ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক নিবন্ধে প্রশ্ন উত্থাপন করে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেহেন। তার প্রশ্ন হলো কোথায় ডঃ ইউনুস, কোথায় অং সান সুকি। এই প্রশ্ন উত্থাপনের প্রাসঙ্গিকতা হলো বিশ্বের বর্তমান আলোড়িত সংবাদ মানব পাচার এবং সমুদ্রে ভাসমান হাজার হাজার মানুষের আহাজারি। জীবন জীবিকার তাগিদে, কিহু অসাধু চক্রের প্ররোচনায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষ যখন সমুদ্র পথে বিদেশে পাচারের সময় হয় সমুদ্রে নয় বিদেশ বিভূয়ের বন জঙ্গলে লাওয়ারিশ লাশ হয়ে পৃথিবীর থেকে বিদায় নিচ্ছে অথবা সহায় সম্বল হারিয়ে বন্দী জীবন কাটাচ্ছে তখন এই ঘটনা সারা পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলেও এই দুই দেশের শান্তির জন্যে পাওয়া নোবেল বিজয়ীদের ঘুম ভাঙ্গাতে ব্যর্থ হয়েছে। অধ্যাপক রোবায়েত প্রশ্ন করেছেন আর কত অশান্তি, আর কতো নির্মমতা আর কতো মানবেতর ঘটনা ঘটলে এই দুই মহান শান্তির দুতের ঘুম ভাঙ্গবে। প্রায় মাসখানেক হতে চললো এই মানুষ নিয়ে মানুষের অমানবিক পাচার কাহিনীর। কিন্তু এই দুই শান্তির দুতের এ বিষয়ে কোন মন্তব্য,কোন আহবান বা কোন উদ্যোগ কারো চোখে পড়েনি।

তিনি বলেহেন, একজন শান্তির দুত তার নতুন উদ্যোগ সামাজিক ব্যবসা নিয়ে দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছেন, মানুষকে ব্যবসার দ্বারা দাঁড় করানোর উদ্যোগ নিয়ে বড়ো বড়ো সভা, সেমিনার করছেন, অন্যদিকে আরেকজন শান্তির দুত তার নির্বাচনের ভোট ব্যাংক রক্ষায় ব্যতিব্যস্ত। সবচেয়ে মজার ঘটনা হলো এই দুই শান্তির দুতের আবাস স্থল হলো নাফ নদীর এপার আর ওপার। শুধু তাই নয় তাদের এলাকার জনগোষ্ঠীই এই মানব পাচারের সবচেয়ে বড়ো ভিক্টিম।

