ক্যাটেগরিঃ কৃষি

 

মানব সভ্যতার উষা লগ্নেই বীজ থেকে গাছ হওয়ার যে যুগান্তকারী সৃষ্টি রহস্যের সন্ধান মানূষ আবিষ্কার করেছিলো, সেই আবিষ্কারের প্রধানতম কারিগর ছিলেন নারী। প্রকৃতি গত ভাবেই নারী যখন বংশ বিস্তারের জন্যে শারীরিক ভাবে অসুস্থ্য থাকতো সেই সময় তার শিকারের যাওয়া হয়ে উঠতো না। ঠিক সেই সময় থেকেই নারী গাছ থেকে আহরিত ফলের বীজ থেকে গজিয়ে উঠা গাছের চারা থেকে কৃষি কাজের ধারনা লাভ করে। আদিম সভ্যতার প্রথম কৃষিকাজ এভাবেই শুরু হয়েছিলো নারীর হাত ধরে। ক্রমে ক্রমে মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশে সমাজ ও সভ্যতার উন্নয়নের সাথে সাথে কৃষিকাজের ধরন পাল্টিয়েছে। এসেছে নানান যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং উন্নয়ন। পাথরের ধারালো ফলা থেকে আজ যান্ত্রিক লাঙ্গলের ব্যবহারে কৃষিকাজ হয়ে উঠেছে সহজসাধ্য এবং অধিক ফলনশীল। জনসংখ্যার জ্যামিতিক হারের বৃদ্ধিকেও বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে কৃষি উৎপাদনকে নিয়ে চলেছে এক অবিস্মরণীয় পর্যায়ে।

এই যে কৃষির সৃষ্টি থেকে শুরু করে আজকের উন্নয়ন সকল পর্যায়েই আছে নারীর অবদান। শুধু বাংলাদেশেই নয় সারা বিশ্বের কৃষি ব্যবস্থাতেই নারীর অংশগ্রহন ছিলো এবং আছে। কর্মজীবী নারী সংঘঠনের নেতাদের মতে বাংলাদেশের কৃষি খাতের ২০টি কাজের মধ্যে ১৭টি কাজেই নারীর অংশগ্রহণ নিরবিচ্ছিন্ন এবং অপরিহায্য।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারে কৃষি কাজ ছাড়াও প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ আজ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বিশেষ করে দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশী বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত গার্মেন্টস খাতে নিয়োজিত ৮০শতাংশ শ্রমিকই নারী। এছাড়াও আমাদের দেশের বিভিন্ন বাসাবাড়ির গৃহকর্মে নিয়োজিত নারী শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় বিশ লক্ষাধিক। খাদ্য ও কোমলপানীয় শিল্পে, বিড়ি তৈরী শিল্পে, ইদানীং সম্প্রসারিত জুতা, চামড়া ও চামড়াজাত শিল্পে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহন উল্লেখযোগ্য। এর কারণ নারী শ্রমিকরা কাজের প্রতি অনেকবেশী নিবেদিত থাকে, মালিকপক্ষের সাথে কম যুক্তিতর্কে যেতে চায়, কাজের মান পুরুষের চেয়ে অনেক বেশী মানসম্পন্ন এবং প্রায় ক্ষেত্রেই পুরুষের চেয়ে অনেক কম মুজুরী দিয়ে অধিক কাজ করিয়ে নেয়া যায়। প্রায় শিল্পকারখানায় লক্ষ্য করা যায় পুরুষরা যখন দু’এক ঘন্টা কম কাজ করে সেখানে নারী শ্রমিকেরা খাওয়ার সময়টূকু ছাড়া আরো অনেক সময় ধরে নিজের কাজটি করে তারপরে ছুটির কথা চিন্তা করে। এইসব বিষয়াদিকে চিন্তায় নিয়ে শিল্প মালিকরা তাদের কারখানায় নারী শ্রমিকের নিয়োগে উতসাহী হয়ে উঠলেও যথাযথ পারিশ্রমিক দিতে এখনো কার্পণ্য করছেন। সরকার এবং শ্রম অধিদপ্তরো এই বৈষম্যের ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।

আগেই বলেছি বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে নারী শ্রমিকের অবদান পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে অনেক বেশী কিন্তু আজো নারীরা কৃষক বা কিষাণী হিসাবে স্বীকৃতি পাচ্ছেন না। কৃষি অধিদপ্তরে পুরুষ কৃষকদের ডাটাবেজ থাকলেও আজও নারী কৃষকদের কোন ডাটাবেজ তৈরী করা হয়ে উঠেনি বা সে চিন্তাও এখনো কেউ করেছে বলে জানা যায় নি। সুত্রমতে রাষ্ট্রীয় প্রনোদনার ১ কোটি ৩৯ লাখ কৃষক কার্ড পুরুষ কৃষকদের জন্য বরাদ্দ হলেও কৃষিকাজের ২০টি কাজের মধ্যে ১৭টি কাজে অংশ নেওয়া নারী কৃষকদের জন্যে এই কৃষক কার্ডের ব্যবস্থা করা হয় নাই। জাতীয় অর্থনীতির মুল ধারা কৃষিব্যবস্থায় নারীরা প্রথম থেকেই শ্রম দিয়ে আসলেও আজো এইসব হতভাগ্য নারীরা কৃষিকাজে তাদের শ্রমের স্বীকৃতি পাচ্ছেন না। এমনকি তারা কৃষিকাজের অধিকাংশ ক্ষেত্রে শ্রমব্যয় করেও কৃষক বা কৃষাণী হিসাবে সমাজ বা সরকার তাদের মেনে নিচ্ছেন না। এই অব্যবস্থার অবসান হওয়া উচিত। এবং শুধুমাত্র স্বীকৃতিই নয় যেহেতু পুরুষ কৃষকের চাইতে নারী কৃষকের অবদান অনেক বেশী সেহেতু এইসব পরিশ্রমী কৃষাণীদের শ্রমানুযায়ী উপযুক্ত পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা হোক। এব্যাপারে বর্তমান নারী বান্ধব এবং কৃষি বান্ধব সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সমাজ সভ্যতার প্রথম লগ্ন থেকে যে নারী আমাদের কৃষিকাজে শ্রম দিয়ে, মেধা দিয়ে মুখের অন্ন যুগিয়েছে আজ তাদের যোগ্য সন্মান দিতে যেনো কারো কার্পণ্য না আসে সে ব্যাপারে সজাগ হতে হবে। এক্ষেত্রে সমাজে যারা নারী অদিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে চলছেন তাদের আরো বেশী করে এই ব্যাপারে সোচ্চার হতে হবে। সেইসাথে প্রতিটি ক্ষেত্রে শ্রমে নিয়োজিত নারীরা যেনো মুজুরীর ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার না হয় সে ব্যাপারেও আরো কার্যকরী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।