ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

বাংলা এবং বাঙালি জীবনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের প্রভাবকে অস্বীকার করা বা রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে বাংলা ও বাঙালি চিন্তা করা অনেকটা অক্সিজেন ছাড়া মানুষের শ্বাস প্রশ্বাস চালু রাখার নামান্তর। জীবনের সকল ক্ষেত্রকে সমান ভাবে প্রাসঙ্গিক করে তোলা একমাত্র বিশ্বকবির লেখনির মধ্যেই খুজে পাওয়া যায়।

আজ থেকে প্রায় দেড়শতাধিক বছর আগে জন্ম নিয়েও তাঁর গানে, কবিতায়, উপন্যাসে, গল্পে-ছোট গল্পে, প্রবন্ধে বা গীতিনাট্যে তিনি যে কথা বা বাণী বলে গেছেন তা আজো বাঙালির জীবনে সমানভাবে প্রযোজ্য, সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। আর এইজন্যেই বিশ্বকবি তাঁর সৃষ্টিকে কালোত্তীর্ণ করে গেছেন। আধুনিকতার মোড়কে এই একবিংশ শতকে যেসব আধুনিক গান, কবিতা বা উপন্যাস লেখা হচ্ছে, সেগুলো পর্যন্ত কবিগুরুর সেইসময়কার সৃষ্টির চাইতে আধুনিক হয়ে উঠতে পারছে না। এমনকি উত্তর আধুনিকতাকেও ছাড়িয়ে গেছেন আমাদের প্রাণের কবি, মননের কবি রবীন্দ্রনাথ।

সেই সময়ের পটভূমিতে লেখা শেষের কবিতা বা ঘরে বাহিরে বা তাঁর অন্যান্য সৃষ্টিকর্ম পড়তে যেয়ে আজো মনে হয় রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এই একবিংশ শতকের মানুষ কিন্তু জন্ম নিয়েছিলেন সেই অষ্টাদশ শতকে। আগেই বলেছি বাংলা এবং বাঙ্গালীকে নিয়ে এতো ব্যাপক, এতো বিস্তারিতভাবে বিশ্বকবির মতো আর কেউই লিখে যেতে পারেন নাই এবং আজো পারছেন না।

“হে ভারত জননী, রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি”

বাঙালিচরিত বিশ্লেষনে এরচেয়ে সত্য উচ্চারণ আজো হয় নি বলেই রবীন্দ্রনাথ বাংলা এবং বাঙ্গালীর সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছেন এবং থাকবেন অনাদিকাল ধরে।

আজ বিশ্বকবির জন্মদিন। এইদিনটি শুধুমাত্র তাঁর জন্মদিনই নয়, বাংলাভাষার সহজীকরনেরও জন্মদিন বলা যায়। তাঁর মতো আমাদের নিত্যদিনের কথাকে গানে, কবিতায়, উপন্যাসে, গল্পে-ছোট গল্পে বা প্রবন্ধে স্থান দেওয়ার চিন্তা সেইসময় অন্য কেউ করেছিলেন কিনা আমাদের জানা নেই। বাংলার সহজ সরল ভালোবাসাকে আরো সহজ করে বইয়ের পাতায় স্থান দিয়ে বাঙ্গালীর নিত্যদিনের কথকতাকে সবরকম অশ্লীলতা ছাড়াই  অমর করে গেছেন আর সেই সাথে তিনি নিজেও হয়ে গেছেন বাংলা আর বাঙ্গালীর সমার্থক।

বৈশাখ মাস বাংলা সনের প্রথম মাস। গেলো বছরের সব জ্বরা জীর্ণতা, আবর্জনা আর পুরাতন কে ধুয়ে মুছে দিয়ে নতুনকে বরন করে নেয়। এই নতুন কে বরন করতে যেয়ে পুরানো সব জ্বরা জীর্ণতা কে হটীয়ে দিতে আসে বৈশাখী ঝড় নিয়ে। আমাদের বাঙ্গালীর জীবনেও কবিগুরু এসেছিলেন সকল অন্ধকারকে হটিয়ে দিতে ঝড়ের মতো। তাই তার জন্মও হয়তো হয়েছিলো বৈশাখ মাসেই। তাঁর লেখনীর দ্বারা, তাঁর সৃষ্টির দ্বারা বাংলা ও বাঙ্গালীর জীবনের যতো দুর্বলতা, যতো অপূর্ণতা ছিলো, তা পুরণ করে দিয়ে গেছেন তাঁর আলোকের ঝর্ণাধারায়।

বাংলার সমাজে বিদ্যমান দুই মানসিকতাকেই তিনি বার বার তাঁর রচনাবলীতে তুলে ধরেছেন একেবারে নিরপেক্ষভাবে। একদিকে নিখিল, বিনয় অন্যদিকে গৌর বা সন্দীপ। এই চরিত্রগুলোর মধ্যেকার ত্যাগ বা কেঁড়ে নেওয়া, সহজাত বা চাপিয়ে দেওয়ার যে দুই ধাআরক বিদ্যমান তা তুলে ধরেছেন সার্থকভাবে। বাংলার হিন্দু মুসলমান দুই ধর্মাবলম্বী দের মাঝেই কট্টর এবং নমনীয়তা পন্থীরা ছিলো। তবে ইতিহাস সাক্ষী সবসময় কট্টরতা হারিয়ে নমনীয় রাই সবসময় জিতে এসেছে। তাই হাজার বছর ধরে দুই ধর্মাবলম্বীরা পাশাপাশি বাস করে আসছেন নির্বিঘ্নে। রবীন্দ্রনাথও জয়গান গেয়েছেন নমনীয়তারই।

জমিদার পুত্র হয়েও সমাজের বিভিন্ন শ্রেনীপেশার মানুষের সাথে উঠাবসা এবং প্রজা সাধারনের মঙ্গলের জন্য নানা পরিকল্পনা গ্রহন এবং বাস্তবায়নে সচেষ্ঠ হওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর লেখা ও বাস্তব জীবনের সাযুজ্য ঘটিয়েছেন বিভিন্ন সময়ে।বাংলা এবং বাঙালির প্রকৃতি আর মানুষকে তাঁর জীবনে তিনি এমনভাবে গেঁথে নিয়েছিলেন বলেই আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’র মতো এক অনবদ্য সৃষ্টি করেছিলেন।

বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতি যতদিন এই পৃথিবীতে টিকে থাকবে ততোদিন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকবেন আমাদের পাথেয় হয়ে, আমাদের চলার পথের দিক নির্দেশক হয়ে।