ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

বাঙালির প্রানের উৎসব পহেলা বৈশাখ। অনেক তর্ক-বিতর্ক থাকার পরেও ধিরে ধিরে এই পহেলা বৈশাখ বাঙালির সার্বজনীন উৎসবে পরিনত হচ্ছে। ’৭১ সালে যে চেতনা নিয়ে বাঙালি স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলো সেই অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে পহেলা বৈশাখ আমাদের জাতীয় জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে। প্রায় তিনমাস ধরে সারা দেশে গনতন্ত্র উদ্ধারের লক্ষ্যে পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ মারার যে মিশন শুরু হয়েছিলো সেই মিশন কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাঙ্গালী মেতে উঠেছিলো বাঙ্গালীর প্রানের অনুষ্ঠান নববর্ষ কে বরন করে নেওয়ার লক্ষ্যে। সকল ভয় দ্বিধাকে উপেক্ষা করে নেমে এসেছিলো রাস্তায়। সবার লক্ষ্য ছিলো প্রানের সাথে প্রান মিলিয়ে এক মহামিলনের সেতু বন্ধন তৈরী করে ঐক্যবদ্ধভাবে সকল সাম্প্রদায়িকতাকে নির্মূলে শপথ নেবার। সারাদিন কোথাও যখন কোন গোলযোগ করা যায় নাই ঠিক তখনি একশ্রেণীর কুলাঙ্গার জনসমুদ্রে ঢুকে মহামিলনের পবিত্রতাকে কুলুষিত করে দিলো। খুবই পরিকল্পিতভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসমুদ্র, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে এক টাউন সার্ভিসের ভিতরে এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কিছু কুলাঙ্গার পহেলা বৈশাখের সার্থক অনুষ্ঠানমালার আনন্দ সমাবেশে যোগ দেওয়া কিছু মা বোনের উপর পাকিস্তানী সেনাদের মতো হামলে ‘পরে পৈচাশিকতায় মেতে উঠে। সেই পৈচাশিকতার খবর আমাদের মিডিয়াও লুফে নিয়ে প্রচারে ব্যস্ত হয়ে পরে।

আমরা জানি বাঙ্গালীর পহেলা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারী, স্বাধীনতা দিবস এবং বিজয় দিবসের আনন্দ এদেশের কিছু মানুষের গায়ে জ্বালা ধরায়। বাঙ্গালীর প্রানের এইসব অনুষ্ঠান গুলো তাদের পরাজয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। তাই এইসব অনুষ্ঠানে যত বেশী মানুষের সমাগম হয় ততো বেশী তারা এইসব অনুষ্ঠানের সার্থকতাকে ভূলুণ্ঠিত করার চেষ্টা চালায়।

বাঙালির যে কোন অনুষ্ঠানে নারী পুরুষের সমান অংশগ্রহন এবং সকল ধর্মের মানুষের অংশগ্রহন জাতি হিসাবে আমাদেরকে অনেক বেশী সভ্য করে তোলে। সাধারনতঃ এতো বেশী সংখ্যক মানুষের সমাবেশে পৃথিবীর অন্য যেকোন দেশে অনেক বেশী দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়। অথচ আমাদের দেশ অনেক বেশী গরীব এবং অনুন্নত হলেও আমাদের কোন অনুষ্ঠানেই তাদের মতো কোন দুর্ঘটনা ঘটে না বললেই চলে। এর আগেও আমাদের দেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এর চেয়েও বেশী জনসমাগম হয়েছে কিন্তু এই বৈশাখের মতো দুর্ঘটনার ইতিহাস প্রায় বিরল বললেই চলে।

২০০১ সালে এই বৈশাখের অনুষ্ঠানের উপর নির্মম আঘাত করা হয়েছিলো। অনেক মানুষকে গ্রেনেড মেরে হত্যা করে বৈশাখের অনুষ্ঠান মালাকে বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলো। আর এবার মেয়েদের আব্রুর উপর হামলা করে এই অনুষ্ঠানের সার্বজনীনতাকে নষ্ট করার চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে। যারা করেছে তারা যে দলের বা গোষ্ঠীরই হোক না কেনো তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এদেশের স্বাধীনতা বিরোধী এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতকেই শক্তিশালী করছে। সরকারকে কঠোর হতে হবে এইসব লুকিয়ে থাকা বিভীষণদের ব্যাপারে।

