ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

গত কিছুদিন ধরে বাংলাদেশের প্রধান খবর হয়ে গেছে শিক্ষা ক্ষেত্রে ভ্যাট প্রয়োগ। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং স্কুল কলেজের উপর সরকার এবার ভ্যাট প্রদান বাধ্যতামুলক করেছে। আসলে দেশের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো গত তিন-চার বছর থেকেই শিক্ষার্থীদের বেতনের সাথে ভ্যাট নিয়ে আসছে। এব্যাপারে যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও কোন সুরাহা পায় নাই স্কুলের ছাত্র ছাত্রী বা অভিভাবকরা। এবার সরকার যখন বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিক্যাল কলেজ সহ বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপর ভ্যাট আরোপ করেছে তখন ছাত্ররা এই ভ্যাট প্রয়োগের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে প্রতিবাদে নেমেছে।

বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় গুলো নিবন্ধনের সময় সরকারের কাছে এই মর্মে নিশ্চয়তা দিয়েছিলো এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তি মালিকানাধীন হলেও মুনাফা অর্জনের চেয়ে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই কাজ চালিয়ে যাবে। বাস্তবে তা হয় নাই। প্রতিটী বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখার খরচ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক অনেক বেশী ব্যয়বহুল। সাধারন মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরেই বলা চলে। এরপরেও বিকল্প রাস্তা না থাকায় অনেক মধ্যবিত্তের সন্তানরা এইসব বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হচ্ছে। ন্যূনতম ১০ লাখ টাকার নিচে এইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা জীবন শেষ করা যায় না। এখন সরকার এই ন্যুনতম ১০ লাখ টাকার উপর ৭.৫ ভাগ ভ্যাট আরোপ করে দেশের জাতীয় আয়ের পরিমান বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে।

এরই প্রেক্ষিতে বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছাত্রীরা রাস্তায় নেমে তাদের দাবী আদায়ে সোচ্চার হয়েছে। একদিনের কর্মসূচীতে সারা ঢাকা শহরকে অচল করে দিয়ে সরকারকে এক প্রেসনোটে ভ্যাট প্রয়োগের ব্যাপ্যারে মুখ খুলতে বাধ্য করেছে। সরকার বলছে এই ভ্যাট শিক্ষার্থীরা নয় বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা দিতে বাধ্য থাকিবে। ভ্যাট সাধারনত ক্রেতা সাধারন তাদের পণ্যের বিক্রয়মূল্যের সাথে পরিশোধ করে থাকে। যেহেতু বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মুলত শিক্ষাকে পণ্য হিসেবেই বিক্রি করে আসছে, তাতে করে ছাত্র ছাত্রীদের কাছ থেকে কর্তৃপক্ষ তাদের টিউশন ফী থেকেই ভ্যাট গ্রহন করার যুক্তি দেখাতেই পারে। এবং ভ্যাট প্রত্যাহারের যে দাবী সে দাবী মুলত অমীমাংশিতই থেকে যাচ্ছে।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমাদের দেশে নতুন কোন বিষয় নয়। সরকারী পর্যায়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আগে অনেক সিমিত ছিলো। প্রতিজেলায় একটি ছেলেদের, একটি মেয়েদের, একটি কলেজ এবং কোথাও কোথাও একটি মাদ্রাসা বা মহিলা কলেজের মধ্যেই ছিলো সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশের প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের একটি জনপ্রিয় দাবী ছিলো গনমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং শিক্ষা আমাদের অধিকার সেইহেতু সকল শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীয়করন করা হোক।

বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্র সংঘঠনের দেয়াল লীখন বা ইস্তেহার পড়লে আজো এই দুটি দাবীর কথা আমরা জানতে পারি। অতএব ভ্যাট প্রয়োগ প্রত্যাহার করার আন্দোলনের চেয়ে অনেক বেশী যুক্তিযুক্ত সকল পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থাকে অবিলম্বে একটি গনমুখী শিক্ষাব্যবস্থার অধীনে এবং জাতীয়করনের মধ্য দিয়ে শিক্ষাকে সকলের জন্য সমান অধিকারের আওতার আনার আন্দোলন অত্যন্ত জরুরী।

ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবীতে বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছাত্রীদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে যখন প্রগতিশীল ছাত্র সংঘঠনের নেতানেত্রীরা বিবৃতি দিচ্ছেন তখন কি আমাদের ধরে নিতে হয় না এই সংঘঠনগুলো সার্বজনীন শিক্ষার দাবী থেকে সরে এসে বৈষম্য মুলুক শিক্ষা ব্যবস্থা কে জিইয়ে রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে?

বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলন আজ ইতিহাসের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছাত্রদের ন্যায্য দাবীতে রাস্তায় নেমে আসা বা সংঘঠিত করা ছাত্র রাজনীতির বাহিরের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেজুড় বৃতির ছাত্র রাজনীতি আজ আর ছাত্র ছাত্রীদের আশার আশ্রয় স্থল হিসেবে পথ দেখায় না। বরঞ্চ রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন আর নিজেদের আখের গোছানোর জন্য সিঁড়ি হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে ছাত্র সংঘঠনগুলো।

এই লেজুড় বৃতির আর আখের গোছানোর রাজনৈতিক পরিমন্ডলের মধ্যে থেকেও ভ্যাট আরোপের বিরুদ্ধে যে ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠেছে সেটা সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে এবং আশার পথ দেখায়। এই ভ্যাট বিরোধী আন্দোলনকে সার্বজনীন শিক্ষা ব্যাবস্থার দাবীর আন্দোলনে পরিনত করেবে আই আশায় বুক বাধতে চাই। ভ্যাট প্রদান অব্যাহত থাকা বা না থাকা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কোন পরিবর্তন আনবে না। পরিবর্তন আনতে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থায়। শিক্ষা যে কারো সুযোগ নয় বা ভাগ্যের ব্যাপার না এই বাস্তব সতিটি উপলব্ধি করতে হবে। শিক্ষা আমার আজন্ম অধিকার। রাষ্ট্র এই অধিকার পুরন করেতে অঙ্গীকারাবদ্ধ।