ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

আমাদের দেশে নির্বাচন এলেই প্রার্থী এবং রাজনৈতিক দলগুলো প্রাথমিক বাছাই পর্ব  শেষ না করতেই নির্বাচনে হেরে গেলে কি করবেন সেই বিষয়েই কথা বলেন শুরু করেন। ৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে ভোটের ফলাফল প্রত্যাখান করে বিএনপি নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি এবং জোর করে নির্বাচনে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে এমন এক বিবৃতি প্রায় প্রস্তুত করে রেখেছিলো। পরবর্তীতে নির্বাচনে আকস্মিকভাবে বিএনপি জয়লাভ করলে এই বিবৃতিটি আর আলোর মুখ দেখেনি। সেইক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সুক্ষ কারচুপির  অভিযোগ এনে নির্বাচন কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলো। এরপর থেকে যে নির্বাচনই হোক, যারাই জিতেন তারা বলেন নির্বাচন অবাধ এবং সুষ্ঠ হয়েছে আর যারা হারেন তারা বলেন নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির মধ্য দিয়ে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে এমন কোন দল নেই, এমন কোন নির্বাচন নেই, যে নির্বাচনে দলের পরাজয়কে স্বীকার করে বিজয়ী দলকে অভিনন্দন জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশের গনতন্ত্রের সবচেয়ে বড়ো ট্র্যাজেডি হলো এই যে, পরাজয় স্বীকার করতে কেউ রাজী নয়। বাংলাদেশের জনগন একমাত্র তাদের ছাড়া আর কাউকেই ভোটে বিজয়ী করতে পারে না এই মনমানসিকতা নিয়ে এনারা গনতন্ত্রের চর্চা করেন। নির্বাচন করতে রাজী সবাই কিন্তু হারতে চাই না। নির্বাচনে হার জিত পৃথিবীর সব দেশেই আছে, শুধু নেই আমাদের এই বাংলাদেশে। এই দেশে নির্বাচনে হেরে গেলে সার্বভৌম চলে যায়, স্বাধীনতা বিপন্ন হয়। নির্বাচনে হেরে গেলে গনতন্ত্র মুখ থুবড়ে পরে। এই দেশে এমন একটি সংস্কৃতি চালু হয়েছে যে নির্বাচনে হেরে গেলেই এই দেশের জনগনের জন্যে কিছুই করা যাবে না, আবার কখন ক্ষমতায় আসবে সেটাই হয়ে উঠে মুখ্য।

২০০৮ সালের একটি মোটামুটি গ্রহনযোগ্য নির্বাচনের অব্যাহত পরেই বিএনপি নেত্রী দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও স্লোগান কে সামনে নিয়ে তার দলের কাউন্সিল এবং আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। এক্ষেত্রে একটি কথা এখানে না বললেই নয় যে, ২০০১ সালে নির্বাচনে জিতে বিএনপি জামাত জোট যে নারকীয় তান্ডব শুরু করেছিলো সেরকম কোন তান্ডব তো দুরের কথা, বেশ কিছুদিন ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন অঙ্গসংঘঠনের কোন উচ্চবাচ্চ্য পর্যন্ত দেখা যায় নি। পরবর্তীতে অবশ্য জনগন অনেক কিছুই লক্ষ করেছে। এমনকি এইসব অনেক কিছুর জন্যে প্রধানমন্ত্রীকে তার অঙ্গসংঘঠনের সাংঘঠনিক সভাপতির পদ থেকেও পদত্যাগ করতে হয়েছিলো।

আগামী ২৮শে এপ্রিল ঢাকা ও চট্রগ্রামের তিন সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও চট্রগ্রাম সহ সারা দেশের মানুষ নান আলোচনায় মেতে উঠেছে। সারা দেশের চোখ এখন সিটি নির্বাচনের দিকে। সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার হলো প্রধান বিরোধী দল বিএনপি  এবং জামাত জোট এই সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহন করছে। মনোনয়ন জমা এবং যাআচাইকরন পর্ব শেষে এখন আপীল, প্রত্যাহারের জন্যে অপেক্ষা। এর পরে জমে উঠবে নির্বাচনের মাঠ। নির্বাচন কমিশন আগামী ৮ই এপ্রিল হতে প্রচারনার অনুমতি প্রদান করেছেন।

এরইমধ্যে নির্বাচনে হেরে যাওয়া বা সুষ্ঠ না হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে গত শুক্রবার এক সেমিনারে শত নাগরিক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক এমাজ সাহেব বলেছেন নির্বাচনে কারচুপি হলে দুর্বার গন আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। আইনজীবী সমিতির নেতা খোন্দকার মাহাবুবুদ্দীন আরো এককাঠি বাড়িয়ে বলেছেন সেইদিন থেকে এই সরকারের পতন দিন গননা শুরু হয়ে যাবে। এমন তীব্র আন্দোলনের হুমকী তিনি দিয়ে বলেছেন সরকার পালাবার পথ পাবে না। এইধরনের হুমকী অবশ্য এই সরকার ২০০৮ এর নির্বাচনের পর থেকেই শুনে আসছে। এর আগে পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সময় নির্বাচনের শুরু থেকেই বিএনপি জামাত জোট বলে আসছিলো নির্বাচন সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ হবে না। সরকার তার রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ব্যবহার করে নির্বাচনের ফলাফলকে পালটে ফেলবে। শুধু তাই নয় নির্বাচন সম্পন্ন হবার পরেও তারা পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে তাদের এই মতামত তুলে ধরে। অথচ পাঁচটি সিটি নির্বাচনেই বিএনপি জয়লাভ করেছিলো।

গত তিনমাসে বিএনপি জামাত জোট গনতন্ত্র উদ্ধারের নামে যে তান্ডব চালিয়েছে, যত মানুষ কে পুড়িয়ে মেরেছে, অর্থনীতির যে ক্ষতি সাধন করেছে সেইসব ভয়ঙ্কর স্মৃতির কথা এই তিন সিটির জনগন ভুলে যাবে এমনটি চিন্তার অবকাশ খুব কম। তারপরেও মানুষের কথা আলাদা। হয়তো বিএনপি প্রার্থীদের জনগন ভোট দিয়ে জিতিয়ে আনলে আনতেও পারে। তাহলে উনারা নির্বাচনের আগেই এইসব কথা বলে কিসের ইঙ্গিত দিতে চাচ্ছেন।উনাদের কথা থেকে স্পষ্টতই বুঝা যাচ্ছে তারা এই নির্বাচনের পরেও তাদের মানুষ মারার যে মিশন তারা শুরু করেছেন সেতা অব্যাহত রাখবেন। এই নির্বাচনে অংশগ্রহনের মধ্য দিয়ে বিএনপি জামাত আসলে নিজেদের নেতা কর্মীদের স্পেস দিতে চাচ্ছেন। জনগনের মনে আশঙ্কা তারা আবার নতুন করে তান্ডব শুরু করার জন্যে এই নির্বাচনকালীন সময়টাকে রসদ যোগানোর কাজে ব্যবহার করছেন কিনা?