বাংলাদেশের বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের মানূষ বিদেশে গিয়ে প্রচুর টাকা উপার্জনের আশায় কিহু স্বার্থপর অর্থ লোভীর চক্রে পরে নৌকায় চড়ে বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছেন, এই সর্বনাশা যাত্রায় অধিকাংশের কপালেই লেখা হয়েছে হয় মৃত্যু না হয় বিদেশী মানবপাচারের বন্দিশিবিরের অমানবিক নির্যাতন এবং গনকবরের শেষ ঠিকানা। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী এইসব পাচার করা মানুষগুলো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যোগানের একটী ভালো সোর্স হিসেবে কাজে লাগছে। এখানে উল্লেখ্য যে, এই মরণ যাত্রার সবচেয়ে বড়ো অংশ হলো মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়। রোহিঙ্গা মসুলমানরা আরাকান রাজ্যের অধিবাসী। একসময় এই আরাকান রাজ্য হিলো স্বাধীন রাজার অধীন। নবম সতকের মাঝামাঝি থেকে এই অঞ্চলে মুসলমানদের আধিপত্য বিরাজ করে। পরবর্তীতে স্বাধীন সুলতানের নেতৃত্বে আরাকান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হলেও মোঘলদের ভারতীয় উপমহাদেশে আগমনের অব্যহতি পরেই আরাকান রাজ্য মোঘল সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। আবার ব্রিটিশ শাসকেরা বার্মার শাসন ভার দখল করে নিলে আরাকান সাম্রাজ্যকে বার্মার অধীনে নিয়ে আসা হয়। সেই সময় থেকে বার্মিজ অধিবাসীদের সাথে আরাকানীদের রেষারেষি শুরু। এই রেষারেষিকে অনেকেই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে সাম্প্রদায়িকতার লেবাশ পরাতে চেয়েছেন। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যূটি মুলতঃ জাতিগত সমস্যা এবং তারপরে ধর্মীয় রেষারেষি। সেই রেষারেষির জের ধরেই আজকের রোহিঙ্গা সমস্যার উদ্ভব। বিভিন্ন সময়ে বার্মার সামরিক বেসামরিক শাসকেরা রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন চালিয়েহে, অনেক ভয়াবহ গনহত্যা চালিয়ে রোহিঙ্গাদের তাদের আবাসভুমি থেকে বিতাড়িত করে উদবাস্তুতে পরিনত করেছে। সহায় সম্বল হারিয়ে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ এই রোহিঙ্গারা মানবেতর জীবন যাপন করছে নিজ দেশে এবং বিদেশ বিভূঁয়ে। এই রোহিঙ্গা মসুলমানরাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ভাগ্যের অন্বেষনে বের হয়েছে প্রথম। গত কয়েক বছর ধরে রোহিঙ্গা মসুলমানরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে বাংলাদেশে এবং পাকিস্তানের করাচিতে আশ্রয় নেয় এবং বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকান্ড ও জঙ্গী গোষ্ঠীর সাথে হাত মিলিয়ে বাংলাদেশের আভ্যন্তরে নানা রকম চক্রান্তে মেতে উঠে। এ বিষয়ে মিয়ানমার সরকার এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে আলাপ আলোচনা চালিয়ে সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে গেছে। কিন্তু সমস্যার সমাধান হয় নাই। এরই মধ্যে বাংলাদেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী তাদের দেখাদেখি সমুদ্রপথে নৌকা করে বিদেশ গিয়ে ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর ফান্দে আটকা পরে।

এই প্রসঙ্গের উত্থাপনের কারণ রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচারের ঘটনা বর্তমান শান্তির দুত অং সানের বাবার আমলেই শুরু হয়েছিলো। তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরন করে জেনারেল নে উইন রোহিঙ্গাদের উপর অত্যারের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেন। এবং আজ যখন সারা পৃথিবী রোহিঙ্গাদের উদ্ধারে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তখনো শান্তির দুত অং সান সুকি নিরবতা পালন করে চলেছেন। ঠিক যেমন আমাদের শান্তির দুত ডঃ মোহাম্মদ ইউনুস। শুধু আজকেই নয় গত জানুয়ারী থকে এপ্রিল মাসের প্রথম দিক পর্যন্ত আমাদের বিরোধী দলের নেত্রী দেশনেত্রী ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যে প্রতিদিন পেট্রল বোমার আঘাতে মানুষ পুড়িয়ে মারছিলেন তখনো তিনি টু শব্দটি পর্যন্ত করেন নাই।

যা হোক সেই আগুনে পোড়া মানুষগুলো নাহয় বিরোধীদলের আহবানে সাড়া না দেওয়ার শাস্তি ভোগ করেছে। তাই উনি তার প্রিয় নেত্রী এবং প্রিয় দলের কর্মসূচিতে কোন অশান্তি খুজে পান নাই। কিন্তু আজ যখন মানবতা বিপন্ন, ডুবছে মানব সন্তান। শত শত গনকবর আবিস্কারে বিশ্ববাসী হতবাক তখনো শান্তির দুতেরা চুপ করে থেকে কি শান্তির অন্বেষণ করছেন সেটাই বাংলাদেশের মানুষের প্রশ্ন। আর কত মানব সন্তানের মৃত্যু হলে তাদের শান্তির ঘুম ভাঙবে। আরো কতো গনকবর আবিস্কার হলে উনাদের মহান অমৃত বাণী শোনা যাবে?