ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

ইদানীং একটি জিনিষ আমাদেরকে বিব্রত করছে। আমরা মনে করছি ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু লেখা মানেই মুক্তচিন্তার অধিকারী হওয়া। মুক্তচিন্তার মানুষ কোন একটি চিন্তার মধ্যে আবদ্ধ না থেকে বিজ্ঞান মনস্ক ভাবে তাঁর মতামতকে তুলে ধরবে। এই বিজ্ঞান মনস্কতার জন্যে কোন ধর্মকে আঘাত করতেই হবে এমন কথা বা এমন কোন নিয়ম কানুন আছে বলে আমার জানা নেই। সস্তা জনপ্রিয়তা নেওয়ার জন্যে কোন ধর্মকে আঘাত করে লিখে রাতারাতি জনপ্রিয় হওয়া সহজ, নিজেকে একজন বিজ্ঞান মনস্ক মানুষ হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করা যেতেই পারে। কিন্তু সরাসরি নিজের ধর্মকে ছোট করে বা অন্য ধর্মকে হেয় করে লিখে সমাজের কী লাভ সেটা বোঝা আমার মতো লেম্যানের পক্ষে কষ্টকর।

আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে অনেক সমস্যা, অনেক পিছিয়ে আছি জীবনের অনেক ক্ষেত্রে। এই দেশগুলোতে ক্ষুধা দারিদ্র, অশিক্ষা – কুসংস্কার আর পুজির সীমাহীন দাপট আমাদের জীবনকে প্রতিনিয়ত এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে রাখে। সমাজের অসাম্যতা একে অন্যকে দাবিয়ে রেখে উপরে উঠার যে নিরন্তর অশুভ প্রতিযোগিতা চলে সেই প্রতিযোগিতায় ধর্ম মানুষকে অনেকটাই বেঁধে রাখে। একথা গুলো যারা অস্বীকার করতে চান তাদেরকে সালাম। কিন্তু আমাদের প্রেক্ষাপটে এর চেয়ে সত্য আর কিছু নাই। আমরা সেই সত্যকে অস্বীকার করে মূলত নিজেদের সঙ্গে প্রতারণা করা ছাড়া অন্য কিছুই করতে পারি না।

আমাদের দেশ যখন অনেক পশ্চাৎপদ ছিলো তখন ওয়ালিউল্লাহ সাহেবের মতো লেখক লালসালুর মতো উপন্যাস লিখেছেন, সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের অনেক লেখা আছে যেখানে আমাদের ধর্মের অনেক অসদাচরণের কথা লিখেছেন, কিন্তু কোনদিন এনাদের বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ আসে নাই। তাদেরকে হত্যা তো দূরের কথা তাদেরকে আজো শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়। তারা কিন্তু মুক্তচিন্তার মানুষ। তারা কিন্তু জনপ্রিয়ও। আজকে আমার মনে হয় সস্তা জনপ্রিয় হওয়ার জন্যে নিজের জীবনকে বিপন্ন করে মুক্তচিন্তার নামে নিজের ধর্মকে বা অন্যের ধর্মকে ব্যঙ্গ করার পথ পরিহার করা। আমাদের প্রতিদিন অনেক অন্ধকারের সাথে লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে একদল মানুষরূপী জানোয়ার আমাদের ধর্ম নামে লাখো মানুষকে হত্যা করেছে। ধর্ষণে সাহায্য করেছে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী কে। সেই যুদ্ধের বিভীষিকা আজো আমাদের মধ্য থেকে চলে যায় নাই। সেই অশুভ শক্তি আজো আমাদের স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। সেই সময় আমরা যদি নিজেদের মেধাগুলোকে নষ্ট করে দেই সেক্ষেত্রে আমাদেরই ক্ষতি হবে।

এই যখন অবস্থা তখন অন্ধকারের শক্তি আমাদের দুর্বলতা কে কাজে লাগিয়ে আমাদের স্বাধীনতা কে নস্যাৎ করতে উঠে পড়ে লাগবে এতে অবাক হবার মত নতুনত্ব নেই। তারই বহিঃপ্রকাশ আজকের রাজীব, দীপ, অভিজিৎ আর ওয়াসিকুরসহ অসংখ্য মুক্তচিন্তার মানুষগুলোকে হত্যা।

এই হত্যাগুলোর সাথে রাজনীতির অনেক সমিকরন কাজ করছে বলেই মনে হচ্ছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এবং বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান পেক্ষাপটে অনেকবেশী গরুত্ব বহন করছে। সেই গুরুত্বের সাথে এইসব হত্যাকান্ড কে কোনভাবেই দূরে সরিয়ে রাখা যায় না। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ, সরকার এমনকি বিদেশী সংস্থা পর্যন্ত তদন্তে নেমেছে। অনেক তদন্ত কমিটি তাদের গুরুত্বপূর্ণ মতামতসহ রিপোর্ট জমা দিয়েছে কিন্তু কোন স্মাধান পাওয়া যায় নাই। কিন্তু হত্যাকান্ড থামে নাই। কিছুদিন পত্র পত্রিকায় গরম গরম খবর ছাপা হয়েছে, বিভিন্ন বিশিষ্ট জনের লেখা লেখি ছাপা হয়েছে। কিন্তু অন্ধকার সরে যায়নি। বরঞ্চ প্রতিদিনই আমরা আস্তে আস্তে আরো অন্ধকারে প্রবেশ করছি।

জঙ্গীবাদ এবং সন্ত্রাসকে দায়ী করে আমরা লেখালেখি করে আসল ব্যাপারগুলোকে আড়ালে চলে যেতে দিচ্ছি কিনা সেটাও আজ ভেবে দেখার সময় এসেছে।

ক্ষমতায় থাকা আর ক্ষমতায় আসাই যখন একটি দেশের রাজনীতির প্রধানতম ইস্যু হয়ে যায় সেই দেশে আর যাই হোক গনতন্ত্র বিকাশের কোন পথ থাকে না।

আজকে সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেবার। আমরা কি করবো এবং কোনদিকে যাবো। স্বাধীনতার মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছরে আজকে সিদ্ধান্ত নেবার সময় এসেছে আমরা কি আবার উল্টো পথে হাঁটবো নাকি ’৭১ এর মতো আবার সকল বাঁধাকে মাড়িয়ে দিয়ে সামনের আলোর দিকে হাঁটবো।

গত বেশ কিছু বছর ধরেই একটি কথা আমাদের মাঝে আস্তে আস্তে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলেছে স্বাধীনতার সময়কার ভেদাভেদকে ভুলে যেয়ে জাতি গঠনে মনোযোগি হওয়ার। গনতন্ত্রের জন্যে, দেশের উন্নতির জন্যে, সকল মত সকল পথকে একসাথে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্যে সবাইকে ভুলে যেতে হবে একাত্তরে কী হয়েছিলো সেইসব কথা।

আসুন, আমরা আমাদের বিজ্ঞান মনস্ক চিন্তা চেতনাগুলোকে আমাদের দেশের গরীব অশিক্ষিত মানুষগুলোকে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার পথ বাতলে দেবার কাজে লাগাই। আমাদের জ্ঞান, চিন্তা ভাবনা এবং আমাদের সকল প্রচেষ্টা ধাবিত হোক মানুষের কল্যাণে, ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। আমরা আমদের মুক্ত চিন্তা ভাবনা কাজে লাগাতে চাই মানুষের নূন্যতম মৌলিক চাহিদা পূরণে।