ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

ষাটের দশকের চীনের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কোন এক সময় চীনা কমিউনিষ্ট পার্টির সভায় তৎকালীন পিকিং শহরের রাস্তাঘাট উন্নয়নের প্রশ্নে যখন পার্টির সকল সদস্য আগামী পঞ্চাশ বছরের পরিকল্পনা করে প্রস্তাব গৃহীত করার প্র‍্যাস নিচ্ছিলেন ঠিক সেই সময় চীনের চেয়ারম্যান মাও সে তুং বলেছিলেন কমরেড গন পিকিং একসময় সারা পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলে পরিনত হবে অতেব আগামী একশত দেড়শত বছরের পরিকল্পনা করে উন্নয়ন না করলে আগামী প্রজন্ম আমাদের গাধা বলে আখ্যায়িত করবে। কমরেড মাওয়ের সেই কথা মতোই পিকিং এর রাস্তা ঘাটের উন্নয়ন হয়েছিলো। সেদিন অবশ্য তাঁর এই পরিকল্পনাকে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মতোই সমালোচনায় পরতে হয়েছিলো। তাঁর পরিকল্পনা গুলোকে একনায়ত্বের একঘুয়েমি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলো।

আমাদের দেশের জাতিয় নেতৃবৃন্দ  আমাদের দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহন করেন মাত্র তাঁর মেয়াদের কথা চিন্তা করেই। উনাদের দলের ক্ষমতা যতদিন সেই হিসেবেই তারা সকল উন্নয়নের রুপরেখা প্রনয়ন করে থাকেন।

স্বাধিনতার পর বঙ্গবন্ধুর সরকার ছাড়া সকল দলের নেতারাই এই কাজ করে গেছেন। সেইসাথে আরো একটি বাজে পথ অনুসরন করে এসেছেন যে, একটি দল ক্ষমতা থেকে চলে গেলেই সেই সরকারের আমলে নেওয়া সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড স্থগিত করে নতুন পরিকল্পনা গ্রহনের পায়তারা শুরু করা। এসব আমরা সবাই জানি। এগুলো সবই পুরান কথা।

আশির দশকের শেষ দিকে এরশাদ সাহেব যমুনা ব্রিজের কাজ শুরু করলেও নব্বই দশকে খালেদা জিয়ার সরকার ক্ষমতায় এসে আবার নতুন করে যমুনা ব্রীজের কাজ উদ্বোধন করেছিলেন। মাত্র বিশ বছর আগের ঘটনা। কিন্তু এই যমুনা নদীর উপর বঙ্গবব্ধু ব্রীজের কানেক্টিং রোড গুলো চার লেনের পরিকল্পনা করেছিলেন না। শুধু তাই নয় শেখ হাসিনা ছিয়ানব্বই সালে ক্ষমতায় এসে ব্রীজ তৈরির কাজ সম্পন্ন করলেও রাস্তাটি চার লেন করেন নাই। অথচ আজ মাত্র বিশ বছর পরেই এসে উপলব্ধি করতে হচ্ছে কানেক্টিং রোডটি চার লেন না করার ফলে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনায় মানুষকে প্রাণ দিতে হচ্ছে।

ছিয়ানব্বই সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা সরকার ঢাকা চিটাগাং হাইওয়ে চার লেনের কাজ শুরু করলেও কুমিল্লার দাউদকান্দি পর্যন্ত যেয়ে কাজের গতি নষ্ট হয়ে গেছে শুধুমাত্র সরকার পরিবর্তনের জন্যে। কেউ কেউ বলেন ক্ষমতাশীনদের পারসেন্টইজ দিতে রাজী না হওয়াতেই এই কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। সেই কাজ এখন শেষ হওয়ার পথে। মাত্র দুই তিন বছরের কাজ প্রায় ছয় বছর ধরে শেষ করতে লাগছে। শুধুমাত্র ক্ষমতার রদবদলের জন্যে খরচ বেড়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা।

বর্তমানে সরকার জয়দেবপুর চৌরাস্তা থেকে এলেঙ্গা হয়ে রংপুর পর্যন্ত চার লেন রাস্তার পরিকল্পনা গ্রহন করেছে। এই চারলেন রাস্তা তৈরি করতে যেয়ে সরকারকে নতুন করে জমি অধিগ্রহন থেকে শুরু করে কয়েকগুন বেশী টাকা দিয়ে প্রকল্প গ্রহন করতে হচ্ছে। আর এসবই আমাদের দেশের জাতীয় নেতাদের দূরদর্শিতার অভাবের প্রতিফলন।

এক্ষেত্রে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে নব্বইয়ের আগের সরকারগুলোর জনগনের প্রতি কোন দায়বদ্ধতা ছিলো না বলেই তারা জনগনের উন্নয়নের কথা চিন্তা করে নাই, রাষ্ট্রীয় অর্থের তছনছ করতে দ্বিধা করে নাই। কিন্তু নব্বইয়ের পর দেশে গনতন্ত্রের সুবাতাস বয়ে গেলেও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনগনের সংশ্লিষ্টতা এসেছিলো না। আর তাই অনেক ভালো ভালো পরিকল্পনা গ্রহন করলেও কোনটাই জনগনের উন্নয়নে কোন কার্যকরী পরিবর্তন আনতে পারে নাই।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতীয় নেতৃবৃন্দের দূরদর্শিতার উপরই দেশের এবং দেশের জনগনের জীবনধারায় উন্নয়নের ছোয়া লাগে। এমনিতেই উন্নয়ন একটা আপেক্ষিক ব্যাপার। আজকের প্রয়োজন কালকে অগ্রহনীয় হয়ে যেতে পারে। এবং সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে উন্নয়ন কাজ থেমে থাকে না কোনকালে। উন্নয়ন কাজগুলো মোটামূটি ভাবে আগামী পঞ্চাশ বা আরো বেশী বছরের লক্ষ্যের কথা চিন্তা করে পরিকল্পনা করা নেতৃবৃন্দের মেধা আর দূরদর্শিতার প্রমাণ। আর এজন্যেই জাতীয় নেতাদের দূরদর্শিতার জন্যে একেকটা জাতি তাদের কাংখিত লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পারে নির্বিঘ্নে। আমরা স্থায়ী এবং টেকসই উন্নয়নের স্বপক্ষে। তবে সেই উন্নয়ন হোক জনগন বান্ধব, জনগনের জন্য এবং সুদুর প্রসারী।