ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

 
IWD-Poster-2013-Artwork-ed

 

৮ই মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নারীকে মানুষ হিসাবে গন্য করে তোলার যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিলো আজ থেকে শতবর্ষ আগে সেই সংগ্রামের পথ ধরে সারা বিশ্বে পালিত হয়ে আসছে এই নারী দিবস। ১০১ বছর আগে পৃথিবীর আটটি দেশে প্রথম নারী দিবস পালিত হলেও নারী অধিকার নিয়ে নারীরা রাস্তায় নামেন ১৮৫৭ সালে সেই মার্কিন মুলুকে। ভারত বর্ষে যখন ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে ভারতের দেশী সেপাই রা বিদ্রোহ করছে ঠিক সেই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নারী সেলাই শ্রমিকরা রাস্তায় নেমেছ তাদের ন্যায্য পাওনা, ন্যায্য সন্মানের জন্যে। সেই শুরু তারপরের ইতিহাস শুধুই সামনে এগিয়ে চলার। পথটা মসৃণ ছিলো না কখনোই। জেল জুলুম, কুৎ্সা নির্যাতনকে সাথী করে বিশ্বের নারীদের এগিয়ে যেতে হয়েছে নিজেদের ন্যায্য সন্মানটুকু ছিনিয়ে নেওয়ার জন্যে। অনেক রটনা, রচনা, ব্যঙ্গ বিদ্রুপকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় শতাধিক বছরের বন্ধুর পথ বেয়ে আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস সারা বিশ্বের কাছে এক স্মরনীয় দিন হিসাবে পালিত হচ্ছে। কিন্তু তারপরেও কথা থেকে যায়, যে সন্মানের জন্যে নারী সমাজের আন্দোলন আর আত্মত্যাগ সেই কাংক্ষিত সন্মান কি পাচ্ছে নারী সমাজ!

রিপোর্ট অনুযায়ী, এখনো বর্তমান বিশ্বে পুরুষের চেয়ে নারী ১৬ ভাগ কম পারিশ্রমিক পান। অথচ অপর এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীতে নারীরা কাজ করছে শতকরা ৬৫ ভাগ।পৃথিবীতে নারী-পুরুষের সংখ্যানুপাত প্রায় সমান। অথচ, দুনিয়ার মোট সম্পদের একশ` ভাগের মাত্র এক অংশের মালিক মেয়েরা। মেয়েদের গৃহস্থালী কাজের আর্থিক স্বীকৃতি এখনও দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ, তা অর্থনৈতিক মূল্যে অদৃশ্যই থাকে। অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা তো বটেই এমনকী উন্নত বিশ্বের চিত্রটাও অনেকটা একই।

বছর ও মাস তারিখ অনুযায়ী নারী দিবসের ইতিহাস অনেকটাই এমনঃ-

সমাজে নারিদের যথাযোগ্য মর্যাদা এবং সমান সুযোগ সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে প্রথম ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে সেলাই কারখানার নারী শ্রমিকরা রাস্তায় নামেন।
১৮৬০ সালের ৮ মার্চ নারী শ্রমিকরা সংঘবদ্ধ হয়ে তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে নিজস্ব ইউনিয়ন গঠনে ব্যর্থ হয়।
১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনের নেত্রী ক্লারা জেটকিন পুরুষের পাশাপাশি নারীর সম-অধিকারের দাবিটি আরও জোরালো করেন।

১৯০৭ সালে জার্মানির স্টুটগার্টে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলন।
১৯০৮ সালে নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
১৯১০ সালে কোপেনহেগেনে ১৭টি দেশের ১০০ জন প্রতিনিধি নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন।

১৯১১ সাল থেকে ৮ মার্চ দিনটিকে `নারীর সম-অধিকার দিবস` হিসেবে পালিত হয় ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে এই সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী
১৯১১ সালের ১৯ মার্চ প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন করা হয়। একই দিনে সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক, অষ্ট্রিয়া ও জার্মানিতে লক্ষাধিক নারী মিছিল ও সমাবেশের মধ্য দিয়ে এ দিনটি উদযাপন করেন।
১৯১৪ সাল থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালিত হতে থাকে।

১৯৭৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে ৮ মার্চ নারী দিবস পালনের জন্য উত্থাপিত বিল অনুমোদন পায়।
১৯৮৪ সালে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণা করে রাষ্ট্রসংঘ। ঐতিহাসিক সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রসংঘ এই সিদ্ধান্ত নেয়
২০০৯-এ বিশ্বের ২৯টি দেশে সরকারি ছুটি সহ প্রায় ৬০টি দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালিত হয়েছে।(সুত্রঃ গুগল তথ্য ভান্ডার)

সারা বিশ্বে প্রায় সব দেশেই এই দিবসটি কমবেশী পালিত হলেও সমাজে নারীর স্নমান মর্যাদা বা কাজের মুল্য কতটুকু পাচ্ছেন সেই হিসাব করার সময় এখন এসেছে। আজো পরিবারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষই হলো একনায়ক। আজো নারী তার জীবন চলার পথে পুরুষের নিরাপত্তা সমাজ দেয় সেই নিরাপত্তা টুকুও পাচ্ছে না। বরঞ্চ সমাজ এবং সভ্যতা যত উন্নত হয়েছে ঠিক সেইমাত্রাতেই নারীকে নিরাপত্তার ধুয়ো তুলে অন্তরপুরে পাঠানোর ষড়যন্ত্র চলছে দেশে দেশে। এখনো শিশু মালালা কে স্কুলে যাওয়ার জন্যে এবং তার সাথীদের স্কুলে পড়ার সুযোগ চাওয়ার অপরাধে গুলি খেয়ে মৃত্যুর সাথে পাঙ্গা লড়তে হয়। পাশাপাশি উন্নয়নের কথা বলে, সামনে এগিয়ে যাওয়ার লোভ দেখিয়ে নারীকে প্রতি মুহূর্তে পণ্যে পরিনত করার উৎসব চলছে। স্বাভাবিকভাবে, নিয়মানুযায়ী বা সভ্যতা বিকাশের হাত ধরে নারীর যে এগিয়ে চলা সেই চলার পথে পদে পদে বাধা সৃষ্টি করে রাখা হচ্ছে কৌশলে।

তারপরেও থেমে নেই নারী। দেশের প্রেসিডেন্ট হতে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী, স্পীকার বিরোধীদলীয় নেতা, বিজ্ঞানী, ডাক্তার, প্রকৌশলী, স্থাপত্য বিদ সকল যায়গাতেই আজ নারীদের জয়জয়কার। কোন বাধাই থামিয়ে রাখতে পারে নি সমাজের কাজে লাগার অভিপ্রায়কে। আমরা শুধু চাই নারীর এই জয়রথ যেনো কোনভাবেই থেমে না যায়। বুকে বা মাথায় গুলি নিয়েও যেনো নারী মুক্তির এই জয়যাত্রা এগিয়ে চলে সমজের সকল কল্যানকর উন্নয়নের পথে। নারী মুক্তি যেন বিজ্ঞাপনের মডেলেই থেমে না যায় এই প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি তাদের কাছে যারা এতদুর চলে এসেছেন নিজেদের একক চেষ্টায়।