যারা আমাদের চিহ্নিত শত্রু তাদের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ করা সহজ কিন্তু আমাদের সাথে মিশে যেয়ে যারা আমাদের সর্বনাশ করছে বা করতে চায় তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা অনেক কঠিন।

আমাদের সংবাদ মাধ্যম যে ভাবে সেদিনের নারী নির্যাতনের খবর প্রচার করেছে বা করছে তারাও কিন্তু পরোক্ষে অইসব অন্ধকারের শক্তির পক্ষ্যে কাজ করে চলেছে। কিছু কিছু মিডিয়া যেভাবে খবরটি প্রচার করেছে তাতে মনে হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেদিনের চত্বরে একদল পশু কয়েকজন নারীকে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করেছে। এখানে উল্লেখ্য যে মহামান্য হাইকোর্ট কে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে যে, নারীর প্রতি যে কোন ধরনের অশ্লীল আচরণের নামই হলো যৌণ হয়রানি। এক্ষেত্রে এই কথা মেনে নিয়েও বলা যায় উপস্থাপনের সময় আমরা অনেক কিছুই সুন্দর করে সাবলীলতার সাথে এবং সহজযোগ্য করে তুলে ধরতে পারি। আমাদের দেশে ধর্ষণের মামলায় যেভাবে ধর্ষিত নারীদের জেরা করা হতো তাতে আদালতের মধ্যে সেই হতভাগা নারীকে পুনরায় কথার দ্বারা ধর্ষিত হতে হতো। গত দু‘দিনের মিডিয়ার বিভিন্ন টক শো’তে উপস্থাপিকারা যেভাবে ঘটনার বিবরন দিয়েছেন তাতে সেইদিনের হতভাগ্য নারীদের আবারো নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।

খোলামেলা কথা বলে, সুনির্দিষ্টভাবে পয়েন্টে পয়েন্টে ঘটনার পুংখানুপুক্ষ বিবরন দিয়ে নিজেকে ভালো উপস্থাপিকা হিসেবে, নিজেকে আরো দামী করে তুলতে পারেন কিন্তু আপনার উপ্সথাপনার জন্যে যে মেয়েটি নির্যাতিত হয়েছে তাকে আরো বেশী করে অপমানিত করছেন সেটা ভুলে গেলে চলবে না। এবং সেইসাথে মনে রাখতে হবে যে শক্তি অত্যন্ত সুকৌশলে আমাদের প্রানের অনুষ্ঠান গুলোকে বন্ধ করতে চাচ্ছেন তাদেরকেই যেন উৎসাহিত করা না হয়। আসলে আপনাদের বর্ণনার মাহাত্ম অইসব শক্তিকে ফতোয়া জারীতে আরো বেশী তৎপর করে তুলছে।

মিডিয়ার সংবাদ প্রচারের অতি আগ্রহে আমরা জাতি হিসেবে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি এবং হচ্ছি। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় যখন অনেক বেশি মানুষের প্রানহানি ঘটে তখন আমাদের উদ্ধার তৎপরতার সীমাবদ্ধতার খবর জানা সত্বেও যেভাবে সংবাদ প্রচারে ব্যস্ত হয়ে পরেছে তাতে সার্বিক ভাবে উদ্ধার তৎপরতায় কোন হেরফের না হলেও বিদেশের কাছে আমরা জাতি হিসেবে অনেক বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হই।

যাই হোক জনগন সেদিনের নির্যাতনের জন্যে দায়ী পশুদের প্রেফতার এবং সমুচিত শাস্তি দাবী করছে। এই ঘটনার পিছনের শক্তির মুখোশ উম্মোচন চায়। কর্তব্যরত পুলিশের অবহেলার উচিত শাস্তি দেখতে চায়। এবং আমাদের প্রানের অনুষ্ঠান গুলোর সার্বিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চায়।