ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

মুক্তিযুদ্ধে কতজন আমার ভাই শহীদ হয়েছেন সেই নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন আমাদের দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে এক সুধী সমাবেশে এই সন্দেহের কথা তুলেছেন। খালেদা জিয়া এবং তার পুত্রের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্কিত কথা বলা নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনত শুধু মাত্র এক অখ্যাত মেজরের রেডিও ভাষনের পরপরই শুরু হয়েছে এমন কথা অবশ্য বিএনপি এবং যারা বাংলাদেশের গন আন্দোলনের ইতিহাসকে অস্বীকার করতে চায় তারাই এই কথার আবিষ্কারক এবং সুকৌশলে নতুন প্রজন্মের কাছে এই কথা প্রতিষ্ঠা করতে অনেকদিন ধরেই চেষ্ঠা চালিয়ে আসছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ঠীক কতজন মানুষ শহীদ হয়েছেন তা বাংলাদেশের ইতিহাসে বাতুল প্রশ্ন মাত্র। এই শহীদের সংখ্যা যে মাত্র ত্রিশ লাখ এই হিসাব করা সম্ভব হয় নাই। বরঞ্চ শহীদের সংখ্যা ত্রিশ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়াও অসম্ভব কিছু নয়। শুধু গুলি করে, জবাই করে, আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করার সংখ্যাই ত্রিশ লাখ। ভারতে আশ্রয় নেওয়া এক কোটি শরণার্থীর মধ্যে অনেক শিশু নারী বৃদ্ধ আছেন যারা না খেতে পেয়ে, অসুস্থ্য হয়ে মারা গেছেন, রাস্তায় যেতে যেতে মারা গেছেন অনেকেই। শুধুমাত্র ত্রিশ লাখ সংখ্যা টাকে আমরা ধরে নিয়েছিলাম। তাই এই সংখ্যা নিয়ে কেউ কখনো কোনদিন প্রশ্ন করে নাই, শুধুমাত্র পাকিস্তান, জামাত শিবির এবং সম্প্রতি খালেদা জিয়া করলেন। এই প্রশ্ন তোলার মধ্য দিয়ে তিনি তার রাজনৈতিক অবস্থান আবারো পরিস্কার করলেন।

গত চুয়াল্লিশ বছর ধরে এদেশের মানুষের মনে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যারা স্বজ্ঞানে এই দেশের বিরোধীতা করে পাকিস্তানী সেনা বাহিনীর সাথে গনহত্যা এবং ধর্ষণ লুঠ অগ্নিসংযোগে অংশ নিয়ে ছিলো তাদের বিচার দাবী করে আসছিলো। সেই দাবীর প্রেক্ষিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম গন আন্দোলন গড়ে মানুষের সেই আকাঙ্ক্ষা কে জাগিয়ে তুলেছিলেন।

সেই গনদাবীর মুখে সেইসময়ের সরকার এবং পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসা দলগুলো জনগনের এই দাবীর প্রতি সমর্থন দিলেও কার্যকরী কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিলো না। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ম্যান্ডেট ছিলো যুদ্ধাপরাধিদের বিচার সম্পন্ন করার। সেই প্রেক্ষিতে দেশের আপামর জনগন তথা তরুন সমাজ আওয়ামী লীগ কে নিরূংকুশ সমর্থন দিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ তৈরী করে দিয়েছিলো। তারই ফলশ্রুতিতে আজ দেশের মানুষ যুদ্ধাপরাধের বিচার দেখছে এবং এপর্যন্ত চারকে ফাঁসী দিয়ে তাদের কৃতকাজের শাস্তি নিশ্চিত করেছে।

এই বিচার এবং শাশ্তির বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই এদেশের কিছু রাজনৈতিক দল এবং গোষ্ঠী এই বিচার নিয়ে নানা ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। দেশকে অস্থিতিশীল করার সকল উপায় গ্রহন করে প্রচুর জাতীয় সম্পদ এবং প্রাণহানীর ঘটনা ঘটিয়েছে। সেইসাথে যুক্ত হয়েছে পাকিস্তান্সহ নানা আন্তর্জাতিক চক্রান্ত। সকল ষড়যন্ত্র কে পাশ কাটিয়ে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল নিরেপেক্ষ বিচারের মাধ্যমে দোষীদের উপযুক্ত শাশ্তি চুড়ান্ত করেছে।

পাকিস্তান এই বিচার এবং দোষীদের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়ে ৭১ এর ভূমিকারই পুনরাবৃত্তি করছে। একদিকে যেমন কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভঙ্গন করেছে অন্যদিকে এইসব কুলাঙ্গার যুদ্ধাপরাধীরা যে সত্যিই এই দেশের স্বাধিনতার বিরোধীতা করেছিলো তা প্রমাণ করেছে।

ঠিক তেমনি এক ক্রান্তিকালীন মুহূর্তে খালেদা জিয়া ৭১ সালের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে কি বুঝাতে চাচ্ছেন? এর আগে অনেক ধরনের বক্তব্যই দেশনেত্রী এবং তার পুত্র তারেক জিয়া দিয়েছেন যা কিনা সরাসরি স্বাধীনতার চেতনা প্রশ্নবিদ্ধ করতে যথেষ্ঠ ছিলো। বাংলাদেশের মানুষ সেইসব বক্তব্যকে কখনো ক্ষমতা হারানোর প্রলাপ মনে করেছে নতুবা মাঠের মেঠো বক্তব্য ধরে নিয়েছে।

আওয়ামী লীগের অনেক নেতা নেত্রীরাই অনেক সময় বাধন হারা হয়ে খালেদা জিয়া এবং তার স্বামী ও পুত্রের বিরুদ্ধে বলে থাকেন। বাংলাদেশের জনগন সেইসব বক্তব্যকেও মেঠো বক্তৃতা হিসেবেই ধরে নিয়েছে। কিন্তু আজ যখন বেগম খালেদা জিয়া পাকিস্থানী শাসকদের সাথে গলা মিলিয়ে বলেছেন ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহীদ হন নাই এবং এই সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ আছে তখন আর যাই হোক বেগম সাহেবের এইদেশের স্বাধীনতায় যে বিশ্বাস নেই তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

দেশে যেই মুহূর্তে স্থানীয় পৌর সভার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, বিজয়ের মাস চলছে, দুইজন আতন স্বীকৃত যুদ্ধাপরাধীর শাশ্তি নিশ্চিত হয়েছে সেইসময় বাঙ্গালীর সবচেয়ে আবেগপ্রবন জায়গায় আঘাত হেনে কার সমর্থনের আশায় দিন গুঞ্ছেন তা বুঝা যাচ্ছে না। এতোবড়ো দুঃসাহস বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রকাশ্যে কেউ দেখাতে সাহস পান নাই। অথচ একজন দেশনেত্রী হয়ে এতো বড়ো দুঃসাহস তিনি কিভাবে দেখালেন বা কেনোই বা দেখালেন তাই আজ সবার কাছে প্রশ্ন। কার দিকে তাকিয়ে তিনি এদেশের ক্ষমতায় ফিরতে চান সেই প্রশ্নটাই সবার কাছে জিজ্ঞাস্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।গনহত্যা, বাংলাদেশ