি একবার এই শক্তি আবার ক্ষমতায় আসতে পারে। ক্ষমতায় এসে কিন্তু তারা ভুলে যাবে আপনাদের এই চুপ করে থেকে তাদের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করার কথা।