ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
07

পৃথিবীতে সবচেয়ে মধুর ডাক মা, সবচেয়ে প্রিয় সম্পর্ক মা এবং সন্তানের। একমাত্র মা এবং সন্তানের সম্পর্কই পৃথিবীতে স্বার্থহীন ভাবে টিকে থাকে। সেই মা দিবস আজ। আন্তর্জাতিক মা দিবস। স্রষ্টার পরেই মাকে স্থান দেওয়া হয়েছে। পৃথিবীর সকল ধর্ম মায়ের পায়ের নীচে বেহেস্তের বা স্বর্গের অবস্থানকে নির্ধারণ করে দিয়েছে, মাকে করেছে আরো মহান। নিজে না খেয়ে, নিজের সুবিধা অসুবিধাকে উপেক্ষা করে সন্তানের কল্যান কামনায় নিজেকে উজার করে দেন যে মা, সেই মাকে সন্মান দেখানোর অভিপ্রায়ে সারা পৃথিবীতে একটি দিন উৎসর্গ করেছে বিশ্ববাসী।

প্রতিবছর এই দিনটিকে পৃথিবীর মানুষ স্মরণ করবে তার জন্মদাতা মাকে। এই লক্ষ্য নিয়েই আমরা আমাদের মাকে স্মরণ করবো শ্রদ্ধার সাথে, বিনয়ের সাথে। নিজের কাছে প্রশ্ন করবো আমরা আমাদের জন্মদাতা মায়ের জন্য কতটুকু কি করেছি, নিজে ভালো থাকার পাশাপাশি আমরা আমাদের মায়েদের কতটুকু ভালো রাখতে পেরেছি বা পারছি।

বাস্তববাদী এই দুনিয়ায় যখন সবাই নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করছি তখনো যেন ভুলে না যাই আমাদের প্রিয়তমা মা কে এই প্রত্যয়কে আরো দৃঢ় করতেই মা দিবসের সুচনা। বর্তমান দ্রুততম পৃথিবীতে সবাই নিজের অস্তিত্বটুকু টিকিয়ে রাখতে আমরা সবাই ব্যস্ত হয়ে পরে ভুলে যেতে বসেছি আমাদের স্বজনকে, ভিন্ন করে দিতে চলেছি আমাদের মা বাবাকে। সেই অতিবাস্তব সময়ের প্রেক্ষিতে মায়ের জন্যে একটু সময় বের করা, একটু নিশ্চিত আশ্রয়ের নির্ভরতা দেওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে বড়ো দাবী।

বাংলাদেশের সমাজ ছিলো বাবা মা ভাইবোন সকলকে নিয়ে একসাথে থাকার সমাজ। বাবা মা বৃদ্ধ হয়ে গেলে সন্তানরাই তাদের ভার নিবে এই ছিলো আমাদের সামাজিক রীতিনীতি। অথচ আজ বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে দ্রুত গড়ে উঠছে বৃদ্ধাশ্রম। এবং সেই বৃদ্ধাশ্রম গুলো ভরে উঠছে অশীতিপর বাবা মায়ে।

নচিকেতার বৃদ্ধাশ্রম গান এখন বাস্তবের কাহিনী। প্রতিটি ঘরে ঘরে আজ মা বাবা হয়ে উঠছেন সংসারের বোঝা বা বাড়তি লোক। মা যদি না থাকতো বা বাবা যদি বৃদ্ধাশ্রমে থাকতেন তবে সংসারে আরেকটু খোলামেলা জায়গা পাওয়া যেতো এই মানসিকতায় মাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি বৃদ্ধাশ্রমে, বাবাকে বলছি অন্য কোন ব্যবস্থা করে নিতে। আর তা যদি সম্ভব না হয় তবে ছেলে মেয়ের পড়ালেখার অজুহাতে স্ত্রী বাচ্চার হাত ধরে আলাদা হবার জন্যে বাবা মাকে অরক্ষিত রেখেই বাসা বদল করছি অবলীলায়।

বাংলাদেশের এক মা একটি প্রকল্পের কথা চিন্তা করেছিলেন এই ব্যবস্থাকে আঁচ করতে পেরে। তিনি একটি বৃদ্ধাশ্রমের আদলে একটি গ্রাম গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। যেখানে তিনি স্থায়ীভাবে কমমুল্যে ছোট প্লট তৈরী করে বিক্রি করতে চান। এব্যাপারে তাঁর চিন্তা হলো যে বৃদ্ধা বা বৃদ্ধ এখানে প্লট কিনবেন, তাঁর মৃত্যুর পরে তার সন্তান এই প্লটের মালিক হবেন এবং সন্তান যখন বৃদ্ধ হবেন তখন যেনো সেও এই জায়গায় স্থান পেতে পারে। পরিকল্পনাটি অত্যন্ত হৃদয় বিদারক হলেও বাস্তবতা আজ এই জায়গাতেই এসে দাড়িয়েছে। আমরা যেনো উনার চোখ দিয়ে আমাদের বাস্তবতা কে দেখতে পাচ্ছি।

আজ আন্তর্জাতিক মা দিবস। সারা পৃথিবীর মানুষ অনেক জাঁক চমকের মধ্য দিয়ে  জন্মদাতা মাকে স্মরণ করবে। স্মরণ করবে কৃতজ্ঞতা ভড়ে, অনেক কষ্টকে ধারন করে যে মা আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীর আলোবাতাসে বড়ো হবার সুযোগ দিয়েছেন,  স্মরণ করবে নিজের হৃদয় নিঙড়ানো ভালোবাসা দিয়ে। নিজের সব সুখকে বিসর্জন দিয়ে যে মা আমাদের মানুষ হিসাবে গড়ে তুলেছেন তাকে যেন অবজ্ঞা না করি সেই প্রতিজ্ঞা নেবার দিন হোক এই মা দিবস।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ভাষায় –

জননী, তোমার করুণ চরণখানি

হেরিনু, আজি এ অরুণকিরণরূপে।।

জননী, তোমার মরণহরণ বাণী

নিরব গগনে ভরি উঠে চুপে চুপে।।

তোমারে নমি হে সকল ভুবনমাঝে,

তোমারে নমি হে সকল জীবনকাজে,

তনু মন ধন করি নিবেদন আজি

ভক্তিপাবন তোমার পুজার ধুপে।

নিজে অভুক্ত থেকে সন্তানের পাতে খাবার তুলে দিতে পারেন একমাত্র মা। শীতের রাতে নিজে গরম কাপড় না নিয়ে সন্তানের গাঁয়ে উম দেবার চেষ্টা একমাত্র মায়ের পক্ষেই সম্ভব। সেই মাকে আমি যেনো চেড়ে চলে না যাই এই প্রতিজ্ঞা হোক এবারের এই মা দিবসে।