ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

যেদিন থেকে ব্যক্তি সম্পত্তির উৎপত্তি হয়েছে সেদিন থেকেই সাম্রাজ্যবাদ ধারনার শুরু। আবার সেই সময় থেকেই সাম্রাজ্যবাদ থেমে নেই। সম্পদ আরোহন, কুক্ষিগত করা আর সারা পৃথিবী জুড়ে তার থাবা বিস্তারের কাজ করেই চলেছে। আদি সাম্যবাদি সমাজের পর যেদিন থেকে সামন্ততান্ত্রিক সমাজের শুরু সেদিন থেকেই অন্যের সম্পত্তি দখল, অন্যের ব্যবসা কে নিজের করে নেওয়া, অন্যের রাজ্য দখল করার মধ্য দিয়েই   সাম্রাজ্যবাদি চিন্তা চেতনার হাটি হাটি পা চলা। সভ্যতার ক্রমবিকাশে শিল্পবিপ্লব ও আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যানে মানুষ যত এগিয়েছে, মানুষের লোভ লালসা ঠিক ততটাই বেড়ে গিয়েছে ক্রমান্বয়ে। পুজির বিকাশে যখন রাষ্ট্রীয় পুঁজি ধীরে ধীরে নিজেদের স্বার্থে বহুজাতিক পুঁজিতে রুপান্তর হতে শুরু করে মুলত তখন থেকেই এই সাম্রাজ্যবাদী পুজি তার ক্ষমতার পরিধি বাড়িয়েই চলেছে অপ্রতিরোধ্যভাবে।

সাম্রাজ্যবাদ কখনো থেমে থাকে না। কারণ থেমে থাকার অবকাশ পায় না। সাম্রাজ্যবাদ যেহেতু পুঁজির সর্বশেষ বিকাশ। আর সেকারণেই পুজিমালিকরা পুঁজি রক্ষার স্বার্থে রাষ্ট্রীয় শক্তিকে আয়ত্বে এনে পুঁজির নিরাপত্তা বিধান করে। পুঁজির নিরাপত্তায় কখনো কখনো এই সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ ছড়িয়েছে, কখনো ব্যবহার করেছে ধর্মকে, কখনো সমাজের কুসংস্কারকে কাজে লাগিয়েছে এবং নিজের স্বার্থ রক্ষায় কোটি কোটি মানুষের মৃত্যুকেও পরোয়া করে নাই। ইথোপিয়ার, সুদান এবং ৭৪ এর বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ এ লাখো মানুষের মৃত্যু সাম্রাজ্যবাদেরই নীল নকসার ফসল। সাধারন সামরিক অভ্যুত্থান বা সরকার উৎখাত তো সাম্রাজ্যবাদের কাছে একেবারে নস্যি।

তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বিজ্ঞানের কল্যানে এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে পৃথিবীর মানুষ অনেক এগিয়েছে  ঠিকই কিন্তু সেইসাথে সচেতনও হয়েছে আরো অনেক বেশী। এই সচেতনতাই সাধারন মানুষকে সাম্রাজ্যবাদের শোষণের বিভিন্ন পন্থা সম্পর্কে আরো বেশী হুশিয়ারী  হতে শিখিয়েছে। তাই যখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শাসন ক্ষমতায় তৃণমূল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আসীন হয় তখন বিস্মিত হয় না। গুজরাট দাঙ্গায় শতশত মানুষের খুনের জন্যে দায়ী নরেন্দ্র মোদীর ভারতের কেন্দ্র দখল শুধুমাত্র আভ্যন্তরীন পালাবদল নয়।

আমাদের বাংলাদেশেও সাম্রাজ্যবাদ তাদের পুজির নিরাপত্তায় ক্ষমতার পালাবদলে বার বার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে আজ পর্যন্ত বহুধরনের সমিকরন ঘটিয়েছে এই সাম্রাজ্যবাদ। এক এগারোর ক্ষমতা দখল, মাইনাস টু ফর্মুলা, ইদানীংকালের সুশীল সমাজের নামে গনতান্ত্রিক সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ এসবই বহুজাতিক পুঁজির নিজের নিরাপত্তার জন্যে একেকটা কৌশল।

