ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

ক্ষমতার সমীকরন বা সমীকরনের ক্ষমতা কথাটি রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এই সমীকরনে বুহু ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে হতে হয়েছে কুপোকাত। রাতের অন্ধকারে প্রাণ দিতে হয়েছে নিজের চিরচেনা মানুষের হাতে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই এই সমীকরনের হিসাব নিকাসে বহু জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বা ব্যক্ত্বিত্ব ইতিহাসের করুন পরিনতি বরন করে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছেন চিরদিনের জন্যে।

নব্বই দশকের গোড়া পর্যন্ত বিশ্বের রাজনীতিতে দুই পরাশক্তির ঠান্ডা লড়াইয়ের যুগে দেশে দেশে অনেক জাতীয়তাবাদী নেতাকে প্রান দিতে হয়েছে বিভিন্ন সমীকরনের মারপ্যাচে। এরপরে এলো সামাজ্যবাদের মোড়ল মার্কিন যুক্ত্ররাষ্ট্রের তৈরী ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ। এখানেও বিভিন্ন দেশে দেশে জনপ্রিয় জাতীয়তাবাদী নেতা নেত্রীদের প্রাণ দিতে হয়েছে বা হচ্ছে ক্ষমতার সমীকরনে বা সমীকরনের ক্ষমতার কূটকৌশলে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাকান্ড ছিলো যেমন এক পরাশক্তির পরাজয়ের গ্লানি থেকে প্রতিশোধের জিঘাংসা তেমনি ক্ষমতার আভ্যন্তরীন দ্বন্ধ, এর প্রমান ৭৫ এর আগস্টের পরপরেই মোস্তাকের মন্ত্রীসভায় আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাদের অংশগ্রহন। সমীকরনের হিসাব নিকাশ। প্রথমতঃ প্রথম থেকেই যে অংশটি স্বাধীনতার বিপক্ষে পাকিস্তানের সাথে কোনরকমে মিলেমিশে থাকার চিন্তায় বিভোর ছিলো এবং যে অংশটি স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে থেকেও তাজউদ্দীন সাহেবের নেতৃত্ব কে মেনে নিতে পারে নাই এই দুই অংশ পরোক্ষভাবে এবং কখনো কখনো প্রত্যক্ষ ভাবে বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে দেওয়ার বা ক্ষমতাচ্যুত করার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতে করেছে সেই ক্ষমতার সমীকরনে।

দ্বিতিয়তঃ সেনাবাহিনী তে যুদ্ধের অব্যাহতি পরেই সফিউল্লাহ সাহেবকে সিনিয়রিটি না মেনেই সেনাপ্রধান নিয়োগ এবং পাকিস্তান প্রত্যাবর্তিত সেনা কর্মকর্তাদের চেয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারী সেনা অফিসারদের দুই বছর সিনিয়রিটি প্রদান সেনাবাহিনীতে সমীকরনের হিসাব নিকাসে প্রশয় পায়। সেই হিসাবের সমীকরনেই জিয়াউর সাহেব মুক্তিযোদ্ধা হয়েও ৭৫ এর হত্যাকান্ডে পরোক্ষভাবে সমর্থন প্রদান করতে দ্বিধা করেন নাই।

তৃতীয়তঃ পাকিস্তানের দোসর রাজাকার আলবদর বাহিনীর পরাজিত শক্তি, জামাত, মুসলিম লীগসহ অন্যান্য দালাল দোসর এবং পাকিস্তানী প্রসাশনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও আই,এস,আইয়ের প্ররোচনায় এবং সরবোপরি এদেশের কিছু বাম রাজনৈতিক শক্তির ভুল রাজনীতি তৎকালীন বাংলাদেশকে পাকিস্তান যুগে ফিরিয়ে নেওয়ার যে চক্রান্ত ছিলো সেই চক্রান্ত কে সার্থক করে তোলে সমীকরনের ক্ষমতা।

নব্বইয়ের স্বৈরাচার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের যে নতুন করে পথচলা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো বা তৈরী হয়েছিলো ৯৬ এ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় প্রত্যাবরতনে সেই আশাকে আরো উজ্জ্বল করে তোলে। বাংলাদেশের মানুষ অনেক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্বেও দ্বিদলীয় গনতন্ত্রে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চেয়েছিলো। কিন্তু ক্ষমতার সমীকরন আবারো সেই আশায় ছাই দিয়ে শুরু হলো অশুভ রাজনীতির পাঁয়তারা। পাকিস্তানী প্রেত্মাতারা নিজেদের পরাজয়কে কোনভাবেই ভুলতে না পারায় বাংলাদেশে তাদের দোসর জামাতকে দিয়ে এক বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে তাদের দলে পুরোপুরি ভড়াতে সক্ষম হলো এবং প্রকাশ্য খুনোখুনীর পথকে বেছে নিলো। যারই ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ আরেকটি বেদনাদায়ক আগস্টের জন্ম দিলো। আওয়ামী লীগের প্রধান এবং তখনকার বিরোধীদিলীয় নেতা শেখ হাসিনা সহ মুল নেত্রিত্বকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২০১৪ সালে বিএনপি জামাত জোট সরকারের আমলে তাদেরই পৃষ্ঠপোষকতায় গ্রেনেড হামলা। ভাগ্যগুনে শেখ হাসিনা সহ নেতৃবৃন্দ বেচে গেলেও মারা যান আইভী রহমান সহ ২৪জন নেতা কর্মী ।

ক্ষমতার সমীকরনে বা সমীকরনের ক্ষমতায় শুধু যে বিএনপি একাই অংশগ্রহন করেছে বার বার তা কিন্তু সত্য নয়। ৮৬ সালের স্বৈরাচারের অধীনে জামাতকে সাথে নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহন বা বিভিন্ন সময়ে সামাজিকভাবে জামাত এবং স্বাধীনতা বিরোধীদের বর্জন করার সিদ্ধান্ত থাকলেও আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত এইসব সামাজিক বর্জনের আহবানকে গ্রহন করেন নাই। বরঞ্চ নিজেদের ছেলে মেয়েদের অইসব চিহ্নিত স্বাধীনতা বিরোধীদের ছেলেমেয়ের সাথে বিবাহ দিয়ে ক্ষমতার সমীকরনকে পোক্ত করেছেন।

ক্ষমতার সমীকরন বা সমীকরনের ক্ষমতাকে বিসর্জন দিতে না পারলে খুনোখুনীর রাজনীতি যেমন বন্ধ হবে না। তেমনি বর্তমানের যে সংকট সেই সংকট থেকে বের হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। গনতান্ত্রিক শক্তির এবং স্বাধীনতার স্বপক্ষের রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে সাময়িক লাভের জন্যে যেসব সমীকরন আজ চলছে তা বন্ধ করতেই হবে। যেকোন জঙ্গীগোষ্ঠীর উত্তান কিন্তু আমাকে আপনাকে কাউকেই রেহাই দিবে না। আজ যেসব জঙ্গী গোষ্ঠীকে বাচানোর বা সমর্থনের চেষ্ঠা চলছে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলে তা কিন্তু উভয়ের জন্যে গলার ফাঁস হয়ে দেখা দিবে। আফগানস্তানের বা ইরানের বিপ্লবের কথা স্মরন রেখেই এদেশের গনতন্ত্রের পতাকাবাহী দল গূলোর পথ চলা উচিত।