ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ড বিজয়ের প্রাক্কালে পাকিস্তানী বাহিনী এবং তার এদেশীয় দোশর রাযাকার আলবদর বাহিনী যে বুদ্ধিজীবী হত্যা শুরু করেছিলো সেই হত্যাকান্ড কিন্তু আজো থামে নি। থামে নি সেইসব আজন্মা পাপীদের এদেশকে পাকিস্তানী ধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার হীন চক্রান্ত। ১৯৭১ সালে বাংলার দামাল ছেলেদের হাতে পরাজিত হওয়ার পর থেকেই নতুন করে শুরু হয় বাংলাদেস বিরোধী অপততপরতা। যারা কোনমতে পালিয়ে গিয়েছিলো বা যারা বঙ্গবন্ধুর মহানুভবতায় বেচে গিয়েছিলেন তারা সবাই মিলে মেতে উঠেছিলো এই শিশু রাষ্ট্র টিকে জন্মলগ্নেই শেষ করে দিতে। সেই লক্ষ্যেই শুরু হলো মুক্তিযোদ্ধাদের ছদ্মবেশে ব্যাংক ডাকাতি, লুঠপাট, অগ্নিসংযোগ, রাহাজানী এবং কৃত্রিম খাদ্য সংকটের মারপ্যাচ।

প্রসাশনের ভিতরে থেকে যাওয়া পাকিস্তানের দালাল প্রসাশক, পাকিস্তান ফেরত সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের সমন্বয়ে তৈরী হলো বিশেষ ব্রিগেড। যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটি দেশ যখন গুটি গুটি পায়ে নিজের ক্ষয় ক্ষতি কাটিয়ে উঠার আরেক যুদ্ধে লিপ্ত তখন এইসব জারজ সন্তানেরা ভিতর থেকে এবং বাহিরে থেকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে স্বাধীনতার চেতনাকে ভুলুন্ঠিত করার চেষ্টায় মেতে উঠেছিলো।

এই সাথে যোগ হয়েছিলো আমাদের দেশের সবচেয়ে প্রগতিশীল বলে দাবীদার একশ্রেণীর বাম রাজনীতির ভুল লাইন গ্রহন কারী দলগুলো । সমাজ বিপ্লবের তড়িঘড়ি লাইন গ্রহন করে প্রসব বেদনার আগেই সন্তান জন্ম দেওয়ানোর যে প্রচেষ্ঠা তাতে শুধু বিপ্লবেরই ক্ষতি হলো না বরঞ্চ এইসব দলগুলোর মধ্যে ঢুকে রাযাকার বাহিনীর এক বিশাল অংশ ঢুকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির মধ্যে এক বিশাল ফারাক তৈরী করেছিলো এবং মুক্তিযোদ্ধা নামে সমাজে এক আতংকের সৃষ্টি করেছিলো।

এরই মাঝে ঘটে যায় পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট হত্যাকান্ড। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে শুরু হয় স্বাধীনতা বিরোধীদের রাষ্ট্রীয় ভাবে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে পোক্ত করা শুরু করেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান। এবার সরাসরি স্বাধিনতা বিরোধী তৎপরতা শুরু হয়ে যায় সমজের সর্বস্তরে। সুকৌশলে হত্যা করা হয় মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনাদের। সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাউকে কাউকে ভয় দেখিয়ে চাকুরীচ্যুত করা হয় নতুবা হত্যা করা হয় বিভিন্ন অজুহাতে। বিমান বাহিনীর প্রায় শতাধিক মুক্তিযোধা অফিসারকে প্রান দিতে হইয়েছিলো এক রাতেই।

আজ বিজয়ের চুয়াল্লিশ বছরে এসেও সেই হত্যাকান্ড কিন্তু থেমে যায় নাই। সেদিনের সরকারী আনুকুল্যে হত্যাকান্ড ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন অপবাদ দিয়ে মুক্তিযোধাদের যে অপমান, লাঞ্চনা, আর হত্যার শিকার হতে হয়েছিলো তা আজো বহাল আছে সমাজের বিভিন্ন স্তরে। বুধিজীবি হত্যার অংশ হিসেবেই জীবন দিতে হয়েছে তাহের স্যার, ইউনুস স্যার, হুমায়ন আজাদ স্যার, লিনন স্যার সহ এই কুছুদিন আগে খুন হওয়া দীপন পর্যন্ত। ব্লগার রাজীব থেকে শুরু করে নীলয় পরযন্ত সকল হত্যাকান্ডই বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ডের অংশ।

এতো কিছুর পরেও আজ যখন জাতি বুদ্ধিজীবি দিবস এবং বিজয় দিবস পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন জাতি কলঙ্ক মোচনের পথে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান, আলী আহসান এবং সাকা চৌধুরীর ফাসির মধ্য দিয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবি দের পরিবার এবং ত্রিশ লাখ শহীদের পরিবার কিছুটা হলেও আজ শান্তি পাচ্ছে। বিজয়ের চুয়াল্লিশ বছর পর জাতি আজ অত্যন্ত গর্বের সাথে কলংক মুক্ত হয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবি এবং বিজয় দিবস পালন করবে।

একটা সময় ছিলো বাংলাদেশের মানূষ ভুলে গিয়েছিলো যে যুদ্ধাপরাধীদের কোনদিন বিচার হতে পারে। যে দেশে যুদ্ধাপরাধীদের গাড়ীতে জাতীয় পতাকা উড়ে সেই দেশে এইসব নরঘাতকদের বিচার হতে পারে, ফাসী হতে পারে সেই চিন্তাও ছিলো বাতুলতা মাত্র। বিচার শুরু হওয়ার পরেও ধারনা ছিলো জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক চাপে এই বিচার প্রক্রিয়া মাঝপথে থেমে যাবে। অথবা এইসব খুনীরা ক্ষমতার হিসাব নিকাশে জেল থেকে মুক্ত হয়ে আবার জাতীয় পতাকার অংশীদার হবে। কিন্তু আজ সেই সমস্ত ধারনা কে ভ্রান্ত প্রমাণ করে জাতী স্বস্তির নিশ্বাস নিতে পারছে।

তবে বদ্ধিজীবি হত্যা কিন্তু থেমে যায় নাই। প্রতিদিন এইসব হায়েনার দল আর তাদের গোষ্ঠী আমাদের উপর হামলার জন্যে প্রস্তুত হয়ে আছে। আজই পত্রিকার খবরে প্রকাশ পাকিস্তানী দুতাবাসের এক নারি কর্মকর্তা এদেশের জঙ্গী কানেকশনের সাথে জড়িত থাকার কথা সন্দেহ করা হচ্ছে।(সুত্রঃ দৈনিক বাংলাদশ প্রতিদিন)। এর আগে সাকা এবং আলী আহসানের ফাসীর বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকারী ভাবে উষ্মা প্রকাশ করে তাদের আস্ল চেহেরা প্রকাশ করেছে। আমাদের এই চুয়াল্লিশ তম বিজয় দিবস আরো বেশী ঐক্য, আরো বেশী মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কে দৃঢ়, আরো বেশী অসাম্প্রাদায়িক চেতনা ধারন করার প্রয়োজনীয়তাকে স্মরন করিয়ে দিচ্ছে।