ক্যাটেগরিঃ কৃষি

 

বাংলাদেশ এখনো কৃষি নির্ভর একটি দেশ। এখনো আমাদের জাতীয় আয়ের এক বিশাল অংশ এবং প্রবৃদ্ধি  বৃদ্ধির এক উল্লেখ সংখ্যক পরিমান নির্ভর এই কৃষি খাতের উৎপাদনের হ্রাস বৃদ্ধির উপর। অথচ আমাদের ক্ষমতায় থাকা এবং দেশের বিশিষ্ঠ অর্থনীতিবিদ রা বিভিন্ন বিষয়ের উওর নানান মতামত দিয়ে আমাদের ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার টকশোগুলোকে গরম করে তুলেন কিন্তু আমাদের জাতীয় জিবনের এক বিশাল ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে গোপনে গোপনে সে বিষয়ে কারো কোন মাথাব্যাথা নেই বললেই চলে।

আমাদের দেশের বিভিন্ন মিডিয়ার টকশোগুলো দেখলে মনে হয় দেশে একমাত্র সমস্যা গনতন্ত্র থাকলো কী থাকলো না এই নিয়ে। জাতীয় দুর্যোগের সকল ক্ষয়ক্ষতি যেনো কাটিয়ে উঠা যাবে এই একমাত্র গনতন্ত্র ফিরে আসলেই, একমাত্র নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সরকার পরিবর্তন হয়ে গেলেই বাংলাদেশের সকল আপদ বিপদ মিলিয়ে যাবে ভোজবাজোর মতো।

আগেই বললাম, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো নির্ধারিত হয়ে থাকে কৃষির উৎপাদনের হ্রাস বৃদ্ধির উপর। সেই কৃষির ভিতরের অবস্থা এখন কেমন সেই কথা আমরা কেউই স্মরনে আনি না। কৃষক এবং তার আবাদযোগ্য জমির পেছনের খবর নিয়ে আমাদের কারো কোন মাথাব্যথা দেখা যায় না। সরকার নিয়ম মাফিক কৃষি খাতে উন্নয়নের তাগিদ দিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা জোড়েসোরে প্রচার করলেও কাজের কাজ যে কিছুই হচ্ছে না তার প্রমাণ নীচের কিছু পরিসংখ্যানে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

  • বাংলাদেশের মোট জমির পরিমান হল ৩ কোটি ৩৪ লাখ একর মতান্তরে ৩ কোটি ৫৭ লাখ ৬৩ হাজার একর।
  • বাংলাদেশে মোট আবাদ যোগ্য জমির পরিমান হোল ২ কোটি ১ লাখ ৫৭ হাজার একর। প্রায় ৮০ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর ( বিশ্ব ব্যাংক)
  • অন্যদিকে চাষের অযোগ্য জমির পরিমান মাত্র ২৫ লাখ ৮০ হাজার একর।
  • মাথাপিছু আবাদি জমির পরিমান মাত্র ০.২৮ একর বা ০.৮ হেক্টর।
  • বাংলাদেশে প্রতি কৃষকের আবাদি জমির পরিমান মাত্র ১.৫০  একরের মতো।
  • পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং কৃষি বিভাগের হিসাব মতে প্রতি বছর দেশের কৃষি জমির পরিমান কমছে ৬৮ হাজার ৭০০ হেক্টর, অর্থাৎ প্রতি বছর শতকরা এক ভাগ হিসাবে আবাদ যোগ্য জমির পরিমান কমে যাছে।
  • বাংলাদেশের জনসংখ্যার ১ কোটি ৭৬ লাখ ৮০৪টি কৃষক পরিবার রয়েছে, এবং মজার ব্যাআর হল এদের ষাত ভাগই হল প্রান্তিক চাষী।

উপরের পরিসংখ্যান্ন সহজেই বলে দিতে পারছে বাংলাদেশের কৃষক কতো প্রতিকুলতার মাঝেও বাংলাদেশের মানুষের জন্যে কিভাবে খাদ্য উৎপাদন চলিয়ে যাচ্ছে। একদিকে কৃষি জমির হারিয়ে যাওয়া অন্যদিকে জনসংখ্যার উদ্ধগতি এই দুই বৈপরত্যের মাঝে থেকেও দেশকে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলার অসামান্য কাজটি করে চলেছেন আমাদের কৃষক ভাইয়েরা।

কৃষি জমির অপচয় বা নষ্ট করে অবাধে অপরিকল্পিত ভবাএ আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলে দেশের অর্থনীতিতে  যে বিরুপ প্রভাব পড়ছে তা থেকে বের হয়ে আসার পথ খুজে বের করতেই হবে। এই প্রসঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে খাদ্যশস্য আমদানি করে দেশের খাদ্য সুস্যা দূর করার যে অলীক স্বপ্ন কিছু মানুষ দেখেন তা অবাস্তব স্বপ্ন দেখারই নামান্তর।

