ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

আগামীকাল থেকে শুরু হচ্ছে বইমেলা। বাঙালির প্রাণের বইমেলা। সেই ১৯৮৪ সালে হাটি হাটি পা পা করে মাত্র পঁচিশ ত্রিশ টা বইয়ের স্টল দিয়ে যে বই মেলার শুরু হয়েছিল সেই বই মেলা আজ প্রায় পাঁচ লাখ স্কোয়ার ফিটের বিশাল আয়তনের মহীরূহে পরিনত হয়েছে। মহান একুশে ফেব্রুয়ারীকে কেন্দ্র করে মাস ব্যাপি এই বই মেলা আজ বাংলা আর বাঙ্গালীর প্রাণের উৎসবে পরিনত । সারা বছর ধরে অপেক্ষমাণ প্রকাশক, লেখক আর পাঠকের এক মহামিলনস্থলে পরিনত হওয়া এই মেলা দিনে দিনে শুধু বেড়েছেই। এই বই মেলাকে নিয়ে রাজনীতিও কম হয় নাই। জাতীর ইতিহাসকে, ঐতিহ্যকে এবং সর্বোপরি সংস্কৃতিকে ভুল পথে নিয়ে যাওয়ার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিলো তাকে পরাজিত করে আজ বইমেলা মহীরূহে পরিনত হয়েছে।

১৪৪০ – ৫০ সালে জার্মানির জোহানেস গুডেনবাগের স্থানান্তরযোগ্য ছাপার টাইপ বা অক্ষর আবিস্কার পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দিতে সাহায্য করেছে। এতোদিন বিভিন্ন গাছ গাছড়ার ছাল বাকড় আর কলা পাতা জাতীয় পাতায় বা পাপিরাসের মন্ডের কাগজে কাকি দিয়ে লেখা নিজেদের কথা লিপিবদ্ধ করার যে প্রক্রিয়া চালু ছিলো তা এই স্থানান্তর যোগ্য ছাপার অক্ষর আবিস্কার মানব সভ্যতার ইতিহাসটাকেই বদলে দিলো। মানুষ তার সমস্ত কথা, ইতিহাস, ভাব ছন্দ এবার ছাপা অক্ষরের মাধ্যমে লিপিবদ্ধ করার প্রয়াস পেলো। সুত্রঃ সামসুজ্জামান খান, বাংলা একাডেমী এবং দি ডিসকভারি ওয়ার্ল্ড।

প্রচলিত হলো বই আকারে মানুষের ইতিহাস, গল্প, কবিতা ছন্দ বা মনের ভাব প্রকাশের রীতিনীতি। ছাপার অক্ষরে বই প্রকাশ মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে অনেকটা পথ। মানূষের জ্ঞান এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পরতে বেশী সময় নিলো না। এবং এই ছড়িয়ে পরা জ্ঞানকে ধারন করে বিশ্ব আজ এক কেন্দ্রে পরিনত হয়েছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বইমেলা এখন খুবই জনপ্রিয় একটি ইভেন্ট। বিখ্যাত বইমেলা গুলোর মধ্যে ফ্রাঙ্কফ্রুট বইমেলা, লন্ডনের বইমেলা, দিল্লীর বইমেলা এবং কলকাতা বইমেলা আন্তর্জাতিক ভাবে প্রসিদ্ধ। তবে আমাদের বইমেলাও ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক পরিসরে স্থান করে নিচ্ছে। অন্যান্য বইমেলা সম্বন্ধে আমার ধারনা অনেক কম তবে পত্র পত্রিকা পড়ে যেটুকু জ্ঞান আমার হয়েছে তাতে মনে করি কলকাতা বইমেলা এবং আমাদের বইমেলা আমাদের জনজীবনে যে প্রানের জোয়ার বয়ে আনে তা সত্যি অতুলনীয়। আমাদের দেশের মানুষের সামর্থ্য অনেক কম থাকলেও প্রতিবছর এক উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ এই বইমেলার জন্য সারা বছর ধরে কিছু সঞ্চয় করে রাখেন কিছু না কিছু বই কেনার জন্যে। শুধু বই মেলায় বই কেনাবেচাই নয়, এই বইমেলা যেনো পরিনত হয় এক বিশাল মিলনমেলায়। অনেকসময় একজনের সঙ্গে আরেকজনের হয়তো সারা বছর দেখাই হয় না কিন্তু এই বইমেলা বছরে একবার সেই না দেখা বন্ধুটির দেখা পাইয়ে দেয়।

মহান একুশে এই বইমেলাকে অন্যমাত্রা এনে দিয়েছে তা বলাই বাহুল্য। একুশে ফেব্রুয়ারি প্রতিটি বাঙ্গালীর প্রানের দিন। জীবনের সাথে একেবারে মিলেমিশে আছে বলেই এই মাসে অনুষ্ঠীত বইমেলাও বাঙ্গালীর হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন গেঁড়ে বসেছে।

অবশ্য এই বইমেলায় আমাদের দুইজন প্রিয় মানুষকে হারাতে হয়েছে। আমাদের বাংলাদেশের বিশিষ্ঠ লেখক গবেষক হুমায়ন আজাদ স্যার এবং গত মেলায় প্রকাশ্যে খুন হওয়া মুক্তচিন্তার লেখক গবেষক অভিজিত রায়কে প্রান দিতে হয়েছে বাঙ্গালী সংস্কৃতির বিরুদ্ধ গোষ্ঠী তথাকথিত ধর্মীয় জঙ্গী গোষ্ঠির হাতে। এই গোষ্ঠী মুলত এদেশের স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠি। এরা ৫২এর ভাষা আন্দোলনের বিরোধীতাকারী, এরা গনতন্ত্রের শত্রু এরা এদেশের স্বাধীনতার শত্রু। এই গোষ্ঠী এদেশের একশ্রেনীর ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক দলগুলোর আশ্রয় প্রশয়ে বেড়ে উঠা এক ফ্রাংকেনষ্টাইল।

এবারের বইমেলার পরিধি অনেক বেড়েছে। আমরা আশা রাখি গত বছরের মতো কোন বিয়োগান্তক ঘটনা বইমেলার আমেজকে, ঐতিহ্যকে ম্লান করে দিবে না। গত কয়েকমাস আগেই আমাদের দেশের বিশিষ্ট প্রকাশক দীপনকে হত্যা করেছে সেই চিহ্নিত গোষ্ঠি। কয়েকজন প্রকাশককে হত্যাচেষ্টা চালিয়ে তাদের নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিলো। আজো সেইসব লেখক শারিরিকভাবে নির্যাতনের চিহ্ন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তারা সহ আরো অনেক লেখক, প্রকাশক এবং দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের এই গোষ্ঠি হত্যার হুমকি দিয়েছে। অতএব নিশ্চিন্তে বসে থাকার অবকাশ খুব কম। আমরা বাংলা একাডেমী, সরকার এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মেলার সার্বিক নিরাপত্তা নিছিদ্র রাখার ব্যাপারে উদ্যোগি হওয়ার আহবান জানাচ্ছি। আমরা এবারের বইমেলার সাফল্য কামনা করছি এবং সেই সাথে সকল লেখক প্রকাশক সহ মুক্তচিন্তার মানুষদের নিরাপত্তা কামনা করছি।