তবে একথা সত্য নব্বই দশকে সোভিয়েত পতনের পর সাম্রাজ্যবাদ যে এক বিশ্ব তত্ত্ব নিয়ে সারা পৃথিবীকে একাই নিয়ন্ত্রন করতে চেয়েছিলো সেই নিয়ন্ত্রনের লাটাই আজ প্রায় হাতছাড়া হবার যোগাড়। এক দিকে পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা, পুজির সরবোচ্চ বিকাশ এর পথ রুদ্ধ হওয়ায় এবং নতুন নতুন পুঁজির কেন্দ্র সৃষ্টি হওয়ায় এককেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থা আজ অকার্যকর হওয়ার পথে। আর তাই ইঙ্গ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মোড়লী গিরি আজ হুমকীর মুখে।

অবশ্য এখন সাম্রাজ্যবাদ তাদের মোড়লীপনা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে তৈরী করছে লাদেন, আই এস, ইরানের পারমানবিক এবং উত্তর কোরিয়ার পারমানবিক শক্তির বিকাশ ইস্যু। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে লাগিয়ে রাখছে দীর্ঘ রক্তাক্ত যুদ্ধ। লাদেন যেমন মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের তৈরী ঠিক তেমনিভাবেই মনে হয় নিজেদের যুদ্ধটাকে টিকিয়ে রাখার জন্যে, নিজেদের যুদ্ধাস্ত্র বিক্রির বাজারকে চাঙ্গা রাখার স্বার্থেই আই এস এর মতো এক ফ্রাঙ্কেন্সটাইন তৈরী করে বাজারে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের বিভিন্ন ধর্মের মানূষদের গলা কেটে হত্যা করার মধ্য দিয়ে এদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরী করে এবং বিশ্বকে এক ভয়ংকর পরিস্থিতির ভয় দেখিয়ে তাদের নেতৃত্বকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।

অন্যদিকে আমাদের মতো অল্প শিক্ষিত দেশগুলোর মানুষেরা ধর্ম ভীরু হওয়ার জন্যে বিভ্রান্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে জেহাদী প্রেরনা তৈরী করছে। হাযার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি উপেক্ষা করে লাদেন বা আই এসের মতো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সংঘঠনের পতাকা তলে একীভুত হওয়ার চেষ্টা করছে। ধর্মীয় উম্মাদনায় নিজের ধর্মের মানুষের উপর বোমা মেরে, গ্রেনেড ফাটিয়ে করছে মানুষ খুন ।

সাম্রাজ্যবাদের কোন ধর্ম নেই, নীতি নেই, দেশ প্রেম নেই। সাম্রাজ্যবাদ যার বন্ধু হয় তার শত্রুর প্রয়োজন হয় না। গঙ্গার দুষন রোধে নরেন্দ্রো মোদীর বিক্রি হওয়া কোর্টের নিলাম কৃত অর্থ ব্যয় করা হবে এটা যেমন একটা সাম্রাজ্যবাদি স্টান আবার একটি কোর্টের দাম আকাশ্ চুম্বী করা সেই স্টানবাজীরই আরেকটি অংশ। মানবাধিকার নিয়ে কথা বলা, জনসেবার পরকাষ্ঠা দেখানো সবই সাম্রাজ্যবাদের নতুন কোন ষড়যন্ত্রেরই নতুন রূপ মাত্র।

তাই যখন গনতন্ত্র উদ্ধারের নামে পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ মারা হচ্ছে তখন এই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি থাকে চুপচাপ এবং এই বোমাবাজদের ধরে ঘটনাচক্রে দুয়েক জন কে ক্রশফায়ারের নামে মেরে ফেলা হচ্ছে তখন মানবাধিকার গেলো বলে চিতকারে গলা ফাটিয়ে ফেলছে। ক্রশফায়ারে মানুষ হত্যা কখনোই সমরথনযোগ্য হতে পারে না। কিন্তু তাই বলে পেট্রোল বোমায় মানুষ মারা হবে সেতাও সহ্য করা যায় না। সাম্রাজ্যবাদ এমনই।

নিজের স্বার্থ অক্ষুন্ন রাখতে যেকোন কাজ, যেকোন পক্ষ নিতে সাম্রাজ্যবাদ দ্বিধা করে না।