ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে হঠাত করেই বেশ কিছুদিন ধরে একটী কথা ঘুরপাক খাচ্ছে। বিএনপিতে জিয়ার আদর্শ নেই বলেই বা জিয়ার আদর্শ থেকে অনেক দূরে গেছে বলেই বিএনপির এমন ঘোর দুর্দিন চলছে। তাই বিতারিত রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে হালের নয়া টক শোর নায়ক নায়িকা সবাই একই কথা বলা শুরু করেছেন। যেনো মনে হচ্ছে জিয়াউয় রহমান সাহেবের আদর্শ অনুসরন করা শুরু হলেই জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর সকল রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের অবসান হবে। এখন প্রশ্ন হলো জিয়াউর রহমানের কথিত আদর্শটি কি? এটা কি ধনন্তরী জাদুর বড়ি। না আলাউদ্দিনের জাদুর প্রদীপ, যে ঘষা দিয়ে বাংলাদেশ এবং জাতীয়তাবাদী শক্তির সকল সমস্যার সমাধান করে দিবে।

৭৫ এর মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের সবচেয়ে বেনিফিসিয়ারী জেনারেল জিয়া ঘটনার পালাক্রমে ক্ষমতার শীর্ষে উঠে আসেন। এবং তার মানস নায়ক জেনারেল আয়ুব খানের মতো দেশের সকল ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করা শুরু করেন। এই ক্ষমতায়নের পথে তিনি যাকে তার জন্যে হুমকী মনে করেছেন তাকেই সরিয়ে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধারা অবশ্যই প্রথম টার্গেট এর মধ্যে ছিলো। বিমানবাহিনীর চৌকস অফিসারদের মিথ্যা অভ্যুত্থানের দোহাই দিয়ে নিরবিচারে হত্যাকান্ড আলোচিত ঘটনা। এছাড়া শোনা যায় প্রায় ২৯টি ছোট বড়ো অভ্যূত্থান চেষ্ঠা তিনি নির্মূল করেছেন অত্যন্ত সুকৌশলে। এবং এক্ষেত্রে কোন করূনা বা দাক্ষিন্য দেখান নাই। সবচেয়ে বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা হলো কর্নেল তাহেরের ফাঁসি।

তাহলে জিয়ার আদর্শের প্রথম সর্ত হলো মানুষ খুন করে শত্রুর ঘাটী নিশ্চিহ্ন করা। এই মানুষ খুনের ধারা আজো বিএনপি এবং তার দোসররা ঠিকভাবেই অনুসরন করছেন।২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, ২০১৩ এর নির্বাচন ঠেকানোর তথাকথিত মানুষ মারার আন্দোলন, ২০১৪ ও ১৫ সালের ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যে পেট্রোল বোমায় মানুষ হত্যার উৎসব এইসবই তো জিয়াউর রহমান সাহেবের স্টাইল।

দ্বিতীয়তঃ স্বাধীনতা বিরোধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন করা। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো কাজটি করেছিলেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৮ সালের সংবিধানের কোলাবেটর আইন বাতিল করে দিয়ে গোলামাযমের বাংলাদেশে আসার পথকে সুগম করে দিয়েছিলেন। এরপরের ইতিহাস সবার জানা। খালেদা জিয়া যেমন নিজামী মুজাহিদ গংদের মন্ত্রী বানিয়ে ছিলেন ঠিক তেমনিভাবে কুখ্যাত রাজাকার শাহ আজিজদের প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন জিয়াউর রহমান।এর আগে সারাদেশ যখন গো আযম, নীজামী, সাঈদীসহ সকল যুদ্ধাপরাধের শাস্তির দাবীতে উত্তাল ঠিক তখনই খালেদা জিয়া গো আযমের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এখনো খালেদা জিয়া এবং তার জাতীয়তাবাদী শক্তি স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে নিয়েই পথ চলছেন। এবং ক্ষমতায় আসার যদি চান্স পেয়ে যান তাহলে প্রথম ধাক্কাতেই যুদ্ধাপরাধীদের মুক্ত করে আবার ক্ষমতার সঙ্গী করে নিবেন। এখানে একটি কথা সত্য যে খালেদা জিয়া এবং তার জাতিয়তাবাদী শক্তি যে শক্তি নিয়ে জামাতীদের দূ;সময়ে পাশে দাড়াবার কথা সেই শক্তিতে দাড়াতে পারছে না। এখানে হয়তো জিয়াউর রহমান সাহেবের পথ কিছুটা অনুসরন করা যাচ্ছে না। এর পিছনে অন্যকোন কারন নেই। শুধুমাত্র এই কয়েকবছরে বিশ্ব রাজনীতির কিছু পরিবর্তন তাকে এই পথে আসতে বাধ্য করেছে।

তৃতীয়তঃ জিয়াউর রহমান সাহেব তার ক্ষমতায় যাওয়ার সঙ্গী হিসেবে কিছু বোকা বামপন্থি পেয়েছিলেন। যারা তার সাথে আওয়ামী বাকশাল ও ভারতীয় সম্প্রসারনবাদের ভয়ে ঐক্য গড়েছিলেন। আমাদের দেশের দুর্ভাগ্য যে আমাদের দেশের বাম রাজনীতবিদদের মাথায় এক সুবিধাবাদী চিন্তা ছাড়া অন্যকিছুই থাকে না। ৭৫ পরবর্তী সময়ে যখন আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের কুপি জ্বালিয়েও খুজে পাওয়া যাচ্ছিল না সেইসময় এইসব বামপন্থি দলগুলো আওয়ামী বাকশাল ঠেকানোর জন্যে জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকারের কোলের উপর উঠে বসলেন। অন্যদিকে কিছু বামপন্থি জিয়া সাহেবের খাল কাটা কর্মসূচীর মধ্যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ইসারা খুজে পেয়ে সমর্থন দিয়ে দিলেন।

হ্যা, এখানে জাতীয়তাবাদী শক্তির কিছু ঘাটতি এখন আছে। এই বামদলগুলোকে তিনি পাশে আনতে পারচ্ছেন না। কিন্তু এতে ক্ষতির কোন কারণ নেই। বামপন্থিদের একটা ভালো অংশ এখনো তাদেরকে দূরে থেকে হলেও সাহায্য সহযোগিতা করে চলেছেন।আবার অপ্রিয় হলেও সত্য বাংলাদেশের বাম ঘরানার দলগুলো এখন সাইন বোর্ড সর্বস্ব দল ছাড়া আর কিছুই নয়।

আসলে জাতীয়তাবাদী শক্তি এখন পথ হারিয়েছে। মানুষ মারার রাজনীতি, যুদ্ধাপরাধীদের সাথে নিয়ে রাজনীতি করা এবং ভারতীয় সম্প্রসারনবাদের জুজুর ভয় দেখিয়ে এখন আর রাজনীতির মাঠ গরম করা যায় না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে জিয়াউর রহমানে রাজনীতি নয়, বরঞ্চ স্বাধীনতা বিরোধীদের সরিয়ে দিয়ে স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে যদি বিএনপি রাজনীতির পথ চলা শুরু করতে পারে তবেই এই রাজনীতি টিকে থাকবে। নচেত মুস্লিম লীগের ভাগ্য বরন করা ছাড়া অন্য কোন পথ খোলা নেই।