ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

কালের পরিক্রমায় আরো একটি শোক আর বেদনায় ভরা মাস আগস্ট চলে এলো আমাদের জাতীয় জীবনে। এই মাস বাঙ্গালীর শুধু অশ্রু ঝরাবার মাস, এই মাস জাতীর পিতা হারাবার মাস। আসলে এই আগস্ট মাস বাঙ্গালীর জীবনে বারবার শুধু বিয়োগান্তক মাস হিসাবেই সামনে এসেছে। সেই ৪৭এর দেশ ভাগ, লাখো লাখ হিন্দু মুসলমানের পৈত্রিক ভিটে বাটী হারানোর শোকের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এক অভিশপ্ত জীবনের যেনো শেষ নেই।

এদেশের মানুষ সেই ৪৭ থেকে স্বাধীনতা দিবস পালন করে আসলেও মনের খুশীতে কোনদিন তারা এই বিয়োগান্তক স্বাধীনতাকে মেনে নিতে পারে নাই। কিছু সুযোগ সন্ধানী ছাড়া প্রায় সকলের মনেই ছিলো নিজের ভিটে বাটি হারানোর ব্যথা। ছিলো আত্মীয় স্বজনদের সাথে না মিলবার সুপ্ত কস্ট। এরপরেও একটি স্বাধীন দেশের জন্যে নিজেদের ব্যক্তিগত কস্ট গুলোকে ম্লান করে রেখে নতুন স্বপ্ন দেখতে চেয়েছিলো বাঙ্গালী। সেই স্বপ্ন এসে ভেঙ্গে গেলো যখন জিন্না সাহেব সহ পাকিস্তানী নেতারা বাংলা ভাষা কে মুছে ফেলার চক্রান্তে মেতে উঠলো। স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়ায় স্বজন হারানোর কস্ট, নিজেদের পৈত্রিক ভিটে বাটি হারানোর বেদনাটা আরো প্রকট হয়ে দেখা দিলো। সেই সময় থেকেই বাঙ্গালী আশাহতের পাশাপাশি মনের কোনে ঠাই দিলো নিজেদের একটা নিজস্ব জন্মভুমির। সেই নিজস্ব স্বাধীন দেশটার স্বপ্ন আস্তে আস্তে বাঙ্গালীর মনের মধ্যে যিনি সযত্নে ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলেন তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু। স্বাধীন হবার স্বপ্ন যে শুধু বঙ্গবন্ধু একাই দেখতেন না তার প্রমাণ সেই ৫৬ সালের মাওলানা ভাসানীর পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি “অলাইকুম আস সালাম” এর ভাষন। তবে সকল বাঙ্গালীই যে স্বাধীনের স্বপ্ন দেখেছিলেন তাতো নয়। এদেশের কিছু নিমকহারাম সন্তান প্রথম থেকেই পশ্চিমা শাসকদের হয়ে বাঙ্গালীদের বিরুদ্ধাচারন করেছে। এই বিরুদ্ধাচারন শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিরুদ্ধাচারন ছিলো না। ছিলো বাঙ্গালীকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার ষড়যন্ত্র। ৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে এইসব নরপিশাচ বাঙ্গালীরাই পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে বাঙ্গালী গনহত্যায় অংশ নিয়েছিলো।

ত্রিশ লাখ মানুষকে হত্যা করে, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে, দুই লাখ মা বোনের ইজ্জত লুন্ঠন করেও বাঙ্গালীর স্বাধীনতাকে আটকিয়ে রাখতে না পারায় এবং বাঙ্গালীর অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবকে ফাঁসিতে ঝোলাতে না পারার ব্যর্থতা, সেইসব পাকিস্তানী দালালদের মনের মধ্যে সবসময় প্রতিশোধের আগুন জ্বলেছে। পাকিস্তানী কারাগার থেকে মুক্ত হবার পরদিন থেকেই তাই প্রতিটি পদক্ষেপে সেই দালাল হত্যাকারীরা চক্রান্তে মেতে থেকেছে কিভাবে প্রতিশোধ নেওয়া যায়। কিভাবে বাঙ্গালীর ঐক্যের প্রতীক বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা যায়।

৭৫এর ১৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিটি দিন, প্রতিটি ক্ষন এই হত্যাকারী চক্র চক্রান্ত করে গেছে। বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত মহাসচিব এবং বন্ধু তাজউদ্দীন সাহেব কে সরানো থেকে শুরু করে একে একে বঙ্গবন্ধুকে নিজেদের ফাদে নিয়ে এসেছে এইসব মানুষরূপী হায়েনারা।

৭৫ এর পনেরোই আগস্টের হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে পরাজিত শক্তি মনে করেছিলো বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানের সাথে জুড়ে দিয়ে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করবে। সেই লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে চলতে থাকে এই হায়েনাদের পরিকল্পনা। যে পরিকল্পনাতে মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কম্যান্ডার জিয়াউর রহমানকেও সাথে পেয়েছিলো পরোক্ষভাবে।

জীবিত বঙ্গবন্ধুর চাইতে মৃত বঙ্গবন্ধু যে অনেক বেশী শক্তিশালী হয়ে বাঙ্গালীর মনের মনিকোঠায় স্থান করে নিবে সে কথা তাদের মনে একবারো উকি দেয় নাই। মনে আসে নাই বাঘের বাচ্চা বাঘই হয়। সে ছেলে বাচ্চা হোক আর মেয়ে বাচ্চা হোক। বঙ্গবন্ধুর মেয়ে শেখ হাসিনা যখন অনেক সংগ্রাম আর প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে পিতার আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে এগিয়ে এলেন তখনই আবারো সেই পরাজিত শক্তি শেখ হাসিনাকেও নিশ্চিহ্ন করে দেবার বিভিন্ন মিশনে সামিল হলো। বারে বারে আক্রমন পরিচালনা করে শেখ হাসিনাকে মেরে ফেলার জন্যে গুলি বোমা গ্রেনেড ছুড়ে মারা হলো। শেখ হাসিনা কে মারতে যেয়ে অনেক কর্মীকে জীবন দিতে হয়েছে। আইভী রহমান থেকে শুরু করে শত শত নেতা কর্মী নিজের জীবন দিয়ে তাদের নেত্রীকে রক্ষা করেছে।

এবং সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার এই খুনি চক্র সবসময় বেছে নিয়েছে এই আগস্ট মাসকেই। যেনো মনে হয় ১৪ই আগস্টের স্বাধীনতা দিবস পালনের যে ব্যর্থতা তাদের কুরে কুরে খায়, সেই বেদনাবোধ থেকেই আগস্ট মাসকেই বেছে নেয় তাদের প্রতিশোধের দিন হিসেবে।