প্রতিদিন ইলেক্ট্রনিক মিডীয়ার টক শোর টেবিল নির্বাচন আর গনতন্ত্রের জন্যে গরম না করে দেশের আর্থ- সামাজিক উন্নয়নের প্রয়োজনে কি পদক্ষেপ নেওয়া যায় সে ব্যাপারে আলাপ আলোচনা করা উচিত। গত দুই তিন বছর ধরে গনতন্ত্র উদ্ধার আর সুষ্ঠ নির্বাচনের পিছনে যে সময় ব্যয় করেছেন আমাদের বুদ্ধিজীবিরা তা আমাদের দেশের সাহ্রন মানুষের ভাগ্যর কোন  পরিবর্তনই আনতে পারে নাই। বরঞ্চ সাধারন মানুষের বিরক্তির উদ্রেক হয়েছে অনেক বেশী।

বংলাদেশে কৃষি যোগ্য জমিকে যে কেউ যে কোন কাজে ব্যবহার করতে পারে। এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট আইন প্রনয়ণ করা হয় নাই। বিগত কয়েকবছর ধরে একটি আইন প্রনয়নের কথা শোনা গেলেও আইন হিসেবে আজো তা সৃষ্টি হয় নাই বা আলোর মুখ দেখে নাই। শুধুমাত্র সরকারী ভাবে কোন জমি অধিগ্রহনের সময় লক্ষ্য রাখা হচ্ছে অধিগহিত জই পারত পক্ষ্যে যেনো কৃষি জমি না হয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৮৬ সালে আবাদি যোগ্য জমি ছিল ৮১ লাখ ৫৮ হাজার হেক্টর। ২০০০ সালে তা কমে ৭১ লাখ ৯ হাজার হেক্টরে আসে। ২০০৩ সালে ৭০ লাখ ৮৭ হাজার হেক্টরে এসে দাঁড়ায়। গড়ে প্রতিবছর ৪০ হাজার একর আবাদি জমি হারাচ্ছে।

সরকারের গবেষণা প্রতিষ্ঠান মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) সম্প্রতি প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের কৃষিজমি বিলুপ্তির প্রবণতা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ সাল পরবর্তী ১২ বছরে দেশে প্রতিবছর ৬৮ হাজার ৭৬০ হেক্টর আবাদি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে।

জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি ২০১০’ এবং ‘কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইন ২০১০’ অনুসারে কৃষিজমি কৃষিকাজ ব্যতীত অন্যকোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে নাকোনো কৃষিজমি ভরাট করে বাড়িঘর, শিল্প-কারখানা, ইটভাটা বা অন্যকোন অকৃষি স্থাপনা কোনোভাবেই নির্মাণ করা যাবে না উল্লেখ করে একটি নামে মাত্র আইন আছে।

এবার আমরা দেখতে পারি কৃষিজমি কমে যাওয়ার কারণ কি?  সহজভাবে বলতে গেলে কৃষি জমি কমে যাওয়ার পিছনে জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে মূল বলে মনে করেন অনেকেই। বাড়তিজনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে ঘরবাড়ি তৈরির জন্য ব্যবহত হচ্ছে ভূমি।

২০০১ সালের আদমশুমারি অনুসারে বসতবাড়ির সংখ্যা ছিল দুই কোটি সাড়ে ৪৮ লাখ।
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে বসতবাড়ির সংখ্যা তিন কোটি ২১ লাখ ৭৩ হাজার ৬৩০।
১৯৯৬-২০০৮ সময়ে তিন লাখ ৫২ হাজার একর থেকে বেড়ে ছয় লাখ ৭৭ হাজার একরে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ‘বিশ্ব উন্নয়নসূচক ২০০৯’ থেকে জানা যায়, ১৯৯০ সালে দেশের ২০ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করত।
২০০৭ সালে তা বেড়ে হয় ২৭ শতাংশ। বৃদ্ধির এ হার দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ।

এছাড়াও আছে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সড়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে আসছে। এই সড়ক ও জনপদ তৈরীতে বহুলাংশেই কৃষি জমি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

অন্যদিকে আবাসস্থল এবং সড়ক ও জনপদের ব্যবহৃত কৃষি জমি ছাড়াও দেশের শিল্প কারখানায় ব্যপকভাবে কৃষি জমি ব্যবহার হয়ে আসছে। দেশ যতই শিল্পোন্নত হচ্ছে ততোই কৃষিতে আবাদযোগ্য জমি শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠায় ব্যবহৃত হচ্ছে।

কৃষির এই দূরাবস্থা দূর করতে জাতীয়ভাবে নীতি গ্রহন করতে হবে। শিল্প কারকানা, রাস্তাঘাট এবং আবাসস্থলের জন্যে জমির প্রয়োজনীতাকে অস্বীকার না করে সুষ্ঠ নীতিমালা গ্রহনের মধ্য দিয়ে কৃষক এবং কৃষি কে আধুনিকায়নের মধ্য দিয়ে যুগোপযোগী করা তোলার এখনি সময়।

***
সূত্রঃ পরিসংখ্যান গুলো বাংলাদেশ ব্যাংক, পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং ব্লগার আকাশের লেখা হতে