ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

 

ও যার আপন খবর আপনার হয় না
একবার আপনারে চিনতে পারলে যে, যাবে অচেনারে চেনা।

পহেলা কার্ত্তিক লালন শাহ এর ১২৫ তম তিরোধান দিবস। লালনের জন্ম তারিখ নিয়ে এবং জন্মস্থান নিয়ে অনেক মতবিরোধ থাকলেও মৃত্যু বা তিরোধান নিয়ে কোন মতবিরোধ নেই। লালনের জীবন সম্পর্কে বিশদ কোন বিবরণ পাওয়া যায় না। তার সবচেয়ে অবিকৃত তথ্যসূত্র তার নিজের রচিত অসংখ্য গান। কিন্তু লালনের কোন গানে তার জীবন সম্পর্কে কোন তথ্য তিনি রেখে যাননি, তবে কয়েকটি গানে তিনি নিজেকে “লালন ফকির” হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পনেরো দিন পর কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত হিতকরী পত্রিকার সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়, “ইহার জীবনী লিখিবার কোন উপকরণ পাওয়া কঠিন। নিজে কিছু বলিতেন না। শিষ্যরা তাহার নিষেধক্রমে বা অজ্ঞতাবশতঃ কিছুই বলিতে পারে না।”

লালনের জন্ম কোথায় তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। লালন নিজে কখনো তা প্রকাশ করেননি। কিছু সূত্রে পাওয়া যায় লালন ১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশের) যশোর জেলার ঝিনাইদহ মহকুমার হারিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।[১] কোন কোন লালন গবেষক মনে করেন, লালন কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানার চাপড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত ভাড়ারা গ্রামে জন্মেছিলেন। এই মতের সাথেও অনেকে দ্বিমত পোষণ করেন। বাংলা ১৩৪৮ সালের আষাঢ় মাসে প্রকাশিত মাসিক মোহম্মদী পত্রিকায় এক প্রবন্ধে লালনের জন্ম যশোর জেলার ফুলবাড়ী গ্রামে বলে উল্লেখ করা হয়। (উইকিপিডিয়া)

জন্ম হোক যথা তথা কর্ম হোক সেরা। লালন তার জীবন দর্শন কে অবলম্বন করে অসংখ্য গান রচনা করেছেন। বাংলার আবহ মান জীবনধারাকে লালন করে হিন্দু মুসলমানের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানকে তার গানের মধ্যে তুলে ধরেছেন কিন্তু নিজের কোন মত কারো উপর চাপিয়ে দেন নাই। লালন শাহের এখানেই বিশিষ্টতা। তিনি প্রশ্ন করেছেন। বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান নিয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন। নিজের ভিতরে সৃষ্টি এবং শ্রষ্ঠা নিয়ে যে জিজ্ঞাসা বার বার হানা দিয়েছে তাও তিনি প্রকাশ করেছেন তাঁর গানের ভিতর দিয়ে। সেই প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসাই তার গানের প্রতিপাদ্য। জনে জনে জিজ্ঞাসা করে গেছেন লালন।

হাজার হাজার গান রচনা করে গেছেন লালন শাহ। প্রায় একশত বছর জীবনকালে লালন মানবতাকেই ঊদ্ধে তুলেছেন। সমাজের জাত পাত ধর্ম অধর্ম নিয়ে বার বার তিনি প্রশ্ন করেছেন।

জাত গেলো জাত গেলো বলে, এ কি আজব কারখানা
সত্য পথে কেউ নয় রাজী, সব দেখি তানানা না না ।
যখন তুমি ভবে এলে, তখন কি জাত ছিলে
কি জাত হবা যাবার কালে, সেই কথা কেন বল না।

এতো বড়ো সত্য কথা তিনি অবলীলায় বলে গেছেন। সারা জীবন তিনি সৃষ্টি র রহস্য এবং মানুষের জীবনাচার নিয়ে কৌতুহল দেখিয়েছেন। লালনের সবচেয়ে বড়ো সার্থকতা হলো তিনি সমাজকে প্রশ্ন করেছেন কিন্তু নিজে থেকে কোন উত্তর দিয়ে সমাজকে বিব্রত করেন নাই।

লালনের পড়ালেখা ছিলো না। তিনি সক্রেতিস বা এরিষ্ট্যাটোল পড়েন নাই। পুঁথির সাথে তাঁর কোন সংযোগ ছিলো না অথচ তিনি সক্রেটিসের কথাই নিজের ভাষায় বলে গেছেন। নিজে জানো। এই নিজেকে জানার মধ্য দিয়েই সমাজ, মানুষ এবং দুনিয়াকে জানাতে হবে। মনের ভিতর যে অচীন পাখি বাস করে সেই পাখির খবর আমরা নেই না। অন্যের খব্র নিতে, অন্যের সমালোচনায় আমাদের দিন ফুরায়।

লালনের ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে গবেষকদের মাঝে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে, যা তার জীবদ্দশায়ও বিদ্যমান ছিল। তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত প্রবাসী পত্রিকার মহাত্মা লালন নিবন্ধে প্রথম লালন জীবনী রচয়িতা বসন্ত কুমার পাল বলেছেন- “সাঁইজি হিন্দু কি মুসলমান, এ কথা আমিও স্থির বলিতে অক্ষম। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় লালনের জীবদ্দশায় তাকে কোন ধরনের ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করতেও দেখা যায় নি। লালনের কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। নিজ সাধনাবলে তিনি হিন্দুধর্ম এবং ইসলামধর্ম উভয় শাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। তার রচিত গানে এর পরিচয় পাওয়া যায়। প্রবাসী পত্রিকার নিবন্ধে বলা হয়, লালনের সকল ধর্মের লোকের সাথেই সুসম্পর্ক ছিল। মুসলমানদের সাথে তার সুসম্পর্কের কারনে অনেকে তাকে মুসলমান বলে মনে করত। আবার বৈষ্ণবধর্মের আলোচনা করতে দেখে হিন্দুরা তাকে বৈষ্ণব মনে করতো। প্রকৃতপক্ষে লালন ছিলেন মানবতাবাদী এবং তিনি ধর্ম, জাত, কূল, বর্ণ, লিঙ্গ ইত্যাদি অনুসারে মানুষের ভেদাভেদ বিশ্বাস করতেন না।

বাংলা ১৩৪৮ সালের আষাঢ় মাসে প্রকাশিত মাসিক মোহম্মদী পত্রিকায় এক প্রবন্ধে লালনের জন্ম মুসলিম পরিবারে বলে উল্লেখ করা হয়। আবার ভিন্ন তথ্যসূত্রে তার জন্ম হিন্দু পরিবারে বলে উল্লেখ করা হয়।

লালনের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে উপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন,

‘‘লালন ধার্মিক ছিলেন, কিন্তু কোনোও বিশেষ ধর্মের রীতিনীতি পালনে আগ্রহী ছিলেন না। সব ধর্মের বন্ধন ছিন্ন করে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন জীবনে।’ (উইকিপিডিয়া)

আমাদের সম্পদ এই লালন শাইজি কে কিন্তু আজো আমরা রাষ্ট্রীয় ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারি নি। বিশ্বকবির জন্ম জয়ন্তি করি, মহাপ্রয়ান দিবস পালন করি, নজরূলের জন্ম মৃত্যু দিবস পালন করি জাতীয় ভাবে সে ব্যাপারে কারো কোন আপত্তিও নেই। কিন্তু লালন আমাদের শিকড়ের, আবহমান বাংলার অসাম্প্রদায়িক যে চেতনা সেই চেতনাকে লালন করেই সাইজি তাঁর সমস্ত সৃষ্টি তে বলে গেছেন। সারা বিশ্বে আজ লালনের বানী প্রচারের মধ্য দিয়েই পারস্পারিক হিংসা দ্বেষ, হানাহানি – মারামারি বন্ধ করতে হবে।