ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

২৪শে জানুয়ারি। গন অভ্যুত্থান দিবস। ঊনসত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলির সফলতা আসে এই দিনে। প্রাণ দেন নবকুমার ইনিস্টিটিউটের ছাত্র মতিউর কাদের সহ আরো কয়েকজন ছাত্রনেতা। স্বৈরাচার আইয়ুব খানের সাধের সিংহাসন কেপে উঠে। এই গণঅভ্যুত্থানের ফলেই মুক্ত হোন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিব। মার্চের মাঝামাঝি পদত্যাগ করে বিদায় নিতে হয়েছিলো তথাকথিত লৌহ মানব বলে খ্যাত স্বৈরশাসক আয়ুব খানকে। তার এদেশীয় দালাল মোনেম খান প্রাণ বাচাতে পালিয়ে যান নিভৃতে।

আজ যখন স্বাধীনতার আন্দোলনকে বিতর্কিত করে উল্টোপাল্টা ইতিহাস উপস্থাপনের চেষ্টা চালান তখন ইতিহাস তাদের সেই বিমুঢ়তা নিয়ে উপহাস ছাড়া কিছুই করতে পারে না। উনসত্তরের বিশে জানুয়ারী শহীদ আসাদের শহীদ হওয়া বাংলদেশের গন আন্দোলনে স্ফুলিঙ্গের কাজ করেছিলো। সেই দিন সন্ধ্যা থেকেই লাখো লাখো মানুষ ঢাকার রাজপথে নেমে এসে স্বৈরাচারী আইয়ুবের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পরে। সেই বিক্ষোভ চব্বিশে এসে রুপ নেয় গন অভ্যুত্থানে। কৃষক শ্রমিক, মেটে কুলি, ছেলে বুড়ো, নারী পুরুষ সকলের এক দাবী এক দফা আইয়ুব খানের পদত্যাগ আর শেখ মুজিবের মুক্তি। সেই চব্বিশে জানুয়ারীতে আরো একটি স্রোতের উদ্ভব হলো সেই স্রোত জনতার শ্রোত। পদ্মা মেঘনা আর যমুনার স্রোতের সাথে এই স্রোত মিশে একাকার হয়ে তেতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সকল মানুষকে এক স্রোতে মিলিয়ে দিলো।

তখন কিন্তু ছিলো না টেলিফোন, ছিলো না মোবাইল, না ছিলো ইন্টারনেটের সহজ যোগাযোগ। অথচ বিদ্যুৎ গতিতে প্রতিটি ঘরে পৌছে গিয়েছিলো বিদ্রোহের বারতা। সবার কন্ঠে ধ্বনিত হলো একটি কথা – “বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে”। সবার কন্ঠে রণিত হলো একই সুর “পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকাণা”।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা শুধুমাত্র যেমন ৭ মার্চের ভাষণের পরই শুরু হয় নাই, তেমনি কোন অখ্যাত মেজরের রেডিও ভাষনের পরেও শুরু হয়েছিলো না। বাহান্নো ভাষা আন্দোলনের পর হতে বিভিন্ন গনতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জয় পরাজয়ের পথ পেরিয়ে, জেল জুলুম আর রাষ্ট্র বিরোধী মামলা মোকাবেলা করে জনগনের স্বত;স্ফুরত অংশগ্রহনের মধ্য দিয়েই স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে ধাবিত হয়েছিলো বাংলাদেশ। এই পুরো ইতিহাসে মধ্যমনি হয়ে ছিলেন শেখ মুজিব, সেই সাথে মজলুম জননেতা মাওলানা ভাষানীর অকুন্ঠ সহযোগিতা স্বাধীনতা আন্দোলনের এই দুর্গম পথে শেখ সাহেবকে যুগিয়েছিলো সাহস, দিয়েছিলো প্রেরণা

আজ যখন একটি বিশেষ মহল দাবী করে এক মেজরের ভাষনের বা ঘোষনার ফলশ্রুতিতে এদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সুচনা হয়েছিলো তখন মনে হয় ৫২ থেকে ৭১ এর ২৫ শে মার্চ যে আন্দোলন এদেশের মাটিতে হয়েছিলো তা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে কোন অবদানই রাখে নাই। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষন ছিলো এক সময় কাটানোর উছিলা মাত্র। অবশ্য এই গোষ্ঠী বলে আসছে বঙ্গবন্ধু কখনোই বাংলাদেশের স্বাধীনতা চান নাই। বঙ্গবন্ধুর কোন অবদানই স্বীকার করতে চান না এই গোষ্ঠী।

২৪শে জানুয়ারি বা বিশে জানুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনে খুবই গুরুত্বের সাথে পালিত হওয়া উচিত। যেমন পালিত হওয়া উচিত ৭ই জুন। যেদিন বঙ্গবন্ধু জাতিয় মুক্তির সনদ ৬ দফা পেশ করলেন। এই দিনগুলির ধারাবাহিকতাতেই আমাদের স্বাধীকার তথা স্বাধীনতা যুদ্ধের আন্দোলন তার যৌক্তিক পথ পেয়েছে।

বাঙালির আন্দোলন আর সংগ্রামের ইতিহাসকে মুছে ফেলার যে হীন ষড়যন্ত্র ’৭৫এর পর হতে শুরু হয়েছে তার ধারাবাহিকতা আজো চলছে। ত্রিশ লাখ শহীদদের আত্মত্যাগকে অস্বীকার করার আস্পর্ধা এই গোষ্ঠী পেয়েছে ইতিহাসকে বিকৃতি করার মধ্য থেকেই। এইগোষ্ঠী মুখে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমের সোল এজেন্ড হিসেবে নিজেদের জাহির করতে চাইলেও তারা আসলে পাকিস্তানের প্রেতাত্মা। এরা পকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ার দুঃখে আজো ভারাক্রান্ত। এদের স্বপ্ন আর চিন্তায় আজো পাকিস